টেকনাফ টুডে ডেস্ক : নির্মিত হওয়া সীমান্ত সড়কের বাহিরের পাশে খাস খতিয়ান ও উপকূলীয় বনায়নের গাছপালা নিধন করে লীজ গ্রহণ ও প্রস্তাবনার অজুহাতে মৎস্য চাষের নামে দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং মাদক কারবারে সংশ্লিষ্ট লোকজন। সীমান্ত সড়কে ঘুরতে আসা লোকজন এই সড়ককে টেকসই, মজবুত ও পর্যটন রোড় হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বনায়নের মাধ্যমে পাখির কলতানে মুখরিত করার দাবী জানিয়েছে।
জানা যায়, তুমব্রু-পালংখালী থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত নির্মিত হওয়া সীমান্ত সড়কের ভেতর ও বাহির পাশে কিছু মৎস্য প্রজেক্ট ছিল। সড়কটি নির্মাণের জন্য উভয় পাশ থেকে মাটি নেওয়ায় পুরো এলাকায় গর্তের সৃষ্টি হয়। তাই এলাকার প্রভাবশালী বিভিন্ন স্তরের লোকজন খাস খতিয়ানের জমি লীজের নামে প্রস্তাবনার অজুহাতে মাঠে থাকা কিছু লোকজনের যোগসাজশে দখলের প্রতিযোগিতায় নামে। এই প্রতিযোগিতায় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, স্থানীয় প্রভাবশালী এবং বিভিন্ন সংগঠনের ব্যনারে থাকা লোকজন সম্পৃক্ত।
নাফনদী নির্ভর চিহ্নিত কিছু মাদক কারবারী এসব লোকজন থেকে মৎস্যঘেঁর লাগিয়ত নিয়ে মৎস্য চাষের আড়ালে ভাড়াটে লোকজন নিয়ে বিশেষ সিন্ডিকেট করে দেদারসে মাদকের চালান খালাস করছে। উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বরইতলী, ঊলুবনিয়া, বালুখালী পাড়া, লম্বাবিল, ঊনছিপ্রাং-কাঞ্জরপাড়া, নয়াপাড়া, ঝিমংখালী-মিনাবাজার, নয়াবাজার-খারাংখালী, হ্নীলা ইউনিয়নের মৌলভী বাজার-হোয়াব্রাং, সুলিশ পাড়া, পূর্ব ফুলের ডেইল, জালিয়াপাড়া, চৌধুরী পাড়া, আলীখালী, লেদা, মোচনী, নয়াপাড়া, জাদিমোরা, দমদমিয়া, টেকনাফ সদরের বরইতলী, নাইট্যং পাড়া, পৌর এলাকার কায়ুকখালী পাড়া, বৃহত্তর জালিয়া পাড়া, নাজির পাড়া, সাবরাং ইউনিয়নের মৌলভী পাড়া, সিকদার পাড়া, নয়াপাড়া ও শাহপরীর দ্বীপ জালিয়াপাড়া থেকে সীমান্ত রক্ষী বিজিবির বিভিন্ন অভিযানে মাদকের চালানসহ আটকের ঘটনায় প্রতীয়মান হয়েছে।
নয়াবাজার পশ্চিম সাতঘরিয়া পাড়ার মিয়ানমার নাগরিক মোঃ নুর খারাংখালী,নয়াবাজার, মিনা বাজার ও ঝিমংখালী এলাকা থেকে বেশ কিছু মৎস্য প্রজেক্ট লাগিয়ত নিয়ে পুরোদমে মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। তার রয়েছে বিশাল সিন্ডিকেট। অবৈধ অস্ত্রধারী এসব মাদক সিন্ডিকেটের সংঘবদ্ধ সদস্যদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে প্রাণ হারাতে হয়। না হয় মাদক ও অস্ত্র মামলায় কারাগারে যেতে হয়। নাফনদীকে ঘিরে উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে মোঃ নুরের মতো অনেক মাদক কারবারী গডফাদার কৌশলে সক্রিয় রয়েছে। তাই সীমান্ত সড়কের পূর্ব পাশে মৎস্য ঘেঁরের নামে মাদক কারবারীদের সুযোগ দেওয়ার প্রশ্নউ আসেনা।
