সফিকুল আলম : তীব্র তাপদাহে পুড়ছে উত্তরের চা বাগান। তাপে ঝলসে যাচ্ছে গাছের কচি পাতা, বিশাল সবুজের সমারোহ এখন কালচে লাল। কুঁকড়ে বিবর্ণ হয়ে পড়েছে কুঁড়ি। টানা গরমের প্রভাব ও বৃষ্টি না হওয়ায় কমে এসেছে উৎপাদন। চলতি মৌসুমের মার্চে প্রথম রাউন্ডে ঠিক থাকলেও এপ্রিলে এসে দ্বিতীয় রাউন্ডের উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়েছে। চাহিদা অনুযায়ী চা পাতা না পেয়ে পঞ্চগড়ের অর্ধেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
বাগান মালিক, চাষি, শ্রমিক ও পঞ্চগড় চা বোর্ড সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সর্বোচ্চ ২৬ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলো মানসম্মত চা উৎপাদনের উপযোগী তাপমাত্রা। কিন্তু বর্তমানে পঞ্চগড়ে ৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে তাপমাত্রা ওঠানামা করছে। রোদের প্রকোপ থেকে বাঁচতে উত্তরাঞ্চরের বেশিরভাগ বাগানে শেড ট্রি (ছায়া গাছ) নেই। ফলে তীব্র গরম ও টানা রোদে গাছে লাল মাকড়সা, লুপারসহ হরেক রকম পোকার আক্রমণ বেড়ে গেছে। পর্যাপ্ত পানির অভাবে চায়ের কচি পাতা ও কুঁড়ি কুঁকড়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত সেচ এবং কীটনাশক দিয়েও কাজ হচ্ছে না। চা চাষিরা প্রথম রাউন্ডে ১৪ লাখ কেজি কাঁচা পাতা উৎপাদন করলেও, এপ্রিলের শুরু থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে কোনো পাতা তুলতে পারেননি।
সরবরাহ না পেয়ে জেলার ২৫টির মধ্যে ১২টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলোও চলছে ধুঁকে ধুঁকে। তাপদাহ অব্যাহত থাকলে গাছ মরে উৎপাদন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
সদর উপজেলার রামেরডাঙ্গা এলাকার ক্ষুদ্র চা চাষি হাসিবুল ইসলাম বলেন, ‘তীব্র গরমের সঙ্গে বৃষ্টি না হওয়ায় বাগান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিমভাবে সেচ ও কীটনাশক দিয়েও পোকামাকড় ঠেকানো যাচ্ছে না। দ্বিতীয় রাউন্ডের পাতা এখনও উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি।’তেঁতুলিয়ার মাঝিপাড়া এলাকার চাষি আব্দুর রহমান বলেন, ‘এক মাস ধরে চলা খরায় বাগান পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। বাড়তি ব্যয়ে প্রতিদিন সেচ দিয়ে কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছি। কিন্তু আমার পাশের বাগান নষ্ট হয়ে গেছে।’
ভজনপুর বামনপাড়া এলাকার চাষি আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথম রাউন্ডে ২০ হাজার টাকার চা পাতা বিক্রি করেছি। চলতি দ্বিতীয় রাউন্ডে ১ হাজার টাকার চা পাতাও বিক্রি করতে পারিনি। কী করব ভেবে কূল পাচ্ছি না!’
বাংলাদেশ বটলিফ টি ফ্যাক্টরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, পঞ্চগড়ের সভাপতি ও বিসমিল্লাহ টি ফ্যাক্টরির চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘তীব্র তাপদাহে ভীষণ ক্ষতি হচ্ছে। চা পাতার অভাবে ১৫ দিন হলো কারখানা বন্ধ রেখেছি। মালিকদের সঙ্গে চাষি ও কারখানার শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
বাংলাদেশ চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ আমির হোসেন বলেন, ‘আগে এ সময়ে ভালো বৃষ্টিপাত হতো। এবার পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। বৃষ্টি না হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের বেশিরভাগ চা বাগানে পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে গেছে। খরায় চায়ের কিশোলয় (কচি পাতা) বাড়ছে না। পাতা কুঁকড়ে লালচে হয়ে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বারবার পরামর্শ দিলেও কেন জানি উত্তরাঞ্চলের চা বাগান মালিকরা শেড ট্রি লাগাতে চান না। এটি থাকলে এখন পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না। দু-এক দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত হলে অবস্থার উন্নতি হবে এবং আশা করছি, বার্ষিক উৎপাদন লক্ষমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।’
