নওগাঁর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ইসলামগাঁথী মসজিদ ও মঠ

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৬ years ago

কবির হোসেন : নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় আত্রাই নদীর কোল ঘেঁষে ইসলামগাঁথী গ্রামে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট ইসলামগাঁথী মসজিদের অবস্থান। মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের মসজিদটি ঠিক কবে বা কে নির্মাণ করেছিল, এই তথ্য গ্রামের বা আশেপাশের এলাকার কেউ বলতে পারেনা। নওগাঁ জেলার ইতিহাসে প্রত্যন্ত গ্রামের এই মসজিদ সম্পর্কে দু’লাইন লেখাও খুজে পাওয়া যায়না। গ্রামের বায়োজ্যেষ্ঠদের মুখের কথার ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, মসজিদটি পাঁচশ বছরেরও বেশি পুরাতন।

ইসলামগাঁথী গ্রামের কৃতিসন্তান নওগাঁ লিখিয়ে সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, লেখক ও লিখিয়ে প্রকাশনীর কণর্ধার রবিউল ফিরোজের তথ্য থেকে জানা যায়, সুবেদার ইসলাম খানের আমলে (১৬০৮-১৬১৩) ইসলাম খাঁ কর্তৃক আনুমানিক মধ্যযুগে এই মসজিদটি স্থাপন করা হয় বলে ধারণা পাওয়া যায়। তবে মসজিদটির গঠন প্রণালী ও ইসলাম খানের শাষণামলের ইতিহাস থেকে বিবেচনা করলে বিষয়টি আরও অধিক গবেষণার দাবি রাখে।

পূর্ব পরিচিত লেখক রবিউল ফিরোজ ভাইয়ের টাইমলাইনের মাধ্যমে মধ্যযুগীয় এই মসজিদের বিষয়টি আমার নজরে আসে। টাইমলাইনে মসজিদটির বর্তমান অবস্থার বেহাল দশা ও আর্থিক সংকটের কারণে পুনঃ নির্মাণ বা সংস্কার করা সম্ভব হচ্ছেনা জানিয়ে তার আঁকুতি ভরা লেখা এবং কয়েকটি ছবি আপলোড করা। আমি মসজিদটির ছবিগুলো বেশ ভালোভাবে খেয়াল করলাম। তিন গুম্বজওয়ালা মসজিদ। মধ্যযুগীয় অন্যসব স্থাপনার মতই। পাশের উচু মিনারের ছবিতে আমার চোখ আটকে গেল। পোড়া মাটির টেরাকোটার অপরূপ কারুকার্য করা। মিনারটা আর একটু ভালোভাবে খেয়াল করতেই সন্দেহের উদ্বেগ জন্মালো। উচু মিনারটি মসজিদের নয়। কেননা মিনারটিতে অসংখ্য প্রাণীর প্রতিকৃতি এবং ধর্মীয় প্রতিকৃতি। নিশ্চয়ই এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মঠ বা অন্য কোন স্থাপনা।

মঠ বলতে এমন একটি অবকাঠামোকে বুঝানো হয় যেখানে কোন এক বিশেষ সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ ধর্মীয় কারণে অবস্থান করেন এবং সেখানে উক্ত ধর্মীয় বিভিন্ন গুরুগণ উপদেশ প্রদান ও শিক্ষাদান করেন। মসজিদ ও মঠ পাশাপাশি। বিষয়টা নিয়ে আমার আরও অধিক আগ্রহ জন্মায়। একটু রিসার্চ করা প্রয়োজন। কারণ দুই ধর্মের আলাদা স্থাপনা এক স্থানে কিভাবে থাকতে পারে। ইতিহাসে অনেক ঘটনা আছে যেখানে দেখা যায়, এক ধর্মের আধিপত্য হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে অন্য ধর্মের স্থাপনা উচ্ছেদ কিংবা নিজেদের ধর্মের প্রচার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এখানে বিষয়টা তার ব্যতিক্রম।

