বনানী থানায় চাঞ্চল্যকর কেলেংকারি ঘুষ আদায়ে ৪ পুলিশের কাণ্ড

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৯ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক :
ঘুষ। যার লেনদেন হয় গোপনে। কারণ আইন অনুযায়ী ঘুষ দেয়া-নেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, খোদ রাজধানীর বনানী থানায় মোটা অংকের ঘুষের লেনদেন হয়েছে অনেকটা ওপেন সিক্রেট স্টাইলে। এক লাখ টাকা ঘুষের জন্য পুলিশের চারজন পদস্থ কর্মকর্তা কী কাণ্ডটাই না ঘটালেন। তাও আবার মুঠোফোনে।

টাকার বিনিময়ে সন্দেহভাজন আসামি ছেড়ে দিতে দরকষাকষি করে শেষ পর্যন্ত ৩ লাখ টাকার ঘুষ ১ লাখে নামিয়ে আনা হয়। ঘুষের টাকা চাইলেন অবলীলায়। আর যে ফোনে আড়ি পেতে তারা অনেক অপরাধী ধরেন, সেই ফোনেই এবার তারা ধরা খেয়েছেন।

ঘুষ বাণিজ্যের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে তিন পুলিশের মোবাইল ফোনালাপের রেকর্ড পায় পুলিশেরই কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স টিম। ভয়েস রেকর্ডের সূত্র ধরে চিহ্নিত হন বনানী থানার তিন পুলিশ কর্মকর্তা- ওসি ফরমান আলী, পরিদর্শক (তদন্ত) ওয়াহেদুজ্জামান ও বনানী ফাঁড়ির ইনচার্জ ইয়াসিন গাজী। এ ছাড়া এ ঘটনায় শুরু থেকেই জড়িত থানার এসআই সাইফুল ইসলাম।

পুলিশের ঘুষ বাণিজ্যের এই ভয়েস রেকর্ডের একটি কপি বৃহস্পতিবার যুগান্তরের হাতেও এসেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মঙ্গলবার রাতে বনানী থানার ওসি ফরমান আলী, পরিদর্শক (তদন্ত) ওয়াহেদুজ্জামান এবং বনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই ইয়াসিন গাজী মুঠোফোনে যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ আদৌ সত্য নয়। আনোয়ার নামে কাউকে ধরে এনে ঘুষ বাণিজ্যের প্রশ্নই ওঠে না। তারা আইনের বাইরে কিছুই করেন না।

সূত্র জানায়, আনোয়ার নামের এক ব্যক্তিকে আটকের পর ঘুষ বাণিজ্যের ফাঁদ পাতে বনানী থানা পুলিশ। সোর্সের মাধ্যমে খবর পেয়ে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স টিম সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ফোনে আড়ি পাতে। এ সংক্রান্ত ভয়েস রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কোনো অভিযোগ ছাড়াই ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় বনানী ঢাকা গেটের সামনে থেকে আনোয়ার নামে এক ব্যক্তিকে তার প্রাইভেট কারসহ আটক করে বনানী থানার এসআই সাইফুল ইসলাম। নিয়মানুযায়ী তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে থানায় জিডি অ্যান্ট্রি অথবা মামলা দায়ের করতে হবে। কিন্তু থানায় আনার পর এসব কিছু না করে তার কাছে মোটা অংকের টাকা দাবি করা হয়।

বলা হয়- টাকা না দিলে ইয়াবা মামলায় চালান দিয়ে দেