কক্সবাজার সৈকতে জেলিফিশ ভেসে আসার কারণ কি?

লেখক: হুমায়ুন রশিদ
প্রকাশ: ৪ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : কক্সবাজার সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে মাঝেমধ্যেই নানা সামুদ্রিক প্রাণির মৃতদেহ ভেসে আসে। তবে বুধবার রাতে শহরতলীর দরিয়ানগর সৈকতে ভেসে আসে কয়েক ডজন মরা জেলিফিশ। কিন্তু কি কারণে হঠাৎ করে এত মরা জেলিফিশ ভেসে এসেছে- তা নিয়ে সমুদ্রবিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করছেন।
মানব ক্রিয়াকলাপের কারণে অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির মুখোমুখি হলেও জেলিফিশ তাদের মধ্যে ব্যতিক্রম।কৃষ্ণ সাগরে,নামিবিয়ার উপকূলে এবং জাপান সাগর সহ বিশ্বজুড়ে এমনকী আমাদের পাশ্ববর্তি ভারতের দক্ষিনাঞ্চলের কেরালা,তামিলনাড়ুতে জেলিফিশের ব্লুমের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।প্রকৃতপক্ষে, জেলিফিশের জনসংখ্যা গত দুই দশকে বেড়েছে, সমুদ্র সৈকত বন্ধ হওয়া এবং এমনকি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য দায়ী হয়ে উঠেছে (ইনটেক পাইপ আটকে রাখার মাধ্যমে)। তাদের অপ্রতিরোধ্য উপস্থিতিকে বলা হচ্ছে মহাসাগরের “জেলিফিকেশন” ।
সাধারনত কোন এক বাস্তুতন্ত্রে জেলিফিশের প্রাচুর্যতা হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়াকে জেলিফিশ ব্লুমিং বলে।
জেলিফিশ সমুদ্রের স্রোত, পুষ্টি, সূর্যের তাপ, তাপমাত্রা, ঋতু, শিকারের প্রাপ্যতা,শিকারীর সল্পতা এবং অক্সিজেনের ঘনত্বের নির্দিষ্ট পরিবেশগত প্রভাবের উপর ভিত্তি করে এই ব্লুম ঘটায় এবং স্রোতের কারনে সবগুলো একত্রিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট অঞ্ছলে অবস্থান করে।এসব জেলিফিস মৎস্যজীবীদের জালে অযাচিতভাবে একসাথে আটকা পড়ে মারা যায়।ফিসিং নেটে আটক হয়ে মারা যাওয়া জেলিফিস মৎস্যজীবীরা সাগরেই ফেলে দিতে বাধ্য হয় এবং একসময় এসব মৃত জেলিফিস সৈকতে ভেসে আসে।আবার দলবদ্ধ জেলিফিস জোয়ারে সৈকতে এসে ভাটার সময় সৈকতে আটকা পরে মারা যায়।
জেলিফিশ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রানীদের তুলনায় নিউট্রিয়েন্ট-রিচ, কম-অক্সিজেন সমৃদ্ধ জলে টিকে থাকতে পারে এবং এইভাবে প্রতিযোগিতা ছাড়াই প্ল্যাঙ্কটন ভোজন করে দ্রুত বেড়ে উঠতে পাড়ে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে। জেলিফিশ লবণাক্ত পানি থেকেও উপকৃত হতে পারে, কারণ লবণাক্ত পানিতে বেশি আয়োডিন থাকে, যা পলিপ থেকে জেলিফিশে পরিণত হওয়ার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধিও জেলিফিশের ব্লুমে অবদান রাখতে পারে, কারণ জেলিফিশের অনেক প্রজাতি উষ্ণ জলে বেঁচে থাকতে পারে। উষ্ণ তাপমাত্রায় জেলিফিশের অযৌন প্রজনন বৃদ্ধি পায়, যার ফলে জেলিফিশের নতুন পলিপ জন্মগ্রহণ করে। প্রতি এক ডিগ্রী তাপমাত্রা এবং ২৮ পিপিটি লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে পলিপ সৃষ্টি ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। সমুদ্রে অতিরিক্ত নিউট্রিয়েন্টস (ইউট্রপিকেশন) বেড়ে যাওয়ায় জেলিফিশের যৌন এবং অযৌন প্রজনন বৃদ্ধি পায় যার ফলে অতিমাত্রায় জেলিফিশ বেড়ে চলেছে । কৃষি এবং উন্নয়ন কাজে ব্যবহ্রত নাইট্রেট সমুদ্রের পানিতে মিশে জেলিফিশের বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে । পাশাপাশি অতি মাত্রায় মাছ আহরণের ফলে জেলিফিশ শিকারী মাছের (যেমনঃ স্যামন) সংখ্যাও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। প্ল্যাংকটভোজী মাছ আহরণের ফলে সমুদ্রে খাবারের জন্য জেলিফিশের প্রতিদন্ধী মাছের সংখ্যা কমার ঘটনাও নেহায়েত কম নয়। সমুদ্রে বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ বিভিন্ন উপায়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে জেলিফিশের উপযোগী বাসস্থান তৈরী করছে। মাছ চাষে ব্যবহ্রত অতিরিক্ত খাদ্য পানিতে নিউট্রিয়েন্টসএর পরিমাণ বৃদ্ধি করে পাশাপাশি মাছ চাষের জন্য ব্যবহ্রত কাঠামো জেলিফিশের প্রাথমিক অবস্থায় বেঁচে থাকতে সহায়তা করে।