ইউরোপের আলোকবর্তিকার বিদায়

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : এবারের গ্রীষ্মে ইউরোপীয় রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সঙ্গে বিদায় সাক্ষাতের সময় অ্যাঙ্গেলা মেরকেল ব্রিটেনের রানীকেও দেখতে এসেছিলেন। উইন্ডসরে তার আগমনের যে অল্প সময়টুকু ক্যামেরার সামনে কেটেছিল তা সত্যিই চোখে পড়ার মতো। একদিকে সবুজ ফুলের নকশার পোশাক পরা রানী। তার মুখের হাসি শত শত বছরের ঐতিহ্যের শর্তে মাপা। অন্যদিকে ট্রাউজার্স এবং বেগুনি আনুষ্ঠানিক কোট পরা এক লাজুক দর্শন নারী যিনি বারবার মাথা ঝুঁকিয়ে সঠিক কায়দায় একজন রাজকীয় ব্যক্তিত্বকে অভিবাদন জানানোর চেষ্টা করছেন।

এলিজাবেথ এবং অ্যাঙ্গেলা : দুটি ভিন্ন জগৎ, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের কার্যক্রম। তবু রয়েছে কিছু মিল। ওরকম বিরক্তিকর বক্তৃতা দেওয়ার সাহস করে না আর কেউই! স্টাইল, শান্তসৌম্য মূর্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিজেদের মধ্যে দেশকে মূর্ত করে তোলার গুণের দিক থেকে অনেক মিল তাদের। মেরকেল এখন জার্মানির চেয়েও বেশি কিছুর প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তিনি যেন গোটা ইউরোপের প্রতিমূর্তি। তিনি একজন পপ আইকন, যিনি একটি গানের মতো আমাদের চেতনায় প্রবেশ করেছেন। তার ছবিঅলা কফি মগ, টি-শার্ট এমনকি লেবু চিপার যন্ত্র বিক্রি হয়। এত কিছুর পরও অবশ্য মেরকেলের উত্থান এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকা একটা রহস্যই রয়ে গেছে। ক্ষমতার লাভালাভের প্রতি অদ্ভুতরকম উদাসীন হয়েও কীভাবে এই নারী দীর্ঘ ৫০ বছর রক্ষণশীল পুরুষদের নেতৃত্বে থাকা একটি দলের রাশ হাতে নিতে পারলেন। শুধু তা-ই নয়, পরপর চারবার বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশের নেতৃত্ব দিলেন! কীভাবে তিনি হয়ে উঠলেন এমন এক রোল মডেল যে এক স্কুলবালক তাকে সরলমনে জিজ্ঞেস করে বসেছিল : ‘আমরা ছেলেরাও কি চ্যান্সেলর হতে পারি?’