ঈদ উৎসবের সময় স্বপরিবারে সীমান্ত সড়কে বেড়াতে আবুল কালাম জানান, হাজারো ব্যস্থতার মধ্যে পরিবার ও ছেলে-মেয়ে নিয়ে বেড়ানোর জায়গা মিলেনা। এখানে খোলা বাতাস আর সবুজ গাছপালা দেখে মন জুড়িয়ে যায়। মাঝে-মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পাখির দেখা মেলে। পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষা এবং সীমান্ত সড়কের টেকসই রক্ষার্থে সড়কের পূর্ব পাশে সবুজ বনায়ন করার বিকল্প নেই।
নাতিদের নিয়ে ঘুরতে আসা দাদী ছেনুয়ারা জানান, দীর্ঘদিন পর নাত-নাতিদের নিয়ে নাফনদীর সড়কে একটু মনোরম পরিবেশে হাঁটছি। পরিবেশটা খুব ভাল লাগছে। এই পরিবেশটা ধরে রাখা দরকার।
বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে আসা তোফাইল জানান, বাজার-ঘাট ও গ্রামের কোথাও মনোরম পরিবেশে বসার তেমন একটা জায়গা নেই। তাই মনোরম সীমান্ত সড়কে ঘুরতে আসলাম। বেশ ভালই লাগছে।
বান্ধবীদের সাথে ঘুরতে আসা রোকসানা জানান, পড়াশনুায় ব্যস্থ থাকি। কাছে কোথাও বেড়ানোর জায়গা মিলেনা। আবার নারীদের নিরাপত্তার কারণে দূরে কোথাও যেতে পারিনা। তাই বাড়ির পাশের এই সড়কের একটু ঘুরতে আসলাম।
স্থানীয়রা জানায়,নাফ নদীর পূর্বপাশে প্যারাবনে কিছু মৎস্যঘেঁর ছিল। সীমান্ত সড়ক হওয়ার পর কোথাও ফাঁকা নেই। সবাই মৎস্য ঘেঁরের নামে শত শত একরের খাস জমি দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। মাটির বাঁধ দিয়ে ঘেঁর তৈরি করে মাছ চাষ শুরু করেছে। এভাবে চলতে থাকলে এখানে আগামীতে উপকূলীয় কেওড়া বনের অস্তিত্ব রাখা দায় হবে।
পরিবেশবাদী সংগঠন কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি দখল করে পরিবেশ-প্রতিবেশের বিপর্যয় ঘটিয়ে মাছের ঘেঁর তৈরি করার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি অবিলম্বে নাফ নীঁর তীর রক্ষার আহবান জানান।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, নদী দখলের বিষয়টি তাদের জানা নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তানজীর সাইফ আহমেদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, ‘নাফ নদীর তীরের বেড়িবাঁধটি নির্মাণের পর আমি সরেজমিন পরিদর্শন করে ঠিকাদারের বিল দিয়েছি। তখন কিন্তু কোনো মাছের ঘেঁর দেখিনি। ওই প্রকৌশলী জানান, ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নাফ নীঁর তীরের ৬০ কিলোমিটার লম্বা সীমান্ত সড়ক (বেড়িবাঁধ) নির্মাণ করা হয়েছে। নদী লাগোয়া জমিতে সড়ক করা হয়েছে। সড়কের বাইরে তেমন বেশি জমিও বাকি নেই। সড়কের ভেতরে ও বাইরের অংশে বাঁধ দিয়ে ঘেঁর করা হলে বাঁধের ক্ষতি হবে। এ কারণে সড়কটি (বাঁধটি) সরেজমিন গিয়ে দেখার জন্য লোক পাঠানো হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী বলেছেন, এই মুহূর্তে জমি ইজারা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এলাকার সচেতন মহল মনে করেন, বর্তমানে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে উত্তাপ আর অনাবৃষ্টিতে সাধারণ মানুষ চরম বিপাকে রয়েছে। তাই এই খাস জমির লীজ বন্ধ রেখে সীমান্ত সড়কের পাশ দিয়ে সুরম্য সবুজ বনায়ন গড়ে তোলার জন্য সরকারের উর্ধ্বতন মহলের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। ###
