আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ‘গুম’

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৭ years ago

এ কে এম শহীদুল হক : ১৯৭৩ সালে চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেখানকার সামরিক সরকার বিরোধী ও বিভিন্ন মতাদর্শী লোকদের গুম করে রাখত এবং ভিকটিমের আত্মীয়স্বজনদের আটকের কোনো তথ্য দিত না। ১৯৭৪ সাল থেকে Inter American Commission on Human Rights and the United Nations Commission on Human Rights চিলি থেকে সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে অবৈধ আটক, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ পেতে থাকে। তদন্তের জন্য একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ তৈরি করা হয়। ওয়ার্কিং গ্রুপ-১৯৭৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি United Nations Commission on Human Rights বরাবর রিপোর্ট পেশ করে। ১৯৮০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ২৩ নম্বর রেজুলেশনের মাধ্যমে Commission on Human Rights আরেকটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে। এরপর প্রায় ২৫ বছর পেরিয়ে যায়। বহুবার সভা, আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ হয়। সমস্যাটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক দেশের বিরুদ্ধেই নাগরিকদের গুম করার অভিযোগ জাতিসংঘের কাছে আসতে থাকে। সর্বশেষ ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর গুমের ওপর আন্তর্জাতিক কনভেনভেনশন গৃহীত হয়।

কনভেনশনের আর্টিকেল ২ মোতাবেক গুমের সংজ্ঞা নিম্নরূপ দেওয়া যায়—সরকারের কোনো সংস্থা বা প্রতিনিধি বা বেসরকারি গ্রুপের সদস্য বা কোনো ব্যক্তি বা কোনো অপরাধ চক্র কোনো নাগরিককে যদি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা সম্মতি ব্যতিরেকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে আটক রাখে এবং সেই আটকের বিষয় স্বীকার না করে তার আত্মীয়স্বজনকে কোনো তথ্য না দেয় এবং ভিকটিমকে আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে, তবে এমন ঘটনাকেই গুম বা Enforced or involuntary disappearance হিসেবে গণ্য করা হয়। কনভেনভেনশন অনুযায়ী সাধারণত সরকারি সংস্থার গুপ্ত আটককেই গুম হিসেবে ধরা হয়।

গুমের মতো অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন এখন পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট দেশ ও অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। এটা এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। যুদ্ধরত দেশগুলোতে গুমের ঘটনা বেশি ঘটে। সাধারণত মিলিটারি স্বৈরশাসকরা গুম সংস্কৃতির সূত্রপাত ঘটায়। এখন যুদ্ধবিগ্রহ ছাড়াও অভ্যন্তরীণ সংঘাত, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গি-সন্ত্রাসি দমন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি, বিবদমান গ্রুপের প্রতিপক্ষ সদস্যদের নির্যাতন করে আধিপত্য বিস্তার এবং অপরাধীচক্রের অপরাধ সংঘটন করার লক্ষ্যে গুমের ঘটনা ঘটে থাকে। গণতান্ত্রিক দেশেও গুমের ঘটনা ঘটে।

আমেরিকাও গুমের অভিযোগ থেকে মুক্ত নয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (war on terror) কর্মসূচিতে আমেরিকা গুমের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০০২ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে কিউবার গুয়ানতেনামো উপকূলে গোপন বন্দিশালা চালু করে। ঐ বন্দিশালায় শত শত লোককে বন্দি করে তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের জেলা জজ জেড রাকফ (Jed Rakoff) এর কোর্ট আদেশের জবাব দিতে গিয়ে মার্কিন সরকার ২০ এপ্রিল ২০০৬ সরকারিভাবে স্বীকার করে গুয়ানতানামো বন্দিশালায় ৫৫৮ জন বন্দি আটক আছে। ২০০৬ সালের ২০ মে আর এক প্রতিবেদনে জানানো হয় একই গোপন বন্দিশালায় ৭৫৯ জনকে আটক করে রাখা হয়েছে। এসব বন্দি মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় না। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সুযোগও নেই। আত্মীয়স্বজনের কেউ তাদের অবস্থান সম্বন্ধে অবগত নয়।

