ফাউন্ডার অব বাহরুল উলুম মাওলানা জাহেদ হোছাইন এর জীবনও কর্ম

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৭ years ago

এম.এরশাদুর রহমান : যে ব্যাক্তির জন্ম না হলে বাহরুল উলুম মাদ্রাসার জন্ম হত না ,মহেশ খালীয়া পাড়া তথা মধ্য হ্নীলায় এত শিক্ষিত মানুষ হতনা তিনি আর কেউ নন আলহাজ্ব হয়রত মাওলানা মুহাম্মদ জাহেদ হোছাইন সাহেব, তিনি ১৮/০২/১৯৬০ সালে টেকনাফ উপজেলার ১নং হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের মহেশ খালীয়া পাড়া গ্রামে এক স্বনাম ধন্য মিয়াজি পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন ওনার গর্বিত পিতার নাম কবির হোছাইন ,মায়ের নাম ছায়েরা বাহার ।

ওনারা ৪ ভাই ৩ বোন এর মধ্যে তিনি দ্বিতীয় ছিলেন ভাই গুলো হলো ০১ মাওলানা বশির আহমদ ০২ আলী মিয়া ০৩ আবুল কাশেম । দাদা ছিলেন মদন আলী মিয়াজি । মদন আলী মিয়াজির চার সন্তান ০১ আবুল হোসাইন মিয়াজি ০২ কবির হোছাইন ০৩ আজম উল্লাহ ০৪ আবু তালেব । তিনি মিয়াজি পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছেন বিধায় ছোট্র কাল থেকে ধর্মের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তাই রীতিমত তিনি পড়ালেখা করে ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলেন ।১৯৭২ সালে দাখিল পাশ করেন ।১৯৭৪ সালে আলিম পাশ করেন ।১৯৭৬ সালে ফাজিল পাশ করেন । ১৯৭৮ সালে কামিল পাশ করেন ।পড়ালেখা শেষ করে তিনি পবিত্র ভুমি সৌদি আরব চলে যান সেখানে একটি রুটির দোকানে চাকরি নেন ।এবং হজ্ব পালন করেন তিনি এলাকার মুরুব্বিদের ডাকে দেশে চলে আসেন । দেশে এসে কিছু দিন তিনি রঙিখালী ফাজিল মাদ্রাসায় চাকরি করেন ।ছোট্র কালে থেকে তিনি ভাবতেন কি ভাবে একটি দ্বীনি শিক্ষা নিকেতন প্রতিষ্টা করা যায় ।সে ভাবনা থেকে অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য প্রতিষ্টা করলেন মহেশ খালীয়া পাড়া ভ’মিহীন সমবায় সমিতি লিঃ মহেশ খালীয়া পাড়া মৎস্য উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিঃ । ১৯৮০ সালে তিনি এলাকার মুরুব্বিদের নিয়ে তিনি বসলেন আলাচনা একটাই কিভাবে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্টা করা যায় ।

১৯৮০ সালের দিকে সীমান্ত উপজেলাটেকনাফের শিক্ষার হার ছিল অতি নগন্য ।মাদ্রাসা প্রতিষ্টার জন্যে যারা হুজুর কে উৎসা উদ্দীপনা আর্থিক মানসিক কায়িক সহযোগিতা করেছেন তারা হলেন০১ হাজী মাঈন উদ্দীন ০২আলহাজ্ব আলী মিয়া ০৩ হাজী রৌশন আলী ০৪ হাজী ইফসুফ আলী০৫ হাজী আব্দু ছত্তার ০৬ মাওলানা বশির আহম্মদ সহ আরো অনেকে ।কেউ বাশ কেই গাছ কেউ নারা বিশালি ছন দিয়ে কুড়ে ঘরের মত করে বর্তমান সিকদারিয়া জামে মসজিদের পার্শ্বে প্রতিষ্টা করলেন বাহরুল উলুম মাদ্রাসা ।মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগ দিবেন কিন্তু কোথায় পাবেন তাদের সম্মানি ?মহান আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করে শিক্ষক নিয়োগ দিলেন এলাকার ছেলে মেয়েরা পড়ালেখার আগ্রহ নিয়ে মাদ্রাসায় আসতে লাগলেন ।শুরু হয়ে গেল পড়ালেখা ।জ্বলতে শুরু করল শিক্ষার আলো প্রতিটি ঘরে ঘরে ।