ইসলামগাঁথী গ্রামের এই মসজিদ ও মঠ সম্পর্কে অনলাইনে অনেক সময় ব্যয় করেও কোন তথ্য পেলাম না (সম্পৃতি উইকিপিডিয়া সার্চ করে যে তথ্য পাবেন তা আমার সংযুক্ত করা)। জেলা তথ্য বাতায়নেও কোন তথ্য নাই। এমনকি আত্রাই উপজেলা পরিষদ কর্তৃকও কখনো এই ঐতিহ্য নিয়ে কোন কাজ করা হয়নি। রবিউল ফিরোজের সঙ্গে কথা বলে মসজিদ ও মঠের অবস্থান জেনে নিলাম। নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার বিশা ইউনিয়নে ইসলামগাঁথী গ্রাম। সঠিক তথ্য ও ইতিহাস উৎঘাটন করতে হলে অবশ্যই আগে সেখানে যাওয়া উচিৎ। আমি ইতিহাসবেত্তা কিংবা ইতিহাসের ছাত্রও নই। তবে একটা রিপোর্ট করে যদি বিষয়টা কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে পারি। করোনা মহামারী এবং কর্মব্যস্ততায় অনেকদিন আশাটাকে ধামাচাপা দিয়ে রাখলাম। অবশেষে দশদিনের ছুটি মিলতেই ছোট মামাকে নিয়ে ২৩ শে অক্টোবর ২০২০ তারিখে বেরিয়ে পড়ি ইসলামগাঁথী গ্রামের উদ্দেশ্যে।

বগুড়া বা ঢাকা থেকে নাটোরের সিংড়া হয়ে আত্রাই উপজেলার বিশা ইউনিয়নের ইসলামগাঁথী গ্রামে খুব সহজেই যাওয়া যায়। এই মসজিদ সম্পর্কে জানার বহু আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিলো প্রত্যন্ত অঞ্চলের লেখক রবিউল ফিরোজ ভাইয়ের বাড়িতে একদিন মেহমান হবো। কিন্তু বিভিন্ন কারণে যাওয়া হয়ে উঠেনি। তাই এবার সুযোগ টাকে হাত ছাড়া করিনি।

আমরা আত্রাই উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য কিংবা ঐতিহাসিক/দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে পর্যালোচনা করলে ঘুরেফিরে কবিগুরুর পতিসর কাচারীবাড়ি, ভবানীপুর রাজবাড়ি, সুটিকিগাঁথা রাবার ড্যাম, গান্দীজির আশ্রম অথবা সর্বোচ্চ শাহাগলা ইউনিয়নের কদমতলা ও চলনবিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা জানি।

কিন্তু এই স্থানগুলোর চেয়েও অধিক গুরুত্ব বহন করে ইসলামগাঁথী গ্রামের এই প্রাচীন মসজিদ ও মঠ। জগদাশ বাজার/চকবিষ্টপুর এর পিছনেই ঐতিহাসিক আত্রাই নদী। আত্রাই নদীর অপর পাশেই নদীর তীর ঘেসে এই স্থাপনা। প্রাচীন সকল সভ্যতায় নদী কেন্দ্রীক। তবে দেখা যায়, অনেক সময় নদীর গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় মূল স্থাপনা থেকে নদীর অবস্থান দূরে সরে যায়। তবে কি এটা বড় কোন সভ্যতার নির্দশন। যার অনেক অংশই বর্তমানে বিলীন হওয়া সত্ত্বেও এই অংশ টিঁকিয়ে আছে নদীর তীরে।

আত্রাই উপজেলার প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাস খুবই ক্ষীণ। ব্রিটিশ সরকার আত্রাই নদীর নামকরণ করে। আর এই জনপদের নাম হয় আত্রাই। তবে আত্রাই নদীর ইতিহাস বহু পুরাতন। এই আত্রাই নদীর কথা মহাভারতেও আছে। এই হিসেবে হিন্দু স্থাপত্য মঠটি ইতিহাসের নির্দিষ্ট কোন জনগোষ্ঠীর সেকেলের কোন সাম্রাজ্যকে নির্দেশ করে। চলনবিলের ইতিহাস থেকে এই জনপদের সঠিক তথ্য বের করতে হলে আমাদের প্রাচীনকালের উরিষ্যা অঞ্চলের চোল রাজবংশ এবং চোল সমুদ্র বা চোল হ্রদের সঠিক ইতিহাস খুজে বের করতে হবে। যা ভূতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় বিষয়।