বহু বছর ধরে আমি অ্যাঙ্গেলা মেরকেলকে দেখে আসছি। তাকে নিয়ে অনেক লিখেছি। অতিসম্প্রতি একটি চলচ্চিত্র তৈরি করছি তার ওপর। আমার তরফে এটি কোনো অন্ধ প্রশংসা নয়, বরং বলা যায় একটি মুগ্ধতা : কারণ ১৬ বছর ধরে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির নেতৃত্ব দেওয়া জার্মানির প্রথম নারী চ্যান্সেলর এমন একটি দেশের মানুষ ছিলেন যার এখন আর অস্তিত্বই নেই। আমরা সেই দেশটির নামও খুব কমই মনে করতে পারি বা একে স্রেফ তিনটি আদ্যক্ষরে সীমিত করে ফেলি : জিডিআর (জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক বা পূর্ব জার্মানি) বর্তমানের আর কোনো বিশ্বনেতার এমন অসাধারণ প্রেক্ষাপট আছে? মেরকেল জার্মান চ্যান্সেলরের পদ থেকে অবসর নিলেন তার অর্ধেকেরও বেশি জীবন সোভিয়েত ব্লকের অন্তর্ভুক্ত স্বৈরশাসনে কাটিয়ে। জীবনের সেই পর্বে মেরকেলের দেশটি ছিল তার পশ্চিম অর্ধেক থেকে বিচ্ছিন্ন এবং মুক্ত বিশ্ব থেকে আলাদা। কীভাবে আর তিনি আমূল ভিন্ন না হবেন? এরই মধ্যে বার্লিন প্রাচীর পতনের আগে এবং পরে দুটি আলাদা জীবন কাটিয়েছেন মেরকেল। মেরকেলের সবচেয়ে সাধারণ সমালোচনা হচ্ছে যে তিনি ‘কিছুই করেননি’। তিনি নাকি ইতিহাসের খাতায় পূর্বসূরিদের মতো কোনো ছাপ রেখে যাননি। কনরাড এডেনাউয়ার পশ্চিম জার্মানিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ করেছেন এবং আজকের ইইউর ভিত গড়ে তুলতে সহায়তা করেছেন। হেলমুট কোহল জার্মানির পুনর্মিলন ঘটান এবং ডয়েশমার্ককে একক ইউরোপীয় মুদ্রায় অন্তর্ভুক্ত করেন। গেরহার্ড শ্রোয়েডার জার্মানিকে প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য শ্রম আইনে নির্মম এবং অজনপ্রিয় সংস্কার আনেন। মেরকেল স্মরণে রাখার জন্য কী করেছেন? না, তার নামের পাশে কোনো বড় সংস্কার নেই। কিন্তু মেরকেলের দ্বৈত ব্যক্তি জীবনের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক জীবনেরও দুটি দিক রয়েছে : এটি উভয় দিক থেকেই পড়া যায়।

অ্যাঙ্গেলা মেরকেল বার্লিন দেয়ালের পতনের পরপর ঝোঁকের বশেই রাজনীতিতে নামেন। ছিলেন একজন সাধারণ রসায়নবিদ। বাগ্মিতা, সম্মোহনী ক্ষমতা, রাজনৈতিক চাতুর্য বা এমনকি কোনো বিশেষ কর্মসূচিও তখন ছিল না তার। আর এ মানুষটিই ৩৫ বছর বয়সে ইতিহাসের এক ঘূর্ণিবায়ে নিজেকে খুঁজে পেলেন সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায়। কী করতে হবে তা বুঝতে ভুল হয়নি মেরকেলের। মেরকেল যখন ক্ষমতায় আসীন হন তখনো পাশ্চাত্যের দিগন্তজুড়ে নাইন-ইলেভেনের দীর্ঘ ছায়া। তখন থেকে ইউরোপীয় এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে টানা চলতে থাকে একের পর এক সংকট। উচ্চাভিলাষী সংস্কার অবশ্যই তার রক্তে নেই। সৌভাগ্যক্রমে তার বড় রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তাও তখন ছিল না। মেরকেল দেশবাসীকে দেখান তার মধ্যে স্বপ্নদ্রষ্টার চেয়ে ভালো ব্যবস্থাপক হওয়ার গুণই বেশি। তার পরও অবশ্য সামনে চলে আসা সব সংকট দক্ষ হাতে সামলেছেন, জার্মানির সমৃদ্ধি ফিরিয়ে এনেছেন যাতে সাহায্য করেছে শ্রোয়েডারের করে যাওয়া সংস্কার। দূরদৃষ্টির কারণে বিরোধী দলের নেতা থাকার সময়ও তাতে সমর্থন দিয়েছিলেন এ নেতা। মেরকেলের নেতৃত্বেই জার্মানি তার ভাবমূর্তির ইতিবাচক পরিবর্তনও ঘটিয়েছে। বিশ্বমঞ্চে শুষ্ক ও অনাকর্ষণীয় থেকে পছন্দনীয় হয়ে উঠেছে দেশটি। ষোলোটি বছর ধরে জার্মানিকে সুখী রেখেছেন মেরকেল। তার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার প্রথম রহস্য হলো, বরাবর দেশ ও সমকালের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম ছিলেন তিনি। সব সময় সঠিক সময়ে একেবারে সঠিক জায়গাটায় ছিলেন। মেরকেলের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সমালোচনাটি হচ্ছে, তিনি ইউরোপিয়ানের চেয়ে জার্মানই বেশি। সংক্ষেপে বললে, এক স্বার্থপর, ঘরমুখী নেতা। এ সমালোচনাটি বিশেষ করে করা হয় ফ্রান্স থেকে, যারা কি না বলতে চায় জার্মানির নীরস বাজেটবিষয়ক শৃঙ্খলার চেয়ে ভ্রাতৃত্ব আর সংহতিই তাদের বেশি পছন্দ।

