সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমাদের প্রত্যাশা ছিল, মানুষ শুধু স্বাধীন হবে না, মানুষ মুক্তিও পাবে। কেননা যুদ্ধটা ছিল সর্বাত্মক জনযুদ্ধ; এবং এর লক্ষ্য ছিল সর্বাধিক মুক্তি অর্জন।
অথচ সেই আকাঙ্ক্ষা একেবারেই পূর্ণ হয়নি। ভৌগোলিকভাবে আমরা একটা স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি। আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র, সংবিধান, রাষ্ট্রভাষা পেলাম, পরিচয় পেলাম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে। পাকিস্তান একটা অস্বাভাবিক রাষ্ট্র ছিল। ওই রাষ্ট্র ভাঙতই। এবং সেটা শুধু ভৌগোলিক দূরত্বের কারণেই নয়, ভাঙত বৈষম্যের কারণে। ভৌগোলিক দূরত্ব ওই বৈষম্যই বৃদ্ধি করছিল। আশা ছিল, বাংলাদেশে আঞ্চলিক বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু আঞ্চলিক বৈষম্যের জায়গায় আমরা বাংলাদেশে পেলাম শ্রেণিগত বৈষম্য। শ্রেণিগত বৈষম্যটা ক্রমাগত বাড়ছে। অধিকার ও সুযোগের সমতা প্রতিষ্ঠা না করে রাষ্ট্র উল্টো দিকে যাচ্ছে। ক্রমাগত বৈষম্য বাড়াচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সংঘর্ষপ্রবণ হয়েছে মানুষ। প্রত্যেকটা মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থ দেখছে। অল্প কিছু লোক ধনী হয়ে গেল। পাকিস্তান আমলে অবাঙালিরা ধনী হতো, এখন বাঙালিরা ধনী হচ্ছে। ভয়ংকর একটা ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। সেটা হলো কর্মের সংস্থান হয়নি। যারা ধনী হলো, তারা হঠাৎ করে ধনী হয়েছে, অবৈধ উপায়ে ধনী হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে কেউ হয়েছে, কেউ হয়েছে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঋণখেলাপি হয়ে, অনেকে ধনী হয়েছে বিদেশি কম্পানির এজেন্ট হিসেবে। এইসব বড়লোকের দেশপ্রেম নেই। তারা ধারণা করছে, বাংলাদেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, তাই বাংলাদেশে তাদের কোনো বিনিয়োগ নেই। তারা তাদের ভবিষ্যৎ এই দেশে দেখতে পাচ্ছে না। তাদের সন্তানরা বাইরে লেখাপড়া করছে, তারা সম্পত্তি বাইরে পাচার করছে। নির্বাচিত সরকার আসে, অনির্বাচিত সামরিক সরকার আসে, অন্তর্বর্তী সরকার আসে; কিন্তু শাসন করে ধনীরাই। মর্মান্তিক ব্যাপার হলো, কোনো সরকারই কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগও হচ্ছে না।
দেশে ক্রমাগত সব ভায়োলেন্স সন্ত্রাস বাড়ছে। সন্ত্রাস তো আকাশ থেকে পড়ে না। সন্ত্রাসের বড় কারণ হলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা এবং বেকারত্ব। বেকার লোকের পক্ষে সন্ত্রাসী হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। বেকারত্বের সঙ্গে মাদকাসক্তিও জড়িত। ধনী ব্যক্তিদের সন্তান থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালা পর্যন্ত এই ভয়াবহ নেশায় আসক্ত হচ্ছে। সেটাও কর্মহীনতার সঙ্গে জড়িত। মৌলবাদের সমস্যাও কিন্তু দারিদ্র্যের সঙ্গে যুক্ত। দারিদ্র্যের কারণে মানুষের জীবনে কোনো নিশ্চয়তা নেই, সুবিচার নেই, কোথাও দাঁড়ানোর কোনো জায়গা নেই; মানুষ তাই নির্ভরশীল হচ্ছে আধিদৈবিক শক্তির ওপর। মনে করছে, পরকালে সে শান্তি পাবে।
