ভূমিকম্প ও বাংলাদেশ

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

ড.মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম : ভূ-ত্বকে সঞ্চিত শক্তির তরঙ্গ আকারে বহিঃপ্রকাশে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হতে পারে। হঠাৎ ওই নির্গত শক্তির বহিঃপ্রকাশ ভূমিকে কাঁপিয়ে তুলতে পারে। ভূ-গর্ভস্থ রকের সঙ্গে বিদ্যমান ফল্টের ধাক্কায়ও ভূমিকম্প সৃষ্টি হতে পারে। যখন দুটি প্লেট একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান করে, তখন কিছুটা আটকে থাকে। যখন প্লেটে বিদ্যমান শিলাগুলো ভেঙে যায়, তখনই মাটিতে কম্পন দেখা দেয়। ভূমিকম্প সিস্মোমিটারে পরিমাপ করা যায়। এটি আবার সিস্মোগ্রাফ নামেও পরিচিত। মূলত বিশ শতকের দিকে ভূমিকম্পে ক্ষতির সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। ওই শতকেই ১৯৬০ সালের ২২ মে দক্ষিণ চিলিতে গভীর ও ভয়ানক ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপে প্রায় ৯ দশমিক ৫ মাত্রার ছিল। ইতিহাস পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, ১৮১১ সালের দিকে দক্ষিণ আমেরিকায় রিখটার স্কেলে আট মাত্রার বেশি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল।
bd Map TEKNAF TODAY - সীমান্তের সর্বশেষ খবর
বিভিন্ন কারণে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ভূ-গর্ভস্থ পানির উত্তোলন, প্রচুর বৃষ্টিপাত, কার্বনডাই অক্সাইডের বৃদ্ধি, বাঁধ নির্মাণ, বনায়ন ধ্বংস, জিওথার্মাল শক্তির স্থানান্তর ও জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তনে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত গ্রিন হাউজ গ্যাস ক্রমান্বয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। ক্রমান্বয়ে ওই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত বৈশ্বিক উষ্ণতা পৃথিবীতে বিদ্যমান বরফ গলিয়ে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়াতে সাহায্য করছে। ওই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত সমুদ্রের পানি, ভূ-গর্ভস্থ ফল্টে পানির পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে। তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যদি ভূ-গর্ভস্থ ফল্টে পানির পরিমাণ বেড়ে যায়, তাহলে ভূমিকম্পের ফ্রিকোয়েন্সি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অন্যদিকে বনায়ন ধ্বংসে ভূমিধসের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। ওই ভূমিধসে ভূগর্ভস্থ মাটিতে বিদ্যমান আন্তঃশক্তি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে টেকটোনিক প্লেটের গতি বেড়ে হঠাৎ ভূমিকম্পের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। আবার আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতও ভূমিকম্প বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। আগ্নেয়গিরিতে বিদ্যমান ‘রিং অফ ফায়ার’ ভূমিকম্পের প্রতি সংবেদনশীল। ওই রিং অফ ফায়ারে পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ ভূমিকম্প দেখা যায়।

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশে পাহাড় কেটে অপরিকল্পিত আবাসন ও শহরায়ন গড়ে উঠেছে। ওই পাহাড় ধ্বংসে ভূমিধস বেড়ে যায়। ফলে ভূমিকম্পসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব লাগামহীনভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা যায়। ফ্লোরিডায় ইউনিভার্সিটি অফ মিয়ামিতে গবেষণায় দেখা যায়, বৃষ্টিপাত ভূমিকম্পের ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধিতে সাহায্য করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, টানা বৃষ্টিপাতে ২০১০ সালের দিকে হাইতিতে রিখটার স্কেলে সাত মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনে ছিল। অন্যদিকে ওই বৃষ্টিপাতে, ২০০৯ সালের দিকে তাইওয়ানে প্রায় ছয় দশমিক চার মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। মোটা দাগে দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনে বৃষ্টিপাত, সাইক্লোন ও ঝড়ের প্যাটার্ন অনাকাক্সিক্ষত হারে পরিবর্তিত হচ্ছে, যা ভূমিকম্পের প্রাদুর্ভাব বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