আমার দেখা বাহরুল উলুমঃ

১৯৯২ সালে যখন আমি বাহরুল উলুম মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র তখন সিকদারিয়া জামে মসজিদ ছিল মাটির দেয়ালের টিনের ছাউনির একটি মসজিদ । দক্ষিণ পার্শ্বে ছিল তার বিশাল এক বটগাছ উঠানে ছিল বড় বড় দুইটি গুম গাছ ।মাদ্রাসায় তখন ছিল দুইটি লম্বা লম্বা ঘর । একটি ছিল পুর্ব পশ্চিম অন্যটি ছিল উত্তর দক্ষিণ। মসজিদের বারান্দায় উঠানে শিশু থেকে ২য় শ্রেণী র্পয়ন্ত ছাত্র ছাত্রীদের ক্লাস নিতেন ।মাওলানা জাহেদ হোসাইন অত্যন্ত আদর যতœ করে পড়াতেন । বার বার বুঝিয়ে দিতেন ।এলাকায় তখনো শিক্ষার হার কম ছিল । খাতা নেই কলম নেই বই নেই ।তবে যাওয়া আর আসা । মসজিদের উঠানে দাড়িঁয়ে জোরে জোরে পড়াত ১,২,৩,৪,৫,৬,৭,৮,৯,১০।

আলিফ,বা ,তা ছা .জিম .হা .খা .দাল জাল ।অ,আ,ই,ঈ,উ ,ঊ,্্ঋ,এ ,ঐ,ও ,ঔ ।ক,খ,গ,ঘ,ঙ

এই ভাবে পড়াতেন ,খাতা কলম ছিলনা বলে উঠানে মাটির উপর গুম গাছের পাতার শাখা দিয়ে লিখতাম ।

লিখে লিখে আবার মুছে দিতাম । যারা আমাদের কে পড়াতেন মাওলানা দিলদার আহম্মদ,মাওলানা দলিল আহম্মদ,মাওলানা আবুল কাশেম আজাদ ,মাওলানা শামসুল আলম হায়দরি , মাওলানা এহেসানুল হক বদরি,মাওলানা এখলাছুর রহমান,মাস্টার নূরুল হোসাইন ছিদ্দিকী,মাস্টার আলমগীর , মাস্টার নূরুল ইসলাম ,মাস্টার রমজান আলী ,মাস্টার আহম্মদ হোসাইন ।তখন আমাদের প্রিয় স্যার ছিল আহম্মদ হোসাইন ।১৯৯৪ সালে যখন আমি চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র তখন ঘুর্ণিঝরে মাদ্রাসা ভেঙে যায় তখন মাওলানা জাহেদ হুজুরের চোখে ঘুম ছিলনা ,মনে শান্তি নেই ছাত্র ছাত্রীদের কে কোথায় পড়াবেন ।এই চিন্তায় দিবস রজনী কাটে এলাকায় সবার সহয়োগিতায় মাদ্রাসার শ্রেণী কক্ষ মেরামত করা হল ।প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মাদ্রাসার ক্যাশিয়ার ছিল আমার দাদা মঈন উদ্দীন ।মাওলানা জাহেদ এর টাকার প্রয়োজন হলে ছোট্র একটি কাগজে লিখে দিতেন

চাচা সালাম নিবেন

মাদ্রাসার প্রয়োজনে ২০০০টাকা প্রয়োজনে পত্র বাহক মাস্টার আহম্মদ হোসাইন কে দিবেন ।

