বিরূপ প্রকৃতি মোকাবিলায় করণীয়

লেখক: হুমায়ুন রশিদ
প্রকাশ: ৩ years ago

নাজনীন বেগম : উন্নয়ন অভিগামিতায় বাংলাদেশের দুরন্ত বেগে ছুটে চলার মাঝপথে কেমন যেন ব্যবচ্ছেদ তৈরি হয়ে গেল। প্রথমত, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় ইউএনডিপি কর্তৃক চিহ্নিত সূচকের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে দেশ বিভিন্ন কর্মসূচি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করে সামনে এগিয়ে চলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। পাশাপাশি হরেক মাত্রার দুর্যোগ, দুর্ভোগ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে সব যেন হোঁচট খাওয়ার উপক্রম। নিত্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি মহামূল্যবান জ্বালানি তেলের মূল্যও দিন দিন সহনীয় মাত্রাকে অতিক্রম করে যাচ্ছে। দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় যে মাত্রায় হরেক রকম বিপন্নতা ভর করেছে সেখান থেকে নির্বিঘ্নে, নিরাপদে বের হয়ে আসাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি আঘাত হানা সিত্রাংয়ের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়টির প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ বিপদকাল কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশের সমুদ্র পরিবেষ্টিত এবং নদীস্রত উপকূলীয় জনগোষ্ঠী রীতিমতো প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকে। সেখানে আরও এক দুঃসহ মাত্রা পরিবেশ, পরিস্থিতিকে অসহনীয় করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তনই শুধু নয় বরং মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের দুঃসহ প্রতিবেশে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যাওয়াও চরম ক্রান্তিকাল। সম্প্রতি আরও এক আশঙ্কিত অবস্থা বাংলাদেশকে নাজেহাল করতে যথেষ্ট ক্রিয়াশীল। বিশ্বব্যাংকের এক জরিপে দৃশ্যমান হয়েছে দেশে মৃত্যুর প্রায় ৩২% নাকি দূষণ প্রক্রিয়ার বিপণ্ণ পরিণতি।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী বর্তমানের জলবায়ু দূষণের হরেক বিপত্তি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার শঙ্কিত এই অবস্থা সেই বিংশ শতাব্দীর ক্রান্তিলগ্ন থেকেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। তা ক্রমশ আরও দুর্বিষহ হয়ে একবিংশ শতাব্দীর দুই দশককে নানা বিড়ম্বনায় ঘিরে রেখেছে। বিভিন্ন সময় গতি-দুর্গতির সম্মুখ সমরে নিপতিত হওয়ার পরও বাংলাদেশে উন্নয়নের ছোঁয়া দৃশ্যমান হতে সময় লাগছে না। ৭ নভেম্বর, সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সম্প্রসারিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ১০০টি সেতু উদ্বোধন করে ইতিহাস গড়লেন।

শুধু তাই নয়, উন্নয়নের মাইলফলকের স্থপতি হিসেবে নিজেকে অভিষিক্ত করলেন। পাশাপাশি দেশবাসীকে উদাত্ত আহ্বান জানালেন, নিত্যজীবনের ব্যয় সংকোচের ওপর বিশেষ জোর দেয়ার। একেবারে কৃচ্ছ্র সাধন নয়, বিলাসিতার লাগাম টেনে ধরার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করলেন। বাজারে স্বস্তি ফেরাতে বিভিন্ন নির্দেশনাও এলো। আমদানির ক্ষেত্রে পরামর্শ এলো শুধু নিত্যব্যবহার্য চাল, ডাল, আটা, চিনি, ভোজ্যতেলসহ প্রয়োজনীয় পণ্য বিদেশ থেকে আনার। গাড়ি, ইলেকট্রনিক পণ্য, স্বর্ণালঙ্কার এসব আপাতত আমদানি নয়, বরং যার যা আছে তাই নিয়ে যাপিত জীবন চালিয়ে যেতে হবে। সবার আগে খেয়ে পরে বাঁচার অধিকার সব নাগরিকের সহজাত প্রাপ্তি।