বাংলাদেশের চারপাশে অনেক টেকটোনিক ব্লক রয়েছে। দেশটির নিম্নাঞ্চল বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সংযুক্তি রয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের মানুষ খুব বড় ধরনের ভূমিকম্পের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেনি। বাংলাদেশে যদি সাত মাত্রার বেশি ভূমিকম্প দেখা দেয়, তাহলে বিদ্যমান বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস ও মানুষের মৃত্যুর হার লাগামহীনভাবে বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে সি লেবেল দেশটির কাছাকাছি হওয়ায় ভূমিকম্পের সঙ্গে সুনামিও দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশে ১৯০০ সালের পরবর্তী সময়ে প্রায় ১০০টির বেশি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। তন্মধ্যে প্রায় ৬৫টির বেশি ভূমিকম্প ১৯৬০ সালের পরবর্তী সময়ে রেকর্ড করা হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ফ্রিকোয়েন্সি লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডেটা অনুযায়ী, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ঘন ঘন ভূমিকম্প আঘাত হানে। মূলত উৎপত্তিস্থল থেকে সিলেট অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে ভূমিকম্প প্রবেশ করে। বাংলাদেশে ২০২০ সালে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে দুটি ভূমিকম্প হয়েছিল, রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ৪ এবং ৩ দশমিক ৭। ওই ভূমিকম্প দুটির উৎপত্তিস্থল আগ্নেয়গিরি থেকে গড়ে ৬৮০ কিলোমিটার দূরে ছিল। ২০২১ সালে মে ও জুনেও দুটি ভূমিকম্প ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় আঘাত হানে। রিখটার স্কেলে ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৩-এর বেশি। ১৯৮৮ সালে সিলেটে মাঝারি থেকে বড় আকারের ভূমিকম্প দেখা দিয়েছিল, রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৮। ওই ভূমিকম্পে টেকটোনিক প্লেটের গভীরতা ছিল প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। রিখটার স্কেলের হিসাবে চার মাত্রার ভূমিকম্পকে হালকা ধরে নেওয়া হয়। অন্যদিকে ছয় থেকে সাত মাত্রার ভূমিকম্পকে শক্তিশালী হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। এ মাত্রার ভূমিকম্পে মানুষ ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এ পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ৩৭টির বেশি বড় ধরনের ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। রিখটার স্কেলে যেগুলোর মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫-এর বেশি। ওই মাত্রার ভূমিকম্পে আক্রান্ত দেশগুলো হলো- চিলি, আমেরিকা, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, জাপান, আফ্রিকা, বাংলাদেশ, কলোম্বিয়া, চীন, রাশিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশ। বাংলাদেশে ওই ঐতিহাসিক ভূমিকম্পটি ১৭৬২ সালের দিকে চট্টগ্রাম অঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করেছিল।

জিওগ্রাফিক্যালি বাংলাদেশের অবস্থান ভূমিকম্প জোনে। ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকম্পের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির অনেকটা আশঙ্কা রয়েছে। সুতরাং জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট ভূমিকম্প ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় মানুষকে সচেতন হতে হবে। এ অবস্থায়, পরিকল্পিত নগরায়ণ, পাহাড় কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা, বনায়নের পরিমাণ বৃদ্ধি, পরিকল্পিত শিল্পায়ন, নদীর নাব্য বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নে বায়ুমণ্ডলে নির্গত গ্রিন হাউজ গ্যাস কমিয়ে ভূমিকম্পসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভূমিকম্প-সহনশীল বাড়ি নির্মাণের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি ভূমিকম্প ছাড়াও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দিয়েছেন। বস্তুত, সমগ্র পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েই চলছে। এভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকলে উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশসহ নিম্ন আয়ের দেশগুলো অধিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এ অবস্থায় সচেতনতার পাশাপাশি ভূমিকম্প নিয়ন্ত্রণে সঠিক গাইডলাইন তৈরি অতীব জরুরি। এ ক্ষেত্রে, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আওতায় ভূমিকম্পের ওপর প্রতিনিয়ত গবেষণা অব্যাহত রাখা উচিত। গবেষণালব্ধ ফলাফল, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রচারে জনগণকে সচেতন করা যেতে পারে।

যদিও প্রাকৃতিকভাবে সংঘটিত ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা অসম্ভব, তবুও ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করা যেতে পারে। ওই ঝুঁকি অনুযায়ী, নিরাপদ কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। মানবজাতির টেকসই জীবনযাপনের জন্য ভূমিকম্পে সৃষ্ট ঋণাত্মক প্রভাবগুলো পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। পরিশেষে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশে যদি রিখটার স্কেল সাত মাত্রার বেশি ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে ঘরবাড়ি ধ্বংস ও অনাকাক্সিক্ষত হারে মানুষের মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মোটাদাগে বলা যেতে পারে, ভূমিকম্পের বিধ্বংসী আঘাত মোকাবিলায় সরকার ও জনগণের সচেতনতা অতীব জরুরি।

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম : সহযোগী অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

mohammad.alam@wsu.edu