তালেবানরা আফগানের রাজধানী কাবুলের খুব কাছাকাছি

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : তালেবানরা পৌঁছে গেছে রাজধানী কাবুলের খুব কাছাকাছি। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র তার দেশের দূতাবাসকর্মী, নাগরিকদের উদ্ধারে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও আতঙ্কিত অন্যান্য দেশ। তারা এরই মধ্যে নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

কূটনীতিকদের তড়িঘড়ি আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে পরিস্থিতি যেমন হয়, এই মুহূর্তে আফগানিস্তানে ঠিক সেই অবস্থা। অনলাইন বিবিসি বলেছে, শুক্রবার তালেবানরা রাজধানী কাবুল থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল। তবে আজ শনিবার সকালে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল থেকে বলা হয়েছে, এই দূরত্ব আরো কমে গেছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে বর্ণনা করেছেন। বলেছেন, এতে বেসামরিক মানুষকে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে। এরই মধ্যে কমপক্ষে আড়াই লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

২০ বছরের সামরিক অপারেশনের পর আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য বিদেশি সেনাদের প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়ার পরই তালেবানদের নতুন করে উত্থান ঘটে। ২০০১ সালে সর্বশেষ ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল তালেবান সরকারকে। কিন্তু নতুন করে খুব দ্রুততার সঙ্গে তারা পরিস্থিতিকে আগের অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে। বেশির ভাগ এলাকা এখন তালেবানের দখলে। হাঁসফাঁস করছে সরকার। তীব্র থেকে তীব্র হয়েছে লড়াই। এরই মধ্যে অনেক স্থানে প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণির সেনারা আত্মসমর্পণ করেছে। তালেবানদের মোকাবিলা করতে সরকারপন্থিদের কাছে অস্ত্র তুলে দিয়েছেন তিনি।

ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাব দিয়েও তিনি তালেবানদের ক্ষোভ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। সরকারের সঙ্গে যেকোনো আলোচনার আগে আশরাফ গণির পতন দাবি করেছে তালেবানরা। তারা দৃঢ়তার সঙ্গে বলে দিয়েছে, আশরাফ গণি যতক্ষণ ক্ষমতায় থাকবেন, ততক্ষণ সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়। ১৯৯০-এর দশকে তালেবানের অধীনে ছিল আফগানিস্তান। সে সময়ে নারীদেরকে পুরো শরীর-ঢাকা বোরকা পরতে বাধ্য করা হতো। ১০ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের শিক্ষাগ্রহণে ছিল বিধিনিষেধ। নৃশংস শাস্তি দেয়া হতো। এমনকি প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হতো।

শুক্রবার দ্বিতীয় বৃহৎ শহর কান্দাহার ও পার্শ্ববর্তী শহর লস্করগাঁ, পশ্চিমে হেরাত দখল করে নিয়েছে তালেবানরা। বর্তমানে দেশের এক তৃতীয়াংশ প্রাদেশিক রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ তালেবানের হাতে। এ অবস্থায় পেন্টাগণের মুখপাত্র জন কিরবি সাম্প্রতিক এসব ঘটনাকে গভীর উদ্বেগের বলে মন্তব্য করেছেন। তালেবানদের অত্যাসন্ন হুমকির মুখে তালেবান এমন আশঙ্কাকে তেমন গুরুত্ব দেননি তিনি। এর আগে শুক্রবার বলা হয়, কূটনৈতিক স্টাফদের উদ্ধারে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে কমপক্ষে ৩০০০ সেনা আফগানিস্তানে পাঠাবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে পরে বলা হয়েছে, তারা সপ্তাহান্তে পৌঁছতে পারে।

রাজধানী কাবুল থেকে দিনে কয়েক হাজার মানুষকে আকাশপথে সরিয়ে নিতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। এই দেশটিরই গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, তালেবানরা ৩০ দিনের মধ্যে কাবুল দখল করে নিতে পারে। ‘স্পর্শকাতর ম্যাটেরিয়াল’ ধ্বংস করে দিতে একটি ইনসিনেরেটর (কাগজপত্র পুড়িয়ে দেয়া যায় এমন যন্ত্র) এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি দেয়া হয়েছে। এসব ডকুমেন্ট এবং সরঞ্জাম প্রচারণা কাজে ব্যবহার করতে পারে। তাই তা ধ্বংস করে ফেলা হবে।

বৃটেন বলেছে, তারা বৃটিশ নাগরিক এবং আফগানিস্তানে সাবেক স্টাফদের উদ্ধারে ৬০০ সেনা পাঠাচ্ছে। তারা আরো বলেছে, আফগানিস্তানে নিজেদের দূতাবাসে সর্বনি¤œ পর্যায়ে রাখতে চায় স্টাফ সংখ্যা, যেমন করেছে জার্মানি। তবে নিজেদের দূতাবাস পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে ডেনমার্ক ও নরওয়ে। এ অবস্থায় লড়াই বন্ধের জন্য তালেবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ। পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি একটি আহ্বান জােিনয়ছেন। তাদেরকে এটা স্পষ্ট করতে বলেছেন যে, সামরিক উপায়ে ক্ষমতা দখল করা হবে অগ্রহণযোগ্য।

গুতেরাঁ বলেন, প্রতিদিনই এই লড়াইয়ে অধিক থেকে অধিক সংখ্যক নারী ও শিশু মারা যাচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় এই লড়াইয়ের অর্থ হলো, বেসামরিক জনগণের ওপর হত্যালীলা চলবে। এতে সাধারণ মানুষকে সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হবে। তিনি আরো বলেছেন, যেসব স্কুল এবং ক্লিনিক ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে সেখানে খাদ্য এবং ওষুধপত্রের সরবরাহ ক্ষীণ হয়ে আসছে। এ অবস্থায় প্রতিবেশী দেশগুলোকে তাদের সীমান্ত উন্মুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ, যাতে মানুষ নিরাপদ স্থান বেছে নিতে পারেন। জাতিসংঘের হিসাবে শুধু গতমাসে আফগানিস্তানে কমপক্ষে এক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।

রাজধানী কাবুলের আশপাশে অস্থায়ীভিত্তিতে স্থাপন করা হয়েছে তাঁবু। কাবুলে নিরাপত্তা খুঁজছেন এমন বহু মানুষ রাস্তায় ঘুমাচ্ছেন। সেভ দ্য চিলড্রেনের মতে, কয়েকদিনে প্রায় ৭২ হাজার শিশু আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে এসেছে কাবুলে। এসব বাস্তুচ্যুতদের সহায়তা করছেন ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী জুহেল। তিনি বলেন, অস্ত্রবিরতি চাই। তাৎক্ষণিক অস্ত্রবিরতি চাই। যুদ্ধ বন্ধ চাই। কারণ, আমরা আরেকটি দিন ঘুম থেকে জেগে দেখতে চাই না একটি শিশু রক্তের মধ্যে পড়ে আছে। একজন মা তার ছেলের জন্য চিৎকার করছেন। এ দৃশ্য আমরা আর দেখতে পারবো না।

অন্যদিকে কানাডা বলেছে, তারা নারী নেতৃত্ব, মানবাধিকারকর্মী এবং সাংবাদিক সহ কমপক্ষে ২০ হাজার বিপন্ন মানুষকে পুনর্বাসন করবে।