আমরা ভেবেছিলাম, এই রাষ্ট্র জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হবে। কিন্তু রাষ্ট্র আমলাতান্ত্রিকই রয়ে গেছে। দক্ষতাই হচ্ছে বড় কথা। আমরা বাংলাও ভালো জানি না, ইংরেজিও ভালো জানি না। বিদেশে গিয়ে আমাদের অশিক্ষিত শ্রমিক কিন্তু ভাষা সমস্যায় পড়ে না। তারা শিখে ফেলে, কাজও করে চমৎকার। ভাষা শিক্ষার সমস্যাটা গুটিকয়েক মানুষের জন্য, যারা বিদেশে পড়তে যায়। এটা তো স্বীকৃত সত্য যে মাতৃভাষা ভালো না জানলে ভালো শিক্ষা লাভ করা যায় না। আজ এই বিশ্বায়নের যুগে মানুষ কিন্তু তার দাঁড়ানোর জায়গাটা খুঁজছে নিজের মাতৃভাষায়। এই উপলব্ধিটাও এসেছে যে একটা রাষ্ট্রের মধ্যে বহু জাতি থাকবে, রাষ্ট্র বহুজাতিক হবে এবং রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে মাতৃভাষার চর্চা চলবে। আশা ছিল, মাতৃভাষা ব্যবহারের যে সুযোগ আমাদের এসেছিল সেটা আমরা ব্যবহার করব, প্রবাসী বাঙালিরা ব্যবহার করবে; কিন্তু সেটা আমরা করতে পারিনি। বাংলা ভাষায় এমন সাহিত্যও তৈরি করতে পারিনি।
জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে কার বিরুদ্ধে ঐক্য এবং কিসের জন্য ঐক্য। কার বিরুদ্ধে ঐক্য সেটা একাত্তর সালে আমরা জানতাম, ঐক্য ছিল পাকিস্তানি শোষকদের, পাকিস্তানপন্থীদের বিরুদ্ধে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার জন্য ঐক্য। এখন সেই ঐক্য নেই। এখন প্রতিটি মানুষ শুধু নিজের সমৃদ্ধি নিয়ে ভাবছে। নিজের স্বার্থ দেখছে। অন্য কোনো আদর্শ নেই। মুক্তিযুদ্ধের যে আদর্শ, সেই আদর্শ সামনে আনতে হবে। সে আদর্শটা ছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। ওই আদর্শে যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এই ঐক্যটা শুধু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষের কথা বলে আসবে না। একাত্তর সালে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করাটা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে হওয়ার নিরিখ নয়। নিরিখটা হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, যার পৃষ্ঠপোষক সাম্রাজ্যবাদ।
মৌলবাদের বিকাশের ক্ষেত্রটা নষ্ট হলো না। সেটা তাজা রইল বিশেষভাবে দারিদ্র্যের কারণে। দরিদ্র মানুষ মুক্তির কোনো পথ পাচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে যাঁরা নিজেদের মনে করেন, তাঁদের আচরণ আদর্শ আচরণ নয়। ব্যক্তিগত স্বার্থকে তাঁরাও বড় করে দেখছেন। কাজেই মানুষের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হচ্ছে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভটাও প্রকাশের পথ খুঁজে পাচ্ছে না। যার ফলে মানুষ মৌলবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এটা আন্তর্জাতিকভাবেও সত্য। আমরা তুরস্ক ও আলজেরিয়ায়ও সেটা দেখছি। ওসব দেশে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, সমাজের বিরুদ্ধে মানুষের যে বিক্ষোভ, সেই বিক্ষোভ প্রকাশের জন্য গণতান্ত্রিক পথ খুঁজে পাচ্ছে না, ফলে সেটা অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছে।