ইতি :

এম,জা ,হোছাইন

এই ভাবে তিনি আমার দাদার কাছ থেকে মাদ্রাসার টাকা নিতেন । প্রতি বছর মাদ্রাসায় বার্ষিক সভার আয়োজন করতেন ।নামী দামী বক্তার দাওয়াত দিতেন । এলাকার সকলেই তাকে খুব বেশি ভক্তিও শ্রদ্ধা করতেন ।এক কথায় পীর মানতেন ।হুজুরের কথার বাইরে কোন কাজ করতেন না । মাদ্রাসা মসজিদ কবরস্থান এই তিন পবিত্র জিনিস নিয়েই ছিলেন তিনি । এই তিন জিনিসকে কি ভাবে উন্নতি করা যায় সেটা নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখতেন । কি ভাবে এই তিন জিনিসকে ফুলে ফুলে সাজানো যায় ।ধীরে ধীরে এলাকার শিক্ষার বাড়তে লাগল ।বাহরুল উলুম মাদ্রাসাকে কমপ্লেক্স করার জন্য তিনি অপ্রাণ চেষ্টা করেছেন ।অত্যান্ত মজার ব্যাপার হল হুজুর তখনো বিয়ে করেনি ।আমার দারারা তাকে বিয়ের জন্য ছাপ দিতেন ।নাছোড় বান্দা তিনি এই তিন জিনসকে এই ভাবে রেখে তিনি বিয়ে করবেননা ।বিয়ে করলে সংসারের প্রতি মনোযোগ চলে যাবে তাই তিনি বিয়ে কে বাই বাই টা টা জানাতেন । কি করবে বিয়েত করকে হবে মুরুব্বিন্ ছাপ দিতেন বাদ দিলে মাইন করবেন হুজুর বললেন বউ দেখ তাইলে ।বউ দেখা হল ককস বাজারের বিখ্যাত জমিদার সৈয়দ মিয়ার কন্যা এখন বিয়ের স্বর্ণ কোথায় পাবে বিয়েতে টাকা হুজুর টাকা পাবে কোথায়?তার একটি টাকাও জমা নেই ।টাকা কোথায় থাকবে বেতন যা পাই তা দিয়ে খেয়ে ধেয়ে জীবন চালায় ।চায়ের দোকানে বসলে তিনি সবার চায়ের বিল দিতেন ।ককস বজারে গেলে হোটেল রয়েলে রুম ভাড়া দিতে হোটেলে খেয়ে খেয়ে টাকা শেষ করে দিতেন তখন কি এত টাকা বেতন ছিল ?

বিয়ে : ৩১শে মে ১৯৯৬ ইং তারিখে ককস বাজারের বিখ্যাত জমিদার সৈয়দ মিয়ার মেয়ে লুৎফর নেছা তাহেরার সাথে হুজুরের বিয়ে হয়। তখন আমি ৬ষ্ট শ্রেণীর ছাত্র। আমরা হুজুরের বিয়েতে গিয়েছিলাম ।সবাইকে জমিদার বাড়ীর দ্বিতীয় তলায় খাবার দেওয়া হল। বউ বাড়ীতে নিয়ে আসা হল এখন বর সাজাবে কে?তখন আমাদের প্রিয় শিক্ষক হাফেজ মাওলানা জহির উদ্দীন সাহেব হুজুরকে বর সাজালেন ।

