মানবপাচারের অভিযোগ : তেজগাঁও কলেজের শিক্ষক টেকনাফের আছেম গ্রেফতার, অধরা পিতা র্শীষ ডন আনোয়ার

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৮ years ago

: টেকনাফের আলোচিত মানব পাচারকারী মোহাম্মদ আছেম (৩৫) পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) হাতে গ্রেফতার হয়েছে। সে রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের বর্তমান শিক্ষক । তার বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগে বিভিন্ন থানায় ৩ টি মামলা রয়েছে। আছেম আটক হলেও এখনো অধরা রয়েছেন পিতা মানব পাচারের র্শীষ ডন আনোয়ার, ভাই মো: কোবায়েত, মো: জাবের মোস্তফাসহ অনেকে। এ ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় চলছে।
২০ আগস্ট সোমবার সকালে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম এই তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘আছেমের বাবা আনোয়ার হোসেন ও বড়ভাই মো: কোবায়েত দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়া রয়েছেন। এই সুবাদে সে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। কক্সবাজার ও টেকনাফ দিয়ে সাগর পথে অবৈধভাবে শতশত মানুষকে তারা মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছে। মালয়েশিয়া পাঠানোর পর বিভিন্ন ব্যক্তিকে তারা আটকে রেখে নির্যাতন এবং বাংলাদেশে থাকা তাদের আত্মীয়দের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করতো। আছেম মুক্তিপণের টাকা তার আত্মীয়-স্বজন, মা ও নিজের অ্যাকাউন্টে জমা রেখেছে-এমন তথ্য আমরা পেয়েছি।’ তবে একটি সুত্র জানিয়েছে, আটক আছেমের বাবা আনোয়ার হোসেন বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন।

সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সাগর পথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের গডফাদার মোহাম্মদ আছেম। আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী কক্সবাজার-টেকনাফ-সেন্টমার্টিন্স সাগর চ্যানেল দিয়ে গত কয়েক বছরে হাজার হাজার মানুষকে মালয়েশিয়া পাচার করেছে। সাগর পথে মালয়েশিয়ার যাওয়ার সময় অনেক বাংলাদেশি মারাও গেছেন। এখনও অনেক মানুষ নিখোঁজ। তারা দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার-থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ায় সাগর পথে মানবপাচার করে মুক্তিপণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের মালিক হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এই সংঘবদ্ধ চক্রটি কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে কাজ করছে। তারা গ্রুপ হয়ে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছে। ২০১৪ সালে এই চক্রের সদস্যরা সিরাজগঞ্জের মাসুদকে মালয়েশিয়ায় পাচার করে। এরপর পাচারকারীরা ফোনে মুক্তিপণ হিসেবে ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা দারি করে। পরে মাসুদের বাবা আব্দুল ছালাম ইসলামী ব্যাংকের মহাখালী শাখার একটি অ্যাকাউন্টে ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা পাঠায়। কিন্তু এরপরও তার ছেলে মুক্তি না পাওয়ায় এই ঘটনায় তিনি উল্লাপাড়ায় একটি মামলা করেন। সিআইডি এই মামলাটি তদন্ত করে জানতে পারে একটি আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ চক্র এই পাচারের সঙ্গে জড়িত। এভাবে মানুষ পাচার করে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তারা। এরপর সিআইডি অর্থ লেনদেনের প্রবাহ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লিংক চার্ট থেকে একে একে জড়িতদের খুঁজে পায়। এরপর গত বছরের ২ মে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে সিআইডি’র পুলিশ পরিদর্শক আব্দুর রাজ্জাক খান বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। এরপর তদন্ত করে পুলিশ মানবপাচার চক্রের সব সদস্যের পরিচয় জানতে পারে।’