সঙ্গত কারণে ভোগ্যপণ্যের ওপর মূল্য বৃদ্ধিকে অবশ্যই সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসা সময়ের ন্যায্য দাবি। নিত্য দরকারি পণ্যের সরবরাহ বাজারে বাড়াতে হবে। সেখানে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজি আমলে নেওয়া যাবে না। বরং চিহ্নিত হলে ব্যবসায়ী অপশক্তিকে কঠোরতম শাস্তি দেওয়ারও সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন সরকারপ্রধান। দেশীয় বাজার, বৈদেশিক মুদ্রা বিশেষ করে ডলারের দাম বিবেচনায় বাইরে থেকে অনেক পণ্য আমদানির ওপর শুধু নিষেধাজ্ঞাই নয়, বরং উচ্চ হারে শুল্ক বসানোরও নির্দেশ এসেছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে।
এছাড়া সরকারি অর্থ সাশ্রয় করতে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ওপরও বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বলয়ে উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ে থাকা বাংলাদেশের কদর বেড়েছে অনেকখানি। মাঝখানের দুই বছর করোনার চরম প্রকোপ যদি হানা না দিত, তাহলে বাংলাদেশের উন্নয়নের মেগা প্রকল্পগুলোর প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে বিলম্ব হতো না। তবে ইতোমধ্যে স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালুর ফলে বহুমাত্রিক কর্মযোগে শুধু দক্ষিণবঙ্গ নয়, সারা বাংলাদেশে উন্নয়নের গতিধারা বেগবান হওয়ার দৃশ্যও স্বস্তিদায়ক।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশসহ পৃথিবীজুড়ে চলছে প্রাকৃতিক দূষণ, নানা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে পরিবেশ। কয়লা বিদ্যুৎ থেকে কার্বন নিঃসরণের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় ধরিত্রী আজ উত্তাল, অসহায়। প্রাকশিল্প যুগের উষ্ণতার মাত্রা দেড় থেকে ২ ডিগ্রি ওপরে উঠলেই বাসযোগ্য বিশ্ব তার সমস্ত ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য হারাতে সময় নেবে না। ৬ নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে ধরিত্রী বাঁচাও সংস্থা কপের ২৭তম সম্মেলন। মিসরে আরম্ভ হওয়া এই পরিবেশ সম্মেলনে নতুন কিছু নির্দেশনা যোগ করাও পৃথিবীকে দূষণমুক্ত করার ইতিবাচক প্রক্রিয়া।

শার্ম আল শেখ নগরীতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বিদ্যমান অসহনীয় পরিবেশকে সামাল দিতে উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়। শুধু তাই নয়, অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উন্নত দেশগুলোর অর্থায়ন সহযোগিতার ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে। যা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর এক প্রকার অঙ্গীকারই ছিল বলা যায়। যার কোনো ফল এখনও দৃশ্যমান হয়নি। চলমান এই আয়োজনে অমীমাংসিত অনেক প্রসঙ্গও উঠে আসে। বিশ্বজুড়েই চলছে জলবায়ু পরিবর্তনের তা-ব। বিধ্বস্ত, বিপন্ন প্রকৃতি হরেক রকম অসহনীয় প্রভাব তার কোলের সন্তানদের ওপর জোর জবরদস্তিতে চাপিয়ে দিচ্ছে। কোথাও এখন আর সহনীয় মাত্রার উষ্ণতার প্রভাব প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে না।

বরং বায়ুম-লের নিদারুণ দাবদাহে শরৎ, হেমন্ত ক্রমশ তার সহজাত বৈশিষ্ট্য থেকে অপসৃয়মাণ। আর বর্ষাকালও অবিশ্রান্ত বারিধারায় তার বর্ষণকে অবারিত করতে হোঁচট খাচ্ছে। বাংলাদেশসহ আরও বহু উপকূলবর্তী অঞ্চলে নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড় অসহনীয়ভাবে যে মাত্রায় হানা দিচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করতেও যেন সহায়ক প্রকৃতির হিমশিম খাওয়ার জোগাড়। বৃহত্তর এশিয়া, উন্নত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সমৃদ্ধ ইউরোপ কেউই প্রকৃতির রুদ্র রুক্ষ দাবানল থেকে কোনোভাবেই সুরক্ষিত থাকতে পারছে না। আমাদের মতো অনেক দেশ স্বাভাবিকভাবে নৈসর্গের লীলাখেলাকে সম্মুখ সমরে মোকাবিলা করেই টিকে থাকার লড়াইয়ে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সুরক্ষাবলয় তৈরির প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে। উন্নত বিশ্বও লড়াই-সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে কোনোভাবেই ছাড় পাচ্ছে না।

