উপজেলা পরিষদ নির্বাচন : তৃণমূলে আওয়ামী লীগের শৃংখলা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ!

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৭ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : চার ধাপে দেশের ৪৪৫টি উপজেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি; অধিকাংশ উপজেলায় নিজেদের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা।

দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নৌকা প্রতীকে মাঠে নেমেছিলেন যারা, তাদের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই চালিয়ে গেছেন একই দলের মনোনয়নবঞ্চিত নেতারাও। তৃণমূলের নেতৃত্বে এ বিভক্তি ক্ষমতাসীন দলটির মন্ত্রী-এমপিসহ প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল নির্বাচনকালে।

উপজেলা নির্বাচন শেষ হলেও এটিকে কেন্দ্র করে তৃণমূল পর্যায়ের এই বিভক্তি এমন আকার ধারণ করেছে যে, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের জন্য। যদিও দলটির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, তৃণমূলের এ বিভক্তি সাময়িক। সামনেই আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন।

এ উপলক্ষে সারাদেশে সাংগঠনিক সফর করবেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য হবে তৃণমূলের বিভক্তি যতটা সম্ভব মুছে ফেলা। গত ১০ মার্চ থেকে শুরু হয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। চার ধাপে ৪৬৫ উপজেলার তফসিল ঘোষণা করা হলেও ভোটগ্রহণ হয়েছে ৪৪৫টিতে। চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ১১১ জন। নির্বাচিতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩১১ প্রার্থী নৌকা মার্কা নিয়ে এবং ১৩০ প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে অন্য কোনো প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। আর সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ৪ প্রার্থী চেয়ারম্যান হিসেবে জয় পেয়েছেন।

নির্বাচন পরবর্তী দলীয় মূল্যায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে .আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে উপজেলা নির্বাচন জরুরি ছিল। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা তেমন একটা ছিল না। নির্বাচন পক্ষপাতমুক্ত, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। কিন্তু এই নির্বাচনে দেশের বেশ কিছু উপজেলায় নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বিপক্ষে সরাসরি মাঠে নেমে কাজ করেছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় এমপি ও প্রভাবশালী নেতারা। এটি আওয়ামী লীগের জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী কর্মকর্তা সভাপতিম-লীর সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে, নৌকা প্রতীকের বিরোধিতাকারী মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের তালিকা তৈরি করছেন ৮ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের ৮ সাংগঠনিক সম্পাদক। আগামী শুক্রবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় তারা তাদের রিপোর্ট উপস্থাপন করবেন। এর পর ওই বৈঠকেই আলোচনাসাপেক্ষে নৌকার বিরোধীতাকারীদের বিষয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেবেন দলের সভাপতি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য লে. কর্নেল (অব) ফারুক খান বলেন, উপজেলা নির্বাচনে দলের দায়িত্বশীল যারা নৌকার বিপক্ষে কাজ করেছেন তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুসারে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, আমরা অংশ-গ্রহণমূলক উপজেলা নির্বাচন করার কথা বলেছি। কিন্তু নৌকা মার্কার প্রার্থীর বিপক্ষে ওই উপজেলার দায়িত্বশীলরা কাজ করবেন এটা হতে পারে না। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পরবর্তী কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় আলোচনার মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিষয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের যেসব দায়িত্বশীল নেতারা দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করেছেন তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের যেসব নেতা নৌকার বিপক্ষে মাঠে ছিলেন, আগামী সম্মেলনে তাদের দলীয় পদ টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সভায় এমন কথাও উঠেছে যে, নৌকা প্রতীকের বিরোধিতা করেছেন যেসব মন্ত্রী-এমপি, তাদের যেন আগামীতে দলের মনোনয়নও না দেওয়া হয়। বাংলাদেশের মতো একটা উন্নয়নশীল দেশে টানা তিন মেয়াদে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের মধ্যে কিছুটা সাংগঠনিক শৈথিল্য এসেছে বলে মানছেন দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা।

তাদের মতে, এবারের উপজেলা নির্বাচনে উঠে এসেছে সারা দেশে দলের সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার চিত্র। আগামী জাতীয় সম্মেলনের আগেই দলের মধ্যকার শৃঙ্খলা রক্ষায় একাধিক উদ্যোগ নেবে আওয়ামী লীগ। শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, আগামী অক্টোবরে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে সাংগঠনিক সফর শুরু হবে শিগগিরই। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যাবেন কেন্দ্রীয় নেতারা।

আশা করছি, দলের মধ্যে ছোটখাটো যে দুর্বলতা ধরা পড়েছে, এসব সাংগঠনিক সফরের মধ্য দিয়ে তা নিরসন করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, উপজেলা নির্বাচনকেন্দ্রিক স্থানীয় রাজনীতির এই বিভক্তি সাময়িক, আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটি নেতাকর্মী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সবসময় ঐক্যবদ্ধ।