কিন্তু দশ লাখেরও বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে ইউরোপের মুখ রাখা কি স্বার্থপরতা ছিল? যখন কি না বিশেষ করে ফ্রান্সসহ অন্য বিশ্বনেতারা না দেখার ভান করছিলেন? ইইউর সবচেয়ে ধনী দেশের নেতা হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে দ্রুত এগিয়ে নিতে যে দুঃসাহসী ঝুঁকির প্রয়োজন তা তার মধ্যে ছিল না। ইউরোপের ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট জোরালোভাবে মোকাবিলা না করায় ফরাসি প্রেসিডেন্টরা তার ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন। তার ধীরগতিতে গ্রিক জনগণ মরতে বসেছিল। পুরো ইউরোপকেই দিতে হয়েছিল চড়া মূল্য। জার্মানির অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের ওপর তিনি বেশি জোর দিয়েছিলেন। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জোর দিয়েছেন লাভক্ষতির হিসাবের ওপর। বহুদিন তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মেক্রোঁর ইউরোপব্যাপী ঋণ মিউচুয়ালাইজেশনের উচ্চাভিলাষের বিরোধিতা করেছেন। সত্যি বলতে জার্মানি কখনোই এটি পছন্দ করেনি। কিন্তু কভিডের বড় ধাক্কা কাটার পর ইউরোপের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় সমর্থন দিতে জার্মানিকে তৈরি করল কে? তিনি এই মেরকেলই। মেরকেলের ওপর লেখা বইটার জন্য প্রেসিডেন্ট মেক্রোঁর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, (যেমনটা এক জার্মান সরকারি কর্মকর্তা আমাকে বলেছিলেন) ইউরোপের উচ্চাভিলাষী বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য স্মরিত হওয়ার যে আকাক্সক্ষা তিনি (মেক্রোঁ) মনে পোষেন তা কখনো কখনো অধিকতর বাস্তববাদী চ্যান্সেলর মেরকেলের জন্য বিরক্তির কারণ হয়েছে কি না। মেক্রোঁ স্বীকার করেন, তারা দুজন ‘মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই জগতের’ মানুষ। তবে কোনো প্রস্তাব নিয়ে ভাবতে বেশি সময় নিলেও আর অনেক বাধাবিপত্তির মধ্যে পড়লেও শেষ পর্যন্ত একই উচ্চাভিলাষী বিষয়ের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন তিনিও। মেক্রোঁ বলেন, ‘আমার মনে হয় ইউরোপের জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে যা যা অর্জন করেছি তিনি ঠিক সেগুলোই চেয়েছিলেন।’