অপরদিকে মধ্যযুগে অনেক মঠ ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। এই মঠগুলি কৃষকদের সুদের বিনিময়ে ঋণ দিত । কৃষকরা এই ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে মঠ গুলি তাদের জমি বাজেয়াপ্ত করতো । ইসলামগাঁথী গ্রামে এখনও অনেক হিন্দু বসতি রয়েছে। তবে সেটি মঠ কিংবা তাদের অন্য কোন ধর্মীয় স্থাপনা কি-না, সে সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা নেই। এমনও হতে পারে, সেকালে প্রত্যন্ত এই অঞ্চলের মুসলমানদের ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান কম থাকায় মসজিদটির পাশাপাশি মিনার হিসেবেই সেটি নির্মাণ করেছিল। আর তাতে সনাতনীয় প্রভাব বিস্তার করেছিল। যা তাদের অজ্ঞতা। তবে এখানকার টেরাকোটার বৈশিষ্ট্য আলোকপাত করলে বিষয়টি আরও অধিক কঠিনতর হয়। লোকশ্রুতি আছে, এই মসজিদটি নাকি এক রাতেই নির্মাণ করা হয়েছে। তবে লোকশ্রুতি পরীক্ষালব্দ কোন সত্যতা প্রমাণ করেনা। এটা নিশ্চিত হওয়া যায়, মধ্যযুগে ভারতবর্ষে মুসলিম শাষণামলে মসজিদটি নির্মিত। তবে কোন সময় মঠটি নির্মিত তার ধারণা পেতে হলে প্রত্নতাত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।

মসজিদটিতে বর্তমানে মুসল্লিরা নিয়মিত নামাজ পড়ে। নান্দনিক বৈশিষ্ট্যে ভরপুর মসজিদটি যুগের বদলে স্বকীয়তা হারাতে বসেছে। মসজিদটি সংরক্ষণে সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করে এলাকার সকল সুধীজন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত বিশেষ করে আশেপাশের অঞ্চলের অনেকেই দেখতে আসেন ইসলামগাঁথী গ্রামের এই ঐতিহাসিক মসজিদ ও মঠ। বিস্তর প্রচার ও সরকারের হস্তক্ষেপে স্থানটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এখানে ঘুরতে এসে একইদিনে ভবানীপুর রাজবাড়ী, গান্দীজি আশ্রম, পতিসর কবিগুরুর কাচারী বাড়ী ও বর্ষায় এলে চলনবিলের অপরুপ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। তাই হাতে একদিন অবসর সময় নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন আত্রাই উপজেলার ঐতিহাসিক এই স্থাপনা দেখতে।

আপনাদের ভ্রমণের মাধ্যমেই স্থানটি পরিচিতি পেতে পারে। ভূ-তাত্ত্বিক ও্ নৃ-তাত্ত্বিক গবেষকদের জন্য হতে পারে নতুন সম্ভবনা। একসময় হয়তো স্থানটির সঠিক ইতিহাস আমাদের সামনে আসবে। রচিত হবে অত্র অঞ্চলের কোন এক মানবগোষ্ঠীর গোপন হওয়া ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা।

যাতায়াত পথ: নওগাঁ জেলা সদর থেকে সিএনজিতে আত্রাই থানা সদর, সাহেবগন্জ থেকে অটো রিকসায় চেপে চকবিষ্টপুর যেতে হবে। তারপর নদী পার হলেই পৌঁছে যাবেন ইসলামগাঁথী গ্রামে। অথবা নাটোর থেকে বাসে সিংড়া হয়েও এখানে আসা যাবে খুব সহজে। ঢাকা বা দেশের যেকোন প্রান্ত থেকে ট্রেন যোগেও আত্রাই স্টেশনে আসা যায় খুব সহজে। বিমান পথে আসতে চাইলে প্রথমে আপনাকে আসতে হবে রাজশাহী শাহ মখদুম বিমানবন্দরে। তারপর বগুড়াগামী বাস যোগে সিংড়া। তারপর গন্তব্যস্থল।

কবির হোসেন

কবি ও গল্পকার

kabirhossain02021998@gmail.com

০১৩০০-৮৭৭৩৮৮

লেখক পরিচিতি

নামঃ কবির হোসেন

পেশাঃ সরকারি চাকরি

সংস্থাঃ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়

ঢাকা, বাংলাদেশ।

ই-মেইলঃ kabirhossain02021998@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৩০০-৮৭৭৩৮৮