যেখানে সারাবিশ্বে বায়ুম-লের তাপমাত্রা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে, সেখানে লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থতার পরিচয় দিলে আগামীর পৃথিবী আরও ভয়াবহ আকার নিতে বিন্দুমাত্র থামবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কপ-২৭ সম্মেলনকে উদ্দেশ করে আহ্বান জানান, আর দেরি নয় কপ-২৬এ উত্থাপিত অনেক নির্দেশনা পরামর্শকে বাস্তবে রূপ দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। শুধু তাই নয় তিনি বলেন, গ্লাসগো জলবায়ু চুক্তি অনুসরণ করার সময় এখনই। আর পেছন ফিরে তাকানোর কোন সুযোগ নেই। জ্যৈষ্ঠ মাসে সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী যে মাত্রায় অকাল বন্যার অসহনীয় ঢলে বন্যায়কবলিত হয়েছে, সেটা স্মরণ করলেই জলবায়ুর পরিবর্তনের অসহনীয় প্রভাব কেমন তা বোঝা যায়। সঙ্গত কারণে উৎসাহব্যঞ্জক এবং উদ্দীপনামূলক বক্তৃতায় ফললাভ হওয়ার সময় উত্তীর্ণ।

পরিস্থিতির ন্যায্যতা বিচার করে উন্মত্ত প্রকৃতিকে থামাতে যা যা প্রয়োজন তা করতে আর বোধহয় বিলম্ব করা সমীচীন নয়। পৃথিবীর উষ্ণতম অবস্থার কঠোরতম বাস্তবতায় আজ আমরা অসহায়। তাই কপ-২৬-এ যা যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা বাস্তবের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আমাদের মতো দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তার যে প্রতিশ্রুতি করা হয়েছিল তা এখনো পূরণ না হওয়ায়, আদৌ সেই আর্থিক সহায়তা পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে শঙ্কা। ২০২৫ সালের মধ্যে অর্থ-সাহায্য বাড়ানোসহ জীবাশ্ম জ্বালানির অসহনীয় দাবদাহ থামানোও উন্নত বিশ্বের সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা।

শুধু তাই নয়, তাদের আবশ্যিক নীতিনৈতিকতাও এক্ষেত্রে বাঞ্ছনীয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ুর ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশসহ আরও অনেক যে অঞ্চল আছে, তাদের দিকে নজর দিয়ে নিজেদের শুধু কার্বন নিঃসরণে সংযত হতে হবে। গবেষণার প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রকৃতি সহায়ক নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও সময়ের অপরিহার্য চাহিদা। বাংলাদেশ, কার্বন নিঃসরণে মাত্র ০.৫৬ শতাংশ ভূমিকা রাখে। অথচ উন্মত্ত আর উত্তাল প্রকৃতির রুদ্ররোষে দেশটিকে মূল্য দিতে হচ্ছে অনেক বেশি। কার্বন নির্গমনের ভয়াবহ প্রতিবেশ তো বিশ্বব্যাপী। যার প্রকোপ থেকে বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন থাকার উপায় নেই।

যাই হোক শেষ অবধি নিশ্চয়ই এমন কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা সমাধানের রাস্তা তৈরি হবে যা স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল এবং উন্নত বিশ্ব একযোগে কাজ করে বিশ্বের উষ্ণতাকে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে যেতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সমাধানের উপায় স্বল্প সময়ে হয়ত আসবে না। তবে ক্ষতিকারক বৈজ্ঞানিক রশ্মির মাত্রা বিশ্বকে যেন আর মারাত্মক অবস্থার দিকে নিয়ে না যায় সেই প্রত্যাশা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নের মেগা প্রকল্পের আর কোন কর্মসূচি বর্তমানে হাতে না নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। বরং অসম্পূর্ণ প্রকল্পগুলোর কাজ গতিশীল করে দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশনা এসেছে তাঁর পক্ষ থেকে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মপ্রকল্পে নতুন আর এক সম্ভাবনা যুক্ত হওয়াও আশ্বস্তের বিষয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা দেওয়ার তথ্য সত্যিই স্বস্তিদায়ক। তাও আবার কোনো শর্ত ছাড়াই। তবে ঋণ আসবে ধাপে ধাপে কিস্তিতে।

অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের সমস্যা মোকাবিলায় আইএমএফের এই ঋণ যুগান্তকারী প্রভাব ফেলবে। স্বল্প সুদে দেওয়া এই ঋণে আমাদের রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে। প্রত্যাশা অনুযায়ী ঋণ পাওয়ায় সরকার বিশেষভাবে আশ্বস্ত। তবে শর্ত আরোপ না করলেও কিছু সুপারিশ এসেছে সংশ্লিষ্ট ঋণদাতা সংস্থা থেকে। ঋণ পরিশোধের বিষয়ে আগামী দশ বছর সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয় আইএমএফ। উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ ছাড়াও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও এই ঋণ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
লেখক : সাংবাদিক