একরামুল হত্যা মামলায় আলোচিত সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিকে গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়ে যা বললেন স্ত্রী আয়েশা

লেখক: আব্দুর রহমান, টেকনাফ প্রতিনিধি, দৈনিক সমকাল
প্রকাশ: ৬ minutes ago

০২ জুন দৈনিক সমকালে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি টেকনাফ টুডের পাঠকদের জন্য নিম্নে হুবহু তুলে ধরা হলো।

কক্সবাজারের টেকনাফে ২০১৮ সালের ২৬ মে র্যা বের মাদকবিরোধী অভিযানে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন তৎকালীন টেকনাফ পৌর কাউন্সিলর ও যুবলীগ সভাপতি একরামুল হক। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর স্ত্রী আয়েশা বেগম তখন স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়েকে নিয়ে পড়েন অকূল পাথারে। স্বামী হারানোর শোক, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ ও দুই মেয়ের পড়াশোনা অব্যাহত রাখার চেষ্টার মধ্যে সময় কাটিয়েছেন। ঘটনার সাত বছর পর গত বছরের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন তিনি। তাঁর স্বামী হত্যার ৮ বছর পূর্তির দিন ২৬ মে দুপুরে ফোনে কথা হয় আয়েশা বেগমের সঙ্গে। সেটি এখানে তুলে ধরা হলো:

সমকাল: কেমন কাটছে দিন?
আয়েশা বেগম: গত ৮ বছর ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। স্বামীকে হারানোর শোক তো আছেই, এর সঙ্গে ছোট দুই মেয়ে। প্রতিদিনই কষ্ট আর অনিশ্চয়তার মধ্যে কেটেছে। তবুও হাল ছাড়িনি। শুধু একটি আশাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে– একদিন আমার স্বামীর হত্যার বিচার হবে। ওদের শাস্তি হবে। আমরা ন্যায়বিচার পাব।

সমকাল: সময়টা কীভাবে পার করছেন?
আয়েশা বেগম: প্রতিটি মুহূর্ত দুশ্চিন্তার মধ্যেই কাটছে। স্বামীকে হারানোর পর আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না। সব মিলিয়ে খুব কঠিন সময় পার করছি।

সমকাল: এ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
আয়েশা বেগম: নিরাপত্তাহীনতার কারণে টেকনাফ ছেড়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছি। অর্থকষ্ট তো আছেই। ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে। এক সহৃদয় ব্যক্তি এককালীন আর্থিক সহযোগিতা করেছিলেন। আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল দুই মেয়েকে বড় করে তোলা। ওদের বাবাকে গুলি করে মেরে ফেলার ঘটনা মেয়ে দুটির মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। ছোটবেলা থেকেই ওরা বাবার খুব কাছের ছিল। এখনও বাবাকে খোঁজে। বাবার কথা বলে কান্না করে; নানা প্রশ্ন করে। অনেক সময় কোনো উত্তর দিতে পারি না। ওরা এখন কলেজে পড়ে। ওদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছি।

সমকাল: সেই ঘটনার স্মৃতি এখনও কতটা তীব্র?
আয়েশা বেগম: ওই দিনের কথা মনে পড়লে এখনও আমি ভেঙে পড়ি। সেই ভয়, আতঙ্ক আর অসহায় মুহূর্তগুলোর স্মৃতি আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। মনে হয়, ঘটনাটা এই সেদিন ঘটেছে। এমন একটি স্মৃতি কখনও ভোলার নয়। তার ওপর এত বছরেও বিচার না পাওয়ার বেদনা আমাকে আরও বেশি কষ্ট দেয়।

সমকাল: আপনার প্রকাশ করা অডিও রেকর্ড (একরামুলকে করা গুলির শব্দ, তাঁর আর্তচিৎকার) দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল…
আয়েশা বেগম: আমি সত্যটা মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলাম। দেশবাসী শুনেছে, জেনেছে। ঘটনাটি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। তারপরও বিচার হয়নি। এটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। আমার বিশ্বাস, তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার চাইলে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে পারত। কিন্তু সেটি হয়নি।

সমকাল: নতুন করে তদন্তের দাবি কেন করছেন?
আয়েশা বেগম: আগের তদন্তে অনেক বিষয় সঠিকভাবে উপস্থাপন হয়নি বলে আমাদের মনে হয়েছে। তাই আমরা চাই নতুন করে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত হোক, যাতে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা যায়।

সমকাল: একরামুল হত্যা মামলায় আলোচিত সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিকে গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
আয়েশা বেগম: এটাকে হয়তো বিচার প্রক্রিয়ার একটি শুরু বলা যায়। তবে পূর্ণাঙ্গ বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা সন্তুষ্ট নই। প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমার লড়াই চলবে। আমার স্বামীকে হত্যার সঙ্গে জড়িত অনেকে বিদেশে পালিয়ে গেছে বলে শুনছি। প্রয়োজনে তাদের দেশে এনে আইনের মুখোমুখি করা হোক– এটাই আমাদের দাবি।

সমকাল: এমন আলোচিত একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ার পেছনে কী কারণ দেখেন?
আয়েশা বেগম: আমার বিশ্বাস, আগের আওয়ামী লীগ সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই এই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও আমাদের অনেক আশা ছিল। কিন্তু সেখানেও আশানুরূপ অগ্রগতি দেখতে পাইনি। আমার মনে হয়, এ ঘটনার পেছনে প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, আমার স্বামী নিজেও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাই কখনও কখনও মনে হয়, দলীয় পরিচয়ের ভেতরেই তিনি অবিচারের শিকার হয়েছেন।

সমকাল: বর্তমান বিএনপি সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
আয়েশা বেগম: এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাবা হারানো সন্তানদের কষ্ট ও একজন স্বামীহারা নারীর জীবনের সংগ্রাম উপলব্ধি করবেন। অন্তত তাঁর (বিএনপি) আমলে আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার পাব। আমি আশা করছি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে দেখা করে আমাদের কথাগুলো সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ পাব।

সমকাল: এত বছর ধরে লড়াই চালিয়ে যেতে আপনাকে কী শক্তি জুগিয়েছে?
আয়েশা বেগম: দুই মেয়েই আমার শক্তি। ওদের মুখের দিকে তাকিয়েই কখনও হাল ছাড়িনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ লড়াই চালিয়ে যাব। কিছুদিন আগে মামলার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমাদের ঢাকায় ডেকেছিলেন। স্বামী হত্যার বিচার দাবি করেছি এবং আমাদের দীর্ঘদিনের কষ্ট ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছি। তিনি মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। এ সময় আমার দুই মেয়ের খোঁজখবরও নিয়েছেন। তাঁর সেই আশ্বাস আমাদের মধ্যে নতুন করে ন্যায়বিচারের আশা জাগিয়েছে।

সমকাল: দেশের মানুষের প্রতি কী বলতে চান?
আয়েশা বেগম: সবাই যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে। আমার মতো আর কোনো পরিবার যেন বিচারহীনতায় কষ্ট না পায়। সব হত্যার বিচার নিশ্চিত হোক– এটাই আমার চাওয়া।

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আয়েশা বেগম: সমকালকেও ধন্যবাদ।