জেলিফিশ সামুদ্রিক কচ্ছপদের প্রধান ও অত্যন্ত প্রিয় খাবার। একটি ইকোসিস্টেমে সামুদ্রিক কচ্ছপ হ্রাস পেলে জেলিফিশের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।এছাড়াও সামুদ্রিক আইন অমান্য করে যত্রতত্র বালাষ্ট ওয়াটার নির্গমনের কারণে জেলিফিশের বিভিন্ন প্রজাতি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অযাচিত ভাবে স্থানান্তরিত হচ্ছে । এসব কারণ ছাড়াও উপকূলীয় অঞ্চলে মনুষ্য সৃষ্ট নানা উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে সমুদ্রের তলদেশ এবং এর পারিপার্শিক পরিবেশের পরিবর্তনও জেলিফিশের সংখ্যাবৃদ্ধিতে ব্যাপক ভুমিকা রাখছে।
জেলিফিশ দেখতে সমুদ্র-সুন্দরী মনে হলেও এদের অনেক প্রজাতি মারাত্মক রকমের বিষাক্ত। বক্স জেলিফিশ এদের মধ্যে অন্যতম । এরা সামুদ্রিক ভীমরুল নামেও পরিচিত। এর ভয়ংকর বিষক্রিয়ার কারণে অনেকে একে ‘মৃত্যুর বক্স’ বলেও আখ্যায়িত করে। জেলিফিশের কর্ষিকায় নেমাটোসিস্ট ধারণকারী নিডোসাইট নামক বিশেষ ধরনের কোষ উপস্থিত যা হিপনোটক্সিন নামক বিষাক্ত রসে পরিপূর্ণ থাকে। কোনোভাবে জেলিফিশের শরীর স্পর্শ করলে এই কর্ষিকার মাধ্যমে তারা শিকারের দেহে কয়েক লাখ সূক্ষ্ম হুল ফুটিয়ে দেয়। হুল ফুটানো মাত্রই আক্রান্ত স্থানে শুরু হয় প্রচন্ড ব্যথা এবং এর প্রভাবে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মাত্র ৩-৪ মিনিটের মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুও হতে পারে। একটি বক্স জেলিফিশের শরীরে যে পরিমাণ বিষ থাকে তাতে অনায়াসে ৬০ জন মানুষ মারা যেতে পারে। এক গবেষণায় দেখা যায়, জেলিফিশের আক্রমণে ফিলিপাইনের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতি বছর ২০-৪০ জন মানুষ মারা যায়।
jelly fish TEKNAF TODAY - সীমান্তের সর্বশেষ খবর
বিশ্বব্যাপী উষ্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলে জেলী ফিশের আক্রমণে পর্যটক এবং সাঁতারুদের গা-হাত-চোখ জ্বালাপোড়া সহ নানাবিধ সমস্যা এবং অনেক সময় জরুরী চিকিৎসারও প্রয়োজন হয়। সমুদ্রে জেলিফিশের পরিমাণ বেড়ে গেলে এটি অতি ব্যাপক হারে ঘটতে পারে। জেলিফিশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে এটি মারাত্মক বাঁধার সৃষ্টি করে। জালে অতিমাত্রায় জেলিফিশ আটকে মাছ ধরার জাল ছিড়ে যায় এবং মাছের তুলনায় বেশি জেলিফিশ ধরা পড়লে সম্পূর্ণ মাছও ফেলে দিতে হয়। এছাড়াও, উপকূলীয় অঞ্চলে খাঁচায় মাছ চাষের ক্ষেত্রে ছোট জেলিফিশ এবং বড় জেলিফিশের কর্ষিকা খাঁচায় প্রবেশ করে চাষকৃত মাছের ফুলকা ক্ষতিগ্রস্থ করে যার ফলে রক্তক্ষরণ এবং শ্বাসরোধের কারণে মাছের মৃত্যু ঘটে । জেলিফিশের আধিপত্য হয়ে গেলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা মাছের মজুদের পক্ষে কঠিন হতে পারে, কারণ জেলিফিশ প্লাঙ্কটন খায়, যার মধ্যে মাছের ডিম এবং লার্ভাও থাকে।জেলিফিশ দ্বারা প্রাথমিক উৎপাদকদের উপর বর্ধিত চাপের দরুণ উচ্চতর ট্রফিক স্তরে শক্তি স্থানান্তরকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
জেলিফিস ব্লুমস সাম্প্রতিক সময়ে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীদের বিশেষ মনযোগ ও দু:চিন্তার কারন হয়ে দাড়িয়েছে।জেলিফিস ব্লুমস-কে “সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের নতুন দুর্যোগ”(new marine ecological disasters) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
jelly fish 3 TEKNAF TODAY - সীমান্তের সর্বশেষ খবর
একটি ইকোসিস্টেমে জেলিফিস ব্লুমের কারন ও এর প্রতিকার নিয়ে বিশ্বের অনান্য দেশের গবেষকদের ন্যায় বাংলাদেশ সমুদ্র বিজ্ঞান ইনস্টিউটের একদল গবেষক অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।

বেলাল হায়দার পারভেজের ফেইসবুক টাইমলাইন থেকে নেওয়া।