বাংলাদেশেও গুমের অভিযোগ আছে। তবে এটা নতুন নয়। আগেও এ অভিযোগ ছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দল, কিছু মানবাধিকার কর্মী ও এনজিও ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে গুম ও অপহরণের অভিযোগ অহরহ করে থেকে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সেনাদের দ্বারা হাজার হাজার লোক গুম ও অপহরণ হয়েছে। ৩০ লাখ লোক শহিদ হয়েছে। ‘অধিকার’ নামক একটি এনজিও এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করে যে, বাংলাদেশে জানুয়ারি ২০০৯ হতে নভেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত ৩২৮ জন গুম হয়েছে। ৩২৮ জনের মধ্যে ৪৫ জনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ১৬৭ জন ফিরে আসে এবং ১১৬ জন নিখোঁজ আছে। তবে সরকারিভাবে গুমের অভিযোগ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করা হয়। অভিযোগ করা হয় ঐ এনজিও বিশেষ রাজনৈতিক দলের স্বার্থে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। তাদের পরিসংখ্যান যথার্থ নয়।

অপহরণ বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে একটি ফৌজদারি অপরাধ। প্রাচীন আমল থেকেই এ অপরাধ সংঘটিত হয়ে আসছে। আত্মীয়স্বজনের অভিযোগ এবং অভিযোগের ধরন অনুযায়ী কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়মিত মামলা হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জিডি এন্টি করে তদন্ত করা হয়। তদন্তকালে কিছু কিছু অপহূত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। কেউ কেউ আপনাআপনি ফেরত আসে। শত চেষ্টা করেও কিছু ভিকটিমের সন্ধান পাওয়া যায় না। যেমন—বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী অপহরণ। তাকে উদ্ধারের জন্য পুলিশ অনেক চেষ্টা করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারের জন্য নির্দেশ দেন। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর তিনি আবেগপ্রবণও হয়েছিলেন। কিন্তু আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও অদ্য পর্যন্ত পুলিশ তাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়নি। এ রকম অনেক ঘটনাই রহস্যাবৃত ও অলক্ষিত থেকে যায়। এটা প্রায় সব দেশেই দেখা যায়। যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর প্রায় দুই লক্ষাধিক এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় দুই লক্ষ লোক নিখোঁজ হয়। কেউ কেউ উদ্ধার হয়, কেউ কেউ ফিরে আসে, কারো কারো মৃতদেহ পাওয়া যায় এবং কারো কোনো হদিস কখনও পাওয়া যায় না।

বিভিন্ন সূত্রের পরিসংখ্যান নিয়ে হয়তো প্রশ্ন আছে। পরিসংখ্যান পুরোপুরি যথার্থ না হলেও দেশে দেশে যে কম-বেশি গুম হচ্ছে তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রচলিত আইনে বিপজ্জনক কোনো ব্যক্তিকে বেশি দিন আটকিয়ে রাখা যাবে না বা তার শাস্তি নিশ্চিত হবে না, ভেবেই গুমের আশ্রয় নেওয়া হয় বলে কেউ কেউ বলে থাকেন। কিন্তু এটা যে মানবতা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ তা সংশ্লিষ্ট সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। নইলে একবিংশ শতাব্দীতেও নাগরিকদের মানবাধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার ও মানব সভ্যতা চরম হুমকির মধ্যে পতিত হবে। প্রাচীন আমলের হিংস্রতা, বর্বরতা, নিরাপত্তাহীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতার পুনঃঅভ্যুদয় হবে, যা মানব জাতির জন্য কলঙ্কের অধ্যায় সৃষ্টি করবে।

এটা সত্য যে, গুম একটি বৈশ্বিক সমস্যা। গণতান্ত্রিক দেশেও গুম হয়ে থাকে। এ জন্যই জাতিসংঘ ২০১১ সাল হতে আন্তর্জাতিক গুম দিবস (International day of Enforced or Involuntary disappearance) পালন করছে। মানুষকে সচেতন করা, এ অপরাধ থেকে রাষ্ট্র, সরকার, ব্যক্তি ও গোষ্ঠী মহলকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো, গুম হওয়া ব্যক্তির আইনি অধিকার নিশ্চিত করা, তার আত্মীয়স্বজনকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করা এবং গুমের বিরুদ্ধে সব দেশের সরকারকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেই এ দিবস পালনের প্রধান লক্ষ্য।

গুম শুধু ভিকটিম বা তার আত্মীয়স্বজনকেই চরম সংকট, মনোকষ্ট, উদ্বেগ ও ভীতির মধ্যে ফেলে না। এটা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সমাজের লোক ভীতসন্ত্রস্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে সাহস পায় না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেও ভয় পায়। সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না। মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার থেকে নাগরিকরা বঞ্চিত হয়। কাজেই গুমের অপসংস্কৃতি থেকে প্রত্যেক দেশ ও সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং সচেতন জনগণকে এ জঘন্য অপরাধের জন্য প্রতিবাদী হতে হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

লেখক : সাবেক আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ
সুত্র : দৈনিক ইত্তেফাক