মোল্যা নজরুল বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের বাংলাদেশের প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী মূলহোতা মোহাম্মদ আছেম। তাকে গত ১৯ আগস্ট কারওয়ান বাজার এলাকা থেকে সিআইডি গ্রেফতার করে। আছেমের বাবা আনোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় ছিলেন এবং তার বড়ভাই মোহাম্মদ কোবায়েদ সেও মালয়েশিয়ায়। এই সুবাদে তারা আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সঙ্গে যোগ দেয়। আছেম ২০১০ সালে তাদের সঙ্গে মানবপাচারে কাজ শুরু করে। আছেম ও তার ছোটভাই জাবের মোস্তফা ওরফে জাবেদ মানবপাচারের জন্য তারা প্রথমেই বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় দালাল নিয়োগ করে। দালালরা লোক ঠিক করে নিয়ে আসে। এরপর তাদের কাছ থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার খরচ নিয়ে টেকনাফে নিয়ে যাওয়া হয়। টেকনাফ থেকে ট্রলারে করে মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে রাখা হয়। সেখানে পাচারকৃত লোকদের আটকে রাখে। এরপর নির্যাতন করে বাংলাদেশে থাকা তাদের স্বজনদের কাছে মুক্তিপণ চায়। এরপর আছেম ও তার সহযোগিরা মুক্তিপণ আদায় করে। আর যারা মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হয় তাদের থাইল্যান্ডের জঙ্গলে মেরে ফেলা হয়। নেওয়ার পর তাদের হত্যা করা হয়।’
চক্রটি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা নিতো। এছাড়াও নগদ ক্যাশ নিয়ে থাকে। আছেম, তার ছোটভাই জাবের মোস্তফা ওরফে জাবের , মা খাদিজা বেগম এবং তার সহযোগী আরিফ, একরাম, ওসমান সারোয়ারের নামে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, টেকনাফে বিভিন্ন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তারা এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে মুক্তিপণের টাকা সংগ্রহ করে বলেও জানিয়েছে সিআইডি।
আছেম মানবপাচারের টাকায় রাজধানীতে এসিএম করপোরেশন নামে একটি রিক্রটিং এজেন্সি খুলেছে। এই প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টেও অনেক টাকা রাখে। সেগুলো এই প্রতিষ্ঠানের ফাইন্যান্স ম্যানেজার আরিফুজ্জামান আকন্দ ওরফে আরিফ তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নিয়েছে বলেও সিআইডি অভিযোগ করেছে।

মোল্যা নজরুল বলেন, ‘আছেম পাচারের টাকা দিয়ে টেকনাফে বাড়ি ও জমি কিনেছে। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাতেও জমি কিনেছে। এগুলোসব অবৈধ টাকা।’
আছেম বর্তমানে পূর্ব রাজাবাজারে বসবাস করেন। তিনি তেজগাঁও কলেজের বিবিএ ডিপার্টমেন্টের প্রভাষক। তার গ্রামের বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার মৌলভীপাড়া এলাকায়। তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং ও মানবপাচারের তিনটি মামলা আছে। একটি সিরাজগঞ্জের উল্লাাপাড়া থানায়, একটি রাজধানীর বনানী এবং অপর মামলাটি বাজিতপুর থানায় মানবপাচার আইনে করা হয়েছে। গত পাঁচদিন আগে তাকে সিআইডি গ্রেফতার করেছিল, কিন্তু তিনদিনের মাথায় তার জামিন হলে সে আবার বের হয়ে আসে।
খোজঁ নিয়ে জানা যায়, স্বাধীনতা পরবর্তী কোন এক সময় আনোয়ার হোসেন মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে টেকনাফ আসেন। টেকনাফে স্থানীয় মৌলভী পাড়ায় বিয়ে করেন। এক সময় স্থানীয় টেকনাফ সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার মিযার বসত ভিটার সাথে লাগোয়া স্থানে জমি কিনে স্থায়ী নিবাস গড়েন।

এক পর্যায়ে আর্থিক উন্নতির আশায় মালয়েশিয়া পাড়ি জমান আনোয়ার। সেখানে বসে মানব পাচার ও হুন্ডি ব্যবসা শুরু করেন। তার সাথে রয়েছে মিয়ানমার ও টেকনাফ কেন্দ্রীক সিন্ডিকেট। টেকনাফে বসে স্ত্রী খাদিজা বেগম ও তিন সন্ত্রান মো: কোবায়েদ, মো: আছেম ও মো: জাবের মোস্তফা টাকার লেনদেন করতে। কয়েক বছর আগে আটক আছেমেরে মা খাদিজা বেগমকে সিআইডি মানব পাচার মামলায় টেকনাফ থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন। এর আগে ২০১৫ সালের দিকে কক্সবাজার আদালত পাড়া থেকে আটক মালয়েশিয়া গামীদের জিম্মায় নয়ে ফের পাচার চেষ্টার অপরাধে মো: জাবের মোস্তফাকেও আটক করেছিলো পুলিশ। মো: জাবের বর্তমানে টেকনাফ আলো শফিং কমপ্লেক্সে “ওমেন ক্লাব ” নামের একটি দোকানের কর্নধার।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি রনজিত কুমার বড়ুয়া জানান, ধৃত অছেমের গোটা পরিবারই মানব পাচারের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে। এরা কৌশলগত কারনে টেকনাফ ছেড়ে বেশ কয়েক বছর ধরে ঢাকা চট্টগামে অবস্থান নিয়েছে। তাদের বিরোদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে যা অন্য সংস্থা তদন্ত করছে।