একটি গণতান্ত্রিক সরকার হচ্ছে নির্বাচিত সরকার, কিন্তু নির্বাচিত সরকার মানেই গণতান্ত্রিক সরকার নয়। সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন পরস্পর সহনশীলতা, মূল্যবোধ, মর্যাদা। সেটা বুর্জোয়া দলের মধ্যে নেই। আর দলেই যদি গণতন্ত্র না থাকে, তাহলে সংসদে গণতন্ত্র আসবে কিভাবে? বুর্জোয়া দলের আদর্শগত অবস্থানও মৌলিকভাবে এক। তারা আসলে ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ি করে থাকে। ক্ষমতা দখল করা মূল ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালে সহনশীলতা বা ধৈর্য থাকে না।
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল সংসদে অংশ নেবে। সরকার একটি মন্ত্রিসভা গঠন করবে, বিরোধী দল মন্ত্রিসভার পাল্টা একটা ছায়া সরকার গঠন করবে। তারা সরকারের ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিয়ে বিকল্প কী হওয়া উচিত সেটা বলবে। এ জন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের ব্যাপারে স্বতন্ত্র গবেষণা সেল থাকবে। এরপর আসে সংসদীয় কমিটি। অনেক বিষয় সংসদীয় কমিটির আলোচনায়ই মীমাংসা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে সংসদীয় কমিটিগুলো কাজ করে না। এ ছাড়া কন্ট্রোলার ও অডিটর জেনারেল আছেন, যিনি অডিট করেন। সেই অডিট রিপোর্ট সংসদে পেশ করার কথা, আলোচনা হওয়ার কথা; সেটা সংসদে করা হয় না। আমাদের সংসদে বিরোধী দল তো আসেই না। যে-ই পরাজিত হয়, সে-ই মনে করে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি, তাই তারা সংসদে অংশগ্রহণ করবে না। আর যিনি স্পিকার থাকেন, তিনি নিরপেক্ষ থাকেন না। বিরোধী দল সংসদে না থাকায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা পায় না। এটা আদায় করার দায়িত্ব বিরোধী দলের। সরকারি দল বাইরে যা-ই বলুক, আমার মনে হয় তারাও চায় না যে বিরোধী দল সংসদে থাকুক। আর দেখা যায়, সংসদে সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার সমস্যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। জাতীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সেখানে আলোচনা হওয়ার কথা, কিন্তু তা হচ্ছে না। সেদিক থেকেও সংসদ কার্যকর হচ্ছে না। তাই আমরা কখনো দেখি নির্বাচিত বা বৈধ স্বৈরাচার এবং কখনো দেখি অবৈধ, অসাংবিধানিক স্বৈরাচার থাকছেই।
প্রত্যাশা হচ্ছে, সমাজ গড়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের যে আদর্শ, তা বাস্তবায়ন করার জন্য আন্দোলন অব্যাহত রাখা। এই আদর্শ বাস্তবায়িত হলে মানুষ ওই চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হবে। এই ঐক্য তখন বুর্জোয়া দলের বাইরে একটা নতুন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিকে পুষ্ট করবে।
এই প্রত্যাশা পূর্ণ করার জন্য অতীতকে ভোলার তো প্রশ্নই ওঠে না। অতীত ভুলতে পারে উন্মাদ বা বিকৃত মনের মানুষ। স্মৃতিভ্রংশ মানুষ যেমন স্বাভাবিক মানুষ নয়, স্মৃতিভ্রংশ জাতিও তেমন স্বাভাবিক জাতি নয়। চাইলেই কি আমরা অতীতকে ভুলে যেতে পারব? অতীত তো আমাদের বর্তমানের মধ্যে প্রবহমান। সে কারণে অতীতকে ভোলার প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের দুটি কাজ করতে হবে। অতীতে যে ভালো কাজগুলো ছিল, সেগুলো বিকশিত করতে হবে। অতীতে যে গণতান্ত্রিক উপাদান, ঐক্য, যে সংগ্রামী চেতনা ছিল, তার বিকাশ চাই। আর যে খারাপ দিকগুলো ছিল, সংকীর্ণতা ছিল, পশ্চাৎপদতা ছিল, সেগুলোকে বাদ দিতে হবে।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
