১০ জুন।
আরও একটি বছর চলে গেল। দেখতে দেখতে বাবাহীন তিনটি বছর পার হয়ে গেল। কিন্তু আজও মনে হয়, এই তো সেদিনও আব্বু ছিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল, তাঁর শাসন ছিল, তাঁর বারবার খবর নেওয়া ছিল, তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ছিল।
একসময় আমি স্বাধীনতা চাইতাম।
মনে হতো, কোথাও গেলে আব্বু এতবার কল কেন করেন! কেন বারবার জানতে চান, কোথায় আছি, কখন ফিরবো, খেয়েছি কি না। কখনো কখনো মন থেকে প্রকাশ না করলেও বিরক্ত হতাম।
বিশেষ করে যখন গ্রাম থেকে অনেক দূরে হ্নীলায় শিবিরের সাথী বৈঠক কিংবা বিভিন্ন প্রোগ্রামে যেতাম, খুব ভোরে বের হতাম। মা বুঝতে পারতেন কিংবা বলে যেতাম কোথায় যাচ্ছি। কিন্তু আব্বু ঘুম থেকে উঠেই শুরু করতেন খোঁজ নেওয়া।
কোথায় আছো?
পৌঁছেছো? খেয়েছো? কখন ফিরবে?
প্রোগ্রামে আছি শুনে কিছুটা স্বস্তি পেতেন। আবার ফিরে আসার সময়ও বারবার খবর নিতেন। বাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত যেন তাঁর চিন্তার শেষ হতো না। তখন বুঝিনি, এগুলো বিরক্ত করার জন্য ছিল না।
এগুলো ছিল একজন বাবার ভালোবাসা।
আজ তিনটি বছর হয়ে গেল।
এখন আর কেউ বারবার কল করে না।
দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, তবুও বাবার মতো করে কেউ খবর রাখে না।
হাজার মানুষের ভিড়েও আজ বুঝতে পারি, আমার খবর রাখার মানুষটি আসলে আমার বাবাই ছিলেন।
তাঁর অভাব কোনোদিন পূরণ হবে না।
এই অপূর্ণতা হয়তো আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হবে।
সেদিন ছিল শনিবার।
খুব ভোরে আব্বুর কলটা ঠিক সময়ে ধরতে পারিনি। নামাজের পর আমি নিজেই কল করেছিলাম। তখনও জানতাম না, সেটিই হবে আমাদের শেষ কথা।
সালামের উত্তর দিয়ে আব্বু বলেছিলেন,
আমাকে কি চিনতে পারো নাই?
আজও জানি না, কেন এই কথাটি বলেছিলেন।
কেন যে সেদিন এ কথা তাঁর মুখে এসেছিল, তা আজও আমার হৃদয়ের অজানা রহস্য হয়ে আছে।
তারপর সকাল ০৮টা ১০ মিনিট।
বন্ধু রিদওয়ানের মেসেঞ্জারের কয়েকটি শব্দ আমার পৃথিবীটাকে ওলটপালট করে দিয়েছিল। সেই শব্দে বাবাকে হারানো কথা হৃদয় থেকে না ভুলতে শব্দ জীবনের গল্প।
তখন আমি কী করবো, কাকে বলবো, কোথায় যাবো, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
আমি কখনো ভাবিনি, এত দ্রুত বাবাকে হারাতে হবে।
কখনো ভাবিনি, জীবনের এই বেলায় আব্বুর জানাজার নামাজ আমাকে পড়াতে হবে।
কখনো ভাবিনি, মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বাবার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে।
সেদিন মনে হয়েছিল, পৃথিবীটা অস্বাভাবিক হয়ে গেছে।
আজও মাঝে মাঝে সেই অনুভূতি ফিরে আসে।
তারপর আবার অনেক কিছু ভুলে যাই।
মনে হয়, ভুলে যাওয়াটাও হয়তো আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত। না হলে মানুষ এত কষ্ট নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকতো?
বাবা,
আজও যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাই, মনে হয় তোমাকে বলি। কোনো বিষয়ে পরামর্শের প্রয়োজন হলে মনে হয়, তোমার কাছেই যাই।
কোনো সুখের সংবাদ এলে মনে হয়, তোমাকেই আগে জানাই। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে হৃদয় উত্তর দেয়, সে সুযোগ তো এখন আর নেই।
আজও ফজরের সময় ঘুমিয়ে থাকলে কানে ভেসে আসে তোমার সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর,
নামাজ পড়ে এসে আবার ঘুমাও, উঠো, কুরআন পড়ো। হয়তো তুমি নেই, কিন্তু তোমার সেই শব্দগুলো এখনো আমার হৃদয়ে জীবন্ত।
আজ শাসন চাই, পাই না।
ভালোবাসা চাই, পাই না।
যত্ন চাই, পাই না।
তোমার মতো খবর রাখার মানুষ পৃথিবীতে অনেক খুঁজেও আর পাইনি। বাবার মৃত্যু আমাকে শিখিয়েছে, আমাদের সবকিছু এক মুহূর্তেই ভেঙে পড়তে পারে।
কঠিন সময় আমাকে শিখিয়েছে, মানুষের অহংকার করার মতো কিছুই নেই। প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি দুটোই পরীক্ষা, দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ।
লক্ষ মানুষের ভিড়েও একজন মানুষ কত নিঃসঙ্গ হতে পারে, সেটাও শিখেছি। আর শিখেছি, বিশ্বাসীদের একাকীত্বকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
তবুও, বাবা…
হৃদয়ের গভীরে জমে আছে হাজারো না বলা কথা।
মনে হয়, যদি আরেকবার বলতে পারতাম,
আব্বু, আমি ভালো নেই।
যদি আরেকবার তুমি বলতে,
চিন্তা করো না, বাবা, আমি আছি।
এখন পেতে অনেক চাই– চাইতে অনেক চাই,
কিন্তু যায় না বলা তাহা, কারণ এখন তো আমার সব অবেলা।
হে বাবা!
বলার ছিল অনেক কিছু, হয়ে উঠলো না বলা।
হৃদয় আজও তোমাকে ডাকে, হৃদয় আজও তোমাকে খোঁজে।
হৃদয় আজও চায়, ওপারে কোনো একদিন আবার তোমার সঙ্গে দেখা হোক।
যেদিন আর বিদায় থাকবে না, যেদিন আর বিচ্ছেদ থাকবে না।
আজ তোমার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে মহান রবের দরবারে দুই হাত তুলে শুধু এই দোয়াই করি,
.رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
হে আল্লাহ! আমার বাবাকে ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন, তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন।
যখনই হারিয়েছে সে-ই হাত,
পোহাচ্ছি দুঃখ আর বেদনা।
রেজাউল করিম
১০/০৬/২০২৬ ইং