মেক্রোঁ অস্বস্তিকর সূচনা সত্ত্বেও ছিলেন মেরকেলের প্রিয় ফরাসি প্রেসিডেন্ট। কারণ তারা উভয়েই ছিলেন তাদের নিজস্ব ধরনের রাজনৈতিক ‘ইউএফও’, বাম, ডান কোনো দলেই নয়। মেক্রোঁনিজমের মতোই মেরকেলিজমও হচ্ছে পরস্পরবিরোধী বিষয়গুলোকে নিয়ে কসরত করার অনন্য দক্ষতা। কখনো কখনো মেরকেলের ভুলত্রুটি, ব্যর্থতা ও অনমনীয়তা ইউরোপের মারাত্মক ক্ষতি করেছে। তার বিদায় এক ক্রান্তিকাল। এটি জার্মানিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলল, বিশেষ করে জলবায়ু সংকটের বিষয়ে। ইতিহাসের একটি নতুন পৃষ্ঠা খোলারও সুযোগ পেল দেশটি। তাহলে আমি কেন তাকে মিস করব? কারণ আমি মনে করি, মেরকেলের ত্রুটি ও গুণাবলি উভয়ের পেছনেই তাগিদ ছিল তার নৈতিক কম্পাসের। নৈতিকতাই ১৯৯৯ সালে মেরকেলকে দিয়ে তার প্রাক্তন ‘সিডিইউ’ ওস্তাদ কোহলের ক্যারিয়ারের অবসান ঘটিয়েছিল। দলকে কেলেঙ্কারির দাগে কলঙ্কিত করেছিলেন কোহল। এই নৈতিকতার বোধই গ্রিসের কয়েক দশকের দুর্নীতি আর কর ফাঁকি বিষয়ে তাকে ইউরোপ সংকটের সময় অতি কঠোর করে তুলেছিল। এক ধাক্কায় দশ লাখ শরণার্থী নেওয়ার জন্য জনগণকে রাজি করাতে ‘আমরা এটা করব’ বলে যে কথাটি বলেছিলেন মেরকেল তার পেছনেও তাগিদ ছিল নৈতিকতারই।

‘যে দেশটি এখন আর নেই’ সেখানে প্রথম জীবনের অভিজ্ঞতা মেরকেলকে স্বাধীনতাসহ (শরণার্থীদেরও) কয়েকটি মূল্যবোধের গুরুত্ব বুঝতে শিখিয়েছিল, যা থেকে তখন তিনি ছিলেন বঞ্চিত। অন্য মূল্যবোধগুলো হচ্ছে ঐক্যের জন্য উদ্বেগ আর বিরোধীদের প্রতি নিঃশর্ত সম্মান তা জার্মানির পার্লামেন্ট, পূর্ব ইউরোপ বা চ্যানেলের অন্য পার যেখানেই হোক না কেন। অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের নিচু লয়ের স্টাইল আর সোজাসাপ্টা নীরস বক্তৃতা ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ব্রেক্সিটের স্থপতিদের প্রতিষ্ঠিত জনরঞ্জনবাদী (পপুলিস্ট) রাজনীতির বিপরীত মেরুর বস্তু। মেরকেল প্রায়ই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতেন, কিন্তু কখনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেননি। কারণ তিনি আসলে সে অর্থে কখনোই কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। তার কাছে শব্দের কাজ হচ্ছে নিরেট বাস্তবতাকে বর্ণনা করা। কূটনৈতিক কায়দাকসরত, কৌশলের ওপর নির্ভরশীলতা এবং এমনকি মাঝারিমান সত্ত্বেও বলতে হয় মেরকেল অন্তত ট্রাম্পবিরোধী, জনসনবিরোধী, জনরঞ্জনবিরোধী। একজন নেতা হিসেবে তার নৈতিকতার বিষয়টিই আমি মিস করব।

মেরকেলের অধীনে সিডিইউ দল ১৬ বছর ধরে জার্মানির রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। তার যুগ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলটি সাম্প্রতিক নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে বাজেভাবে। আগামী শাসক জোটটি যে রকমই হোক না কেন, জার্মানির গণতন্ত্র থাকবে ইস্পাতকঠিন। দেশটির নোঙরও শক্তভাবে বাঁধা থাকবে ইউরোপের বন্দরেই। তবে ইউরোপ তথা একটি অস্থির, উদ্বিগ্ন বিশ্বের জন্য অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের চলে যাওয়া হচ্ছে একটি আশ্বাস জাগানিয়া আলোকবর্তিকারই বিদায়।

দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

লেখক মারিওন ভ্যান ঘেঁতারগেমা বিশিষ্ট ফরাসি সাংবাদিক। ‘সেতে মেরকেল’ (ইনিই মেরকেল) বইয়ের লেখক এবং ও ‘রিশার্স মেরকেল দিজিজপেরোমো’ (মেরকেলের খোঁজে) চলচ্চিত্রের পরিচালক