টেকনাফ টুডে ডেস্ক :
এক মোড়কের ভেতরে ভিন্ন আরেকটি মোড়ক। ৬ দলের এশিয়া কাপ যেন আসলে ভারত-পাকিস্তানের তিন ম্যাচের দ্বিপাক্ষিক সিরিজ! গ্রুপিং, সূচি আর টুর্নামেন্টের সম্ভাব্য গতিপথ দেখে অন্তত সেরকমই মনে হবে। এই দুই দলের সিরিজে বাগড়া দিয়ে এটিকে বড় আসরে রূপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জ অন্যদের জন্য। আর সামনে যখন বিশ্বকাপ, দৃষ্টি তো সেদিকে থাকবেই!
এই সব বাস্তবতা নিয়েই শুরু হচ্ছে এশিয়া কাপ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি ভেন্যু দুবাই ও শারজাহতে বসছে এশিয়া কাপের পঞ্চদশ ও টি-টোয়েন্টি সংস্করণের দ্বিতীয় আসর।
টুর্নামেন্ট এবার হওয়ার কথা ছিল শ্রীলঙ্কায়। তবে দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতায় সরিয়ে নেওয়া হয় আমিরাতে।
এশিয়া কাপের সব আসরে খেলা একমাত্র দল শ্রীলঙ্কা শনিবার উদ্বোধনী দিনে দুবাইয়ে মুখোমুখি হবে আফগানিস্তানের। পরদিন একই মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলবে টুর্নামেন্টের সফলতম দল ভারত।
ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সিরিজের যে প্রচ্ছন্ন আলোচনা, সেটির কারণ স্পষ্টই। গ্রুপ পর্বে প্রথম দেখা, খুব বড় অঘটন না ঘটলে সুপার ফোর পর্বে লড়াই আরেকটি। এরপর যদি তারা ফাইনাল খেলতে পারে, তাহলেই হয়ে গেল দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর ‘তিন ম্যাচের সিরিজ!’
এশিয়া কাপের সূচি প্রকাশ হওয়ার পর থেকে অনেকেই এমন একটি ছবি আঁকতে শুরু করেছেন। আয়োজক এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলকে (এসিসি) দায় দেওয়ার সুযোগও নেই। বাণিজ্যিক দিক থেকে ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ের মূল্য আকাশচুম্বি। এই দুই দলের ম্যাচ আর এই টুর্নামেন্ট দিয়েই এসিসির আয়ের বড় অংশ আসে। তারা তাই নিশ্চিত করেছে, যত বেশি সম্ভব ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ রাখা যায়।
এই দুই দেশের ক্রিকেট অনুসারীদের তাতে পোয়াবারো। রাজনৈতিক বৈরিতায় ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বন্ধ অনেক বছর ধরে। কেবল আইসিসি আর এসিসি টুর্নামেন্টেই তাদের দেখা হয়। ক্রিকেট পাগল দুই দেশের সমর্থকেরা মুখিয়ে থাকে এসব টুর্নামেন্টের জন্যই।
গতবারও এভাবেই সূচি করেছিল এসিসি। তবে তাদের পরিকল্পনায় বাধ সেধেছিল বাংলাদেশ। মাশরাফি বিন মুর্তজার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিল সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবালের মতো তারকাদের ছাড়াই।
এবার যদিও পুনরাবৃত্তি করা কঠিন। গতবার ছিল বাংলাদেশের প্রিয় সংস্করণ ওয়ানডের এশিয়া কাপ, এবার ভোগান্তির টি-টোয়েন্টি! তবে খেলাটা যখন ক্রিকেট, অসম্ভব নয় তো কিছুই।
আফগানিস্তান ও শ্রীলঙ্কার তো ভালোরকম সম্ভাবনাই আছে। আর লড়াইটা যখন ২০ ওভারের, তখন হংকংয়ের অঘটন ঘটানোর সামর্থ্যকেও তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভারত-পাকিস্তানকে এগিয়ে রেখেই শ্রীলঙ্কা কোচ ক্রিস সিলভারউড বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে জানিয়ে রাখলেন, অন্যরাও ছেড়ে কথা বলবে না।
“শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান নিজেদের দিনে হারিয়ে দিতে পারে যে কোনো দলকে। ভারত ও পাকিস্তান হয়তো কিছুটা এগিয়েই। তবে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট এমন, নিজেদের দিনে যে কোনো দল যে কোনো দলকে হারিয়ে দিতে পারে। আলোচনায় কম থাকা দলগুলোর সামনে সুযোগ আছে যে কাউকে চমকে দেওয়ার।”
সর্বোচ্চ সাতবারের চ্যাম্পিয়র ভারত ফাইনালে খেলেছে ১০ আসরে। দুইবারের চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান খেলেছে চারটি ফাইনাল। পাঁচবার শিরোপা জয়ী শ্রীলঙ্কা সর্বোচ্চ ১১ বার পা রেখেছে ফাইনালে।
ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার আগে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বাদ পেত কেবল এশিয়া কাপ দিয়েই। গত ১০ বছরে এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের ধারাবাহিকতা দারুণ, সবশেষ চার আসরের তিনটিতেই খেলেছে ফাইনালে। আফগানিস্তান এখনও যেতে পারেনি শিরোপা লড়াইয়ের মঞ্চে।