ছেলে মেয়ে

মাওলানা জাহেদ হোছাইন এর ৩ ছেলে ৩ মেয়ে

০১ তারেক হোছাইন ,

জন্ম ৭/০৩/১৯৯৮

ছাত্র

০২উম্মুল ওয়ারা কাউছার

নয়নমণি

জন্মঃ২১/০২/২০০০

ছাত্রী

০৩ সৈয়দ ফজিলাতুন নেছা ছোট্র মণি

জন্ম : ১৫/০৩/২০০২

ছাত্রী

০৪সাখাওয়াত হোছাইন ছোট্র মিয়া

জন্ম : ৫/৬/২০০৬

ছাত্র

০৫ সৈয়দা মুবাচ্ছিরা খাইরুন নেছা

জন্ম : ৪/৫/২০০৮

ছাত্রী

০৬ হাসনাত হোছাইন

জন্ম : ১২/০৩/২০১০

জনম জনম মানুষের ছেলে মেয়েকে মানুষ করেছেন তিনি । তিনি নিলোভ ছিলেন । না হলে অনেক অনেক সম্পদের অধিকারী হতে পারতেন ।মাওলানা জাহেদ সব সময় ভাবতেন —-

মায়ের কুলই মাদ্রাসা হোক

বিদ্যালয় হোক জ্ঞান বাতি ।

আধুনিক এই বাংলা দেশে

ঈড়া হোক সবার সাথী ।

যারা পড়ে তারাই গড়ে

স্বপ্ন দেখায় জাতিকে ।

জীবন দিয়ে হলেও

রক্ষা করে দেশের মাটিকে ।

তিনি আরো চিন্তা করতেন

০১/সে মানুষ গুলো কত ভাগ্যবান

যারা আল্লাহর বাণী কোরআন পেয়েছেন ।

০২/কোরাআনের মত বিশাল নিয়ামত পেয়েও মুসলিম জাতি কেন আজ অভাগা ।

বিদ্যার ফেরিওয়ালা

তুমি ছিলে বিদ্যার ফেরিওয়ালা

গারা দিবস রজনীতে বিদ্যাকে ফেরি করে বেড়াতে

কেউ কিনুক না কিনুক

তাতে তোমার বিশ্রাম নেই ।

তবু তুমি বিদ্যাকে ফেরি করে বেড়াতে

১৯৮০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ৩২ টি বছর

নাফ পাড়ের এই জন পদে

তুমি বিদ্যাকে বিলিয়েছ।

তার বিনিময়ে আমরা তোমাকে

কিছুই দিতে পারিনাই ।

আমরা দুঃখিত ,আমরা লজ্জিত ।

ভালো তরকারি হয়ত রান্না হয়নি খেয়ে না খেয়ে

বিদ্যার পুতুলি মাথায় নিয়ে দিক বেদিক ছুটে চলেছ ।

বিদ্যা ফেরি করতে গিয়ে শুনেছ কতজনের কতকথা ।

পেয়েছিলে মনে প্রাণে লক্ষ হাজার শত ব্যাথা ।

তবু তুমি বিদ্যা বিতরণ থেকে একটি বারের জন্যও

অবসর নাওনি ।

দেশে বিদেশে তার অসংখ্য ছাত্র ছাত্রী রয়েছে ।

জীবনের শেষ বয়সে এসে তিনি অসুস্থ হন তাকে ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বাভাবিক জীবনে তিনি তেমন অসুস্থ হতেন না । দেড় বছর যাবৎ অসুখে ভোগার পরে তিনি একটু সুস্থ হয়েছিলেন ।১২ই মার্চ ২০১২ ইং আমি কক্স বাজার চাকরি হতে আমাদের সবার প্রিয় জাহেদ হুজুরকে দেখতে আসি ,তাকে দেখতে আসেন বাহরুল উলুম মাদ্রাসার সহ সুপার মাওলানা মুফিজ ইকবাল আমরা হুজুরকে ধরে ধরে দেখতেছি হুজুর ও আমাদেরকে নয়ন ভরে দেখতেছেন ,দেখতে দেখতে ৯.৩৫ মিনিটের সময় তিনি এদিক সেদিক তাকালেন আমরাও জোরে জোরে কলিমা তায়য়িবা পাঠ করতে লাগলাম তিনিও পাঠ করলেন ,কলিমা পাঠ করতে করতে তিনি দুলে পরলেন ।আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে গেলেন লাখ লাখ মানুষকে কাদিঁয়ে ।