খাঁন মাহমুদ আইউব : ১১ বছর পর কক্সবাজারের টেকনাফে চাঞ্চল্যকর আলী উল্লাহ আলো (৭) হত্যা মামলার রায় ঘোষনা করেছে আদালত। রায়ে ৬ জনকে মৃত্যুদন্ড ২ জনকে বেকসুর খালাস দিয়েছে আদালত।
বুধবার ১১ মে বিকেলে কক্সবাজার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল এই রায় প্রদান করেন।
ফাঁসির দন্ডাদেশ প্রাপ্ত আসামীরা হলেন- মোঃ সুমন আলী, ইয়াছিন উরুফে রায়হান, মোঃ ইয়াকুব, মোঃ ইসহাক উরুফে কালু, নজরুল ইসলাম ও রোহিঙ্গা ছৈয়দুল আমিন উরুফে লাম্বাইয়া। রায়ে মৃত্যু দন্ডাদেশ পাওয়া আসামীর প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদন্ডও দেওয়া হয়েছে। একই সাথে অপ্র দুই আসামী মুহিবুল্লাহ ও মোঃ দিদার মিয়ার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের বেকসুর খালাস প্রদান করেছেন।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরনীতে জানাযায়, ২০১১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬ টার দিকে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের গোদার বিল এলাকার বিএনপি নেতা মো. আবদুল্লাহ’র ৭ বছরের শিশু পুত্র আলী উল্লাহ আলো কে আবদুল্লাহ’র বাড়ির কর্মচারী সুমন আলী বাড়ির সামনের কাচারি ঘরে অপহরণ করে মুক্তিপন দাবী করার উদ্দেশ্যে ডেকে নিয়ে যায়। পরে পাখির বাসা দেখানোর কথা বলে তাকে কাচারী ঘরের সিলিং এর উপর তুলে হাত পা বেঁধে মুখে জোর করে কচটেপ লাগানোর সময় আলী উল্লাহ আলো চিৎকার করে। এসময় জীবিত থাকলে অপহরনের ঘটনা ফাঁস হয়ে যেতে পারে এমন আশংকায় আসামী সুমন আলী ও অপর আসামীরা মিলে শিশু আলী উল্লাহ আলো কে সিলিং এর উপর জবাই করে নির্মমভাবে হত্যা করে।
ঘটনার পরে আলী উল্লাহ আলো’র পিতা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বাদী হয়ে ২০১১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ৫ জনের নাম উল্লেখ করে ৪/৫ জনকে অজ্ঞাত আসামী করে টেকনাফ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। যার টেকনাফ থানা মামলা নম্বর : ১৩/২০১১, জিআর মামলা নম্বর ৩৭০/২০১১ (টেকনাফ) এবং এসটি মামলা নম্বর ২০৮২/২০১৮।
মামলার দ্বীর্ঘ তদন্ত শেষে টেকনাফ থানার ওসি (তদন্ত) স্বপন কুমার মজুমদার আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন। ওই চার্জশীটের বিরুদ্ধে মামলার বাদী মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ২০১২ সালের ৩০ ডিসেম্বর আদালতে নারাজী আবেদন করলে বিজ্ঞ আদালত আবেদন আমলে নিয়ে ২০১৪ সালের ৪ মার্চ মামলাটি সিআইডি-কে অধিকতর তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট এজাহারভুক্ত ৫ জনসহ মোট ৮ জন আাসামীর নাম উল্লেখ করে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আদালতে সম্পূরক চার্জশীট দাখিল করেন সিআইডি।
সম্পূরক চার্জশীটে এজাহারভুক্ত ৫ আসামী নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর থানার কোদ্দ নারায়নপুরের মৃত আফতাব আলীর ছেলে মোঃ সুমন আলী (২৬), ঠাকুরগাঁও জেলার নিশ্চিন্তপুরের মৃত শামছুল হকের ছেলে ইয়াছিন প্রকাশ রায়হান (২৯), কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামের শ্রীপুরের মৃত আসলাম মিয়ার ছেলে মোঃ ইয়াকুব (৩৪), টেকনাফ সদর ইউনিয়নের গোদার বিল এলাকার আলী হোসেনের ছেলে মোঃ ইসহাক প্রকাশ কালু (৩১), টেকনাফের মহেশখালীয়া পাড়ার মৃত নবী হোসেনের ছেলে নজরুল ইসলাম (২৮)।
এছাড়া সিআইডির তদন্তে প্রাপ্ত টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের মাঝের পাড়ার মৃত মৌলভী আবদুল জলিলের ছেলে মহিবুল্লাহ (৪৫), টেকনাফ সদরের লেঙ্গুর বিলের জাফর আহমেদের ছেলে মোঃ দিদার মিয়ার (৩৫) মিয়ানমারের মংডু থানার ধনচি পাড়ার মৃত আবদুর রহিমের ছেলে রোহিঙ্গা ছৈয়দুল আমিন প্রকাশ লম্বাইয়া (৪৭) এর বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে অপহরণ ও হত্যা পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়।
এদিকে মামলার ৩ আসামী মোঃ সুমন আলী, ইয়াছিন উরুফে রায়হান ও মোঃ ইয়াকুব ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তি মুলক জবানবন্দী প্রদান করেন।
মামলায় ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ২০২০ সালের ২৪ জুলাই কক্সবাজার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালত মামলাটি চার্জ গঠন করে বিচারকার্য শুরু করেন।
আসামীদের মধ্যে মোঃ সুমন আলী, নজরুল ইসলাম, সৈয়দুল আমিন ও মহিবুল্লাহ আদালত থেকে জামিন নিয়ে পলাতক রয়েছে। অন্য ৪ জন আসামী যথাক্রমে ইয়াছিন প্রকাশ রায়হান, মোঃ ইয়াকুব, মোঃ ইসহাক প্রকাশ কালু ও মোঃ দিদার মিয়া রায় ঘোষণার সময় আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্র পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন পিপি এডভোকেট ফরিদুল আলম (পিপি) এবং বাদী পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন এড.আমির হোসেন, এড. দীলিপ দাশ, এড. আমিন উদ্দিন, এড. মোহাম্মদ নছর উল্লাহ প্রমুখ।
আসামী পক্ষের অনজীবী ছিলেন এড. শাহজালাল চৌধুরী, এড. নুরুল মোস্তফা মানিক, এড. সিরাজুল ইসলাম-৪ (স্টেট ডিফেন্স), এড. সেলিম উদ্দিন রাজু।
মামলার রায়ের প্রতিক্রিয়ার বাদী মো. আব্দুল্লাহ অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং উচ্চ আদালতে রায় পূনঃবিবেচনার জন্য আবেদন করবেন বলে জানান।