বাছাই পর্ব পেরিয়ে ‘এ’ গ্রুপে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গী হয়েছে হংকং। চতুর্থবারের মতো এই টুর্নামেন্টে খেলতে যাচ্ছে তারা। পাচ্ছে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে খেলার বিরল সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য হয়তো উন্মুখ থাকবে দলটি। অঘটনের সামর্থ্যও তাদের নতুন নয়। ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেই যেমন বাংলাদেশকে হারিয়ে দিয়েছিল তারা।
‘বি’ গ্রুপে বাংলাদেশের দুই প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান। প্রতিটি গ্রুপের সেরা দুটি করে দল যাবে সুপার ফোরে। সেখানে প্রতিটি দল মুখোমুখি হবে সবার। সেরা দুই দল খেলবে ১১ সেপ্টেম্বরের ফাইনালে।
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারত এবারও টুর্নামেন্ট শুরু করছে ফেভারিট হিসেবেই। তারকায় ঠাসা দলটির যারা স্কোয়াডের বাইরে আছেন, তাদের নিয়েও শক্তিশালী আরেকটি দল গড়া যায়! শক্তির গভীরতার কারণেই বাংলাদেশের টেকনিক্যাল কনসালটেন্ট শ্রীধরন শ্রীরামও বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে ভারতকে পরিষ্কার ফেভারিটের তকমা দিয়ে দিলেন।
“ভারত অবশ্যই ফেভারিট হিসেবে শুরু করছে, তাই না? তারা ফেভারিট তাদের শক্তির গভীরতার কারণে। (ভারতীয় দল নিয়ে) গতকাল স্টার স্পোর্টসে আমি বলেছি, ‘একাদশ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুভ কামনা!’ কারণ, এত বেশি মানসম্পন্ন ক্রিকেটার তাদের দলে। কাজেই সব প্রতিপক্ষের জন্যই ভারত হবে বিরাট এক চ্যালেঞ্জ।”
টুর্নামেন্টে তুমুল আগ্রহ থাকবে বিরাট কোহলিকে নিয়ে। আপন ছন্দে তিনি ফিরতে পারেন কিনা! তার সবশেষ সেঞ্চুরির পর পেরিয়ে গেছে হাজার দিন। টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি করা যদিও খুব কঠিন। তবে নিজেকে কক্ষপথে ফেরানোর একটা সুযোগ তার সামনে।
শুরু হচ্ছে এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই
পাকিস্তানের টপ অর্ডারের তিন ব্যাটসম্যান আছেন ছন্দে। বারব আজম, মোহাম্মদ রিজওয়ান ও ফখর জামানের সামর্থ্য আছে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার। তবে মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানদের ধারাবাহিকতা না থাকা হতে পারে দলটির বিপদের কারণ। চোটের জন্য শাহিন শাহ আফ্রিদি ছিটকে যাওয়ার পেস আক্রমণে ধার তাদের কমেছে বটে। তারপরও তাদের পেস আক্রমণ যথেষ্ট শক্তিশালী।
এই দুই দলকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সম্ভাবনা ভালোভাবেই আছে শ্রীলঙ্কার। নিজেদের অনেকটাই গুছিয়ে নিয়েছে তারা। ম্যাচ জেতানোর মতো খেলোয়াড়ের কমতি নেই দাসুন শানাকার দলে। সম্ভাবনায় অবশ্য লঙ্কানদের চেয়েও এগিয়ে আফগানিস্তান। রশিদ খান, মুজিব উর রহমান ও মোহাম্মদ নবিকে নিয়ে গড়া স্পিন আক্রমণ যে কোনো দলকেই ভোগাতে পারে। পাশাপাশি বিস্ফোরক কিছু ব্যাটসম্যানও আছে তাদের। বিশ্বজুড়ে টি-টোয়েন্টি লিগ খেলে বেড়ানো একঝাঁক ক্রিকেটার নিয়ে গড়া দলটি ফাইনালে উঠলেও বিস্ময়কর হবে না।
গত দুই আসরের ফাইনালিস্ট বাংলাদেশের জন্য এবার সুপার ফোরে খেলাই বড় চ্যালেঞ্জ। টি-টোয়েন্টিতে খুব বাজে সময় কাটছে তাদের। ফল হওয়া সবশেষ ১৫ ম্যাচের ১৩টিতে হেরেছে তারা।
এই সংস্করণে নতুন করে শুরু করতে নেতৃত্বে ফেরানো হয়েছে সাকিব আল হাসানকে। টেকনিক্যাল কনসালটেন্ট করে আনা হয়েছে শ্রীধরন শ্রীরামকে। রাসেল ডমিঙ্গোকে টি-টোয়েন্টি দলের কোচিং থেকে মুক্তি দেওয়ার পর তিনিই মূলত এই সংস্করণে দলের প্রধান কোচ। দলে দ্রুত কক্ষপথে ফেরানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ তার সামনে।
পরিস্থিতি অবশ্য খুবই কঠিন। বিশেষ করে সবশেষ সিরিজে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে হেরে যাওয়ার পর। গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে যেভাবে খেলছে দল, তাতে এবার এশিয়া কাপে সুপার ফোরও সহজ লক্ষ্য নয়।
বাংলাদেশের মূল চাওয়া অবশ্য আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপের জন্য দল গুছিয়ে নেওয়া। বিশ্বকাপে দৃষ্টি আসলে সব দলেরই। এবারের এশিয়া কাপ তাই অনেকটা বিশ্বকাপের প্রস্ততি টুর্নামেন্টও।
সুত্র : বিডি নিউজ ২৪।
