শাহীন হাসনাত : পবিত্র কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সারা দেশে পশুপালন অনেকগুণ বেড়েছে। মুসলিমপ্রধান দেশ হওয়ায় এই সময় বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক পশুর চাহিদা সৃষ্টি হয়। আগে দেশে পর্যাপ্ত পশুপালন না হওয়ায় এই মৌসুমে পশুর ঘাটতি দেখা দিত, ফলে চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে গরু আমদানি করা হতো। তাতেও অনেক সময় শেষ মুহূর্তে কোরবানির পশু পাওয়া যেত না, চড়াদামে পশু কিনতে হতো। কয়েক বছর আগে হঠাৎ ভারত গরু রপ্তানি বন্ধ করে দিলে কোরবানির সময় পশু সংকট সৃষ্টি হয়। তবে দীর্ঘ মেয়াদে ভারতের এই আচরণ আমাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে দেশে পশুপালন বেড়ে যায়। দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত পশু সারা বছরের চাহিদা পূরণ করছে। আবার কোরবানির জন্য আলাদা করে খামারি এবং ব্যক্তি পর্যায়ে বিপুল গবাদিপশু পালন হচ্ছে। ফলে পশুসম্পদে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবমতো, গত বছর কোরবানির পশু মজুদ ছিল এক কোটি ১৮ লাখ, এর মধ্যে কোরবানি দেওয়া হয়েছিল এক কোটি ছয় লাখ। এবার ঈদুল আজহায় কোরবানিযোগ্য এক কোটি ১৯ লাখ পশু প্রস্তুত।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২১ জুলাই পবিত্র ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঈদুল আজহায় সামর্থ্যবান মুসলমানরা পশু (গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া ইত্যাদি) কোরবানি দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে দেশে চলমান কঠোর লকডাউন ১৪ জুলাই পর্যন্ত থাকবে। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই লকডাউন আরও বাড়তে পারে। এমতাবস্থায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে পশুর হাট বসা নিয়ে চলছে দোলাচল। তেমনি কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে একধরনের শঙ্কা বিরাজ করছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে। ক্রেতারা ন্যায্যমূল্যে গরু বা অন্যান্য পশু কিনতে পারবেন কি না বা কীভাবে কিনবেন এবং খামারিরাও দুশ্চিন্তায় আছেন সঠিক দাম পাবেন কি না কিংবা কীভাবে তারা তাদের পশু বিক্রয় করবেন তা নিয়ে।
গত বছরের অনুপাতে এবার যদি দেশে কোরবানির পশুর চাহিদা এক কোটি ১০ লাখ ধরা হয়, তার পরও ৯ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। এমতাবস্থায় যদি আবার লকডাউন বাড়ে তাহলে কোরবানিদাতার সংখ্যা আরও কমতে পারে, সেই সঙ্গে পশু বিক্রি নিয়ে খামারিরা মারাত্মক অনিশ্চয়তায় পড়বেন। আর যদি লকডাউন না বাড়ে তবে গত বছরের তুলনায় এবার বাজার অনেক ভালো হবে বলে আশা করা যায়।
কোরবানি সামর্থ্যবানদের জন্য ওয়াজিব। কোরবানি করা ঈদুল আজহার দিনের বিশেষ ইবাদত। হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ ঈদুল আজহার উৎসবে কোরবানি অর্থনীতিতে গতি সৃষ্টি করে। পশু কোরবানি উপলক্ষে জাতীয় অর্থনীতিতে এক ব্যাপক আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সারা বছর পশুপালনের সঙ্গে বিপুল পরিমাণের বিনিয়োগ জড়িত, এ কাজে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পশুপালন, পশুর খাবার, পশুর চিকিৎসা ও পশু পরিবহনসহ অনেক খাতে এই বিনিয়োগ জড়িত। অন্যদিকে কোরবানির পশুর চামড়া রপ্তানি বাণিজ্যে বিশাল ভূমিকা রাখছে। এ চামড়া পাদুকা শিল্পে, পোশাক, হস্তশিল্পে এক অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিক্রয় ও ব্যবহার উপলক্ষে প্রচুর মানুষ ও প্রতিষ্ঠান নিয়োজিত। চামড়া সংগ্রহ-সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকরণে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ জড়িত। লবণ চামড়া সংরক্ষণের একটি অন্যতম উপাদান, শুধু কোরবানির চামড়া প্রক্রিয়াকরণ উপলক্ষে প্রতি বছর গড়ে সরকারকে ৪০ হাজার টন লবণ শুল্কমুক্ত আমদানির উদ্যোগ নিতে হয়। কোরবানির গোশত রান্নার কাজে ব্যবহৃত মসলা বাবদ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয় এ মৌসুমে। এ ছাড়া কোরবানির সময় ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রীরও বিশাল বাজার রয়েছে দেশজুড়ে।
কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে অনেক মাদ্রাসা, এতিমখানার কিছু আয় হয়। অনেক গরিব, শ্রমিক এবং মজুরের জীবন-জীবিকা ব্যবস্থা জড়িত পশুর হাটের ক্রয়-বিক্রয়ে, পশু বাড়িতে আনা, কোরবানি দেওয়া ও গোশত কাটাকাটির সঙ্গে। সমাজের অনেক গরিব-মিসকিন আছেন, যাদের বছরে একবার গোশত খাওয়ার সুযোগ হয় শুধু এই কোরবানির ঈদে।
অন্যদিকে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির কারণে গত এক বছরে গোশত বেচাবিক্রি বাজারে কম। করোনা দুর্যোগের কারণে মানুষের মধ্যে ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এবারও যদি পশু অবিক্রীত থেকে যায়, তাহলে অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। অনেকে বলছেন, অনলাইন হাট থেকে পশু কেনাবেচা করতে। কিন্তু অনলাইন বিকল্প বাজার এখনো আমাদের দেশে সেভাবে গড়ে ওঠেনি। আর পশু পরিবহনের ঝামেলা তো রয়েই যাচ্ছে। তার পরও যারা সেখান থেকে সুবিধা নেওয়ার তারা নিতে পারেন। কিন্তু স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থাপনা এটার ওপর ভরসা করে বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হবে না।
অবশ্য অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, প্রয়োজনে মানতে বাধ্য করতে হবে। সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে এবং স্বাস্থ্যবিধি মানলে ধর্মীয় বিধান ও জীবন দু’টোই রক্ষা পাবে, করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে আসবে।
লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক
