রহমত উল্লাহ : আজ টেকনাফে ছাত্রলীগ নেতা হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হয়েছে । দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজ এখনো শুরু হয়নি। বরং জামিনে আসা এবং কারাগারে থাকা আসামীরা এই মামলার বাদীকে বিভিন্ন প্রকার হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছে।
২০২১ সালের পহেলা জানুয়ারিতে টেকনাফ সাবরাং ইউনিয়নের কচুবনিয়ায় নিজ এলাকায় ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ফজরের নামাজ আদায় করতে মসজিদে যাওয়ার সময় বাড়ির সামনে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।তিনি উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের কচুবনিয়া এলাকার মোহাম্মদ আলীর ছেলে এবং উপজেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন।
ঘটনার এক বছর পরও খুনিদের বিচারের আওতায় আনতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।তবে এখনো প্রকৃত আসামি গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তবে দুই নম্বর আসামি মোঃ সাকের কারাগারে রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মিল্টন মন্ডল।এজাহার ভুক্ত আসামিদের মধ্যে তিন জন জামিনে রয়েছেন তারা হলেন ৯ নং আসামি ছিদ্দিক আহমদ ৮ নং আসামি মৌলভী গফুর ৬ নং আসামি মোঃ কাসেম।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা টেকনাফ মডেল থানার এসআই মিল্টন মন্ডল বলেন, ‘মামলাটি আমি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে চার্জশিট দাখিল করেছি আদালতে ।এক মাস আগে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে বলে ও জানান তিনি। তবে আসামিদের ধরতে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি আমি।এদিকে এক বছরেও হত্যার বিচার না পেয়ে হতাশ নিহত ছাত্রলীগ নেতা পরিবার। বিচারের আশা অনেকটাই ছেড়ে দিয়েছে তারা। তবে হত্যাকারীরা তাদেরকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে বলে ওই ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তারা।
নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, মামলার আসামিরা দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিচ্ছে।ফলে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে নিহতদের পরিবার এবং ওই হত্যা মামলার সাক্ষীরা।মামলার এক সাক্ষী বলেন, ‘মামলার সাক্ষী হওয়াতে আমাদের ওপর অব্যাহত হুমকি দিচ্ছে খুনিরা।আমরা স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারছি না।’ হত্যাকারীদের শাস্তি হলে আমার ভাইয়ের আত্মা শান্তি পাবে। নাইলে আমার ভাইয়ের আত্মা শান্তি পাবে না।
নিহত ওসমান সিকদারের বড় বোন আছিয়া খাতুন বলেন, ‘ভাইয়ের খুনের বিচার আজও পেলাম না। ভাইটি ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। ওকে পড়ালেখা করাতে গিয়ে আমাদের জমিজমা বিক্রি করেছিলাম। ভেবেছিলাম ও চাকরি করে আমাদের মুখে হাসি ফোটাবে। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ গিয়ে আমার ভাইটিকে খুন করল। তার কোনো বিচারও পেলাম না আমরা আর রাজনৈতিক ভাবে কোন সাহায্য সহযোগিতা পাচ্ছি না।
ওসমানের একমাত্র ছোট বোন সয়দা খাতুন বলেন, ‘আমার ভাইকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। খুনিরাও চিহ্নিত, অথচ তাদের কোনো বিচার হলো না। আবার খুনিরা ওই এলাকায় মানুষের মাধ্যমে আমাদেরকে মেরে ফেলার হুমকির বার্তা পাঠান। এর চেয়ে কষ্ট আর কী থাকতে পারে। তবে আমরা আদালতের কাছে আশাবাদী আমার ভাইয়ের বিচার পাব।তিনি আরও বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই আপনার ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন আমার ভাই। তার বিচার কেন আপনি করছেন না। আমরা কী অপরাধ করছি যে।’আমরা বিচার পাব না! আমরা সুষ্ঠু বিচার চাই।
নিহত ওসমানের স্ত্রী এক সন্তানের জনক সাহিদা আক্তার বলেন, ‘ আমার স্বামীকে অকালে হারিয়ে আমি বিধবা হয়ে গেলাম। আমার ছোট্ট শিশুটি এতিম হয়ে গেছে। আমার স্বামীকে যারা হত্যা করেছে তাদের বিচার না হওয়ার পর্যন্ত আমি বিচার চেয়ে যাব। আর খুনিরা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাদের ভয় দেখায় সবসময়। দুই নম্বর আসামি মোঃ সাকের কার কারাগারে রয়েছেন।এই দুই নম্বর আসামি জেল থেকে বাহির হলে আমাদেরকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। আমি আমার নিরাপত্তা চাই। দুই নম্বর আসামি মোঃ সাকের আমার স্বামীকে গুলি করেছে আমি তার ফাঁসি চাই।
ছাত্রলীগ নেতা ওসমান সিকদার হত্যা এক বছর পূর্ণ এই বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সোলতান মাহমুদ বলেন, আমাদের রাজনৈতিক সহকর্মী ওসমান সিকদার স্কুল জীবন থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত। ওসমান আওয়ামীলীগের দুঃসময়ে রাজপথে নেমে পড়েছিল। তাকে হারিয়ে টেকনাফ ছাত্রলীগ পরিবার শুন্যতা অনুভব করছে। আমরা তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।আমাদের দাবি হলো , দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা। যদি প্রকৃত আসামিদের আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তি প্রদান করা হয় নিহত ওসমানের আত্মা অন্তত শান্তি পাবে।ন্যায়বিচার পেলে আমাদের হতাশা, আমাদের গ্লানির শেষ হবে।
বর্তমান সরকারের আমলে অনেক হত্যার বিচার হয়েছে, কিন্তু গভীর দুঃখের সঙ্গে বলতে চাই আমাদের ওসমান পদধারী ছাত্রলীগ নেতা হওয়ার পরও এক বছরে তার হত্যার বিচার পাই নাই এই নিয়ে আমরা মর্মাহত। সবার দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো কোনো সহযোগিতা পাইনি। এমতাবস্থায় আমি শুধু প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চাচ্ছি।
উল্লেখ্য,২০২০ সালের রোববার (২৭ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় একটি ইজিবাইক চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ করেন উসমান শিকদার।
এ সময় উপজেলার সাবরাং নয়াপাড়া বাজারে সাবরাং ইউপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ওরফে খুলু মেম্বারের ছেলে মোহাম্মদ শাকের ও কাটাবনিয়ার মোহাম্মদ কাসিমের ছেলেকে কেফায়েত উল্লাহ প্রকাশ্যে উসমান সিকদারের উপর হামলা চালিয়ে তাকে মারধর করে।এ ঘটনায় উসমন থানায় একটি অভিযোগ ও দায়ের করেছিলেন।”
“ওই ঘটনার জেরে ২০২১ সালে পহেলা জানুয়ারির ভোরে ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার সময় উসমানের গতিরোধ করে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়।”
খুনের ঘটনায় পরিবারের করা একটি মামলায় ৯ জনকে আসামি করা হয়। নিহত ওসমান সিকদারের স্ত্রী সাহিদা আক্তার বাদী হয়ে ৯ জনকে আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলার এক নম্বর আসামি কেফায়েত উল্লাহ দুই নম্বর আসামি মোঃ সাকের কারাগারে রয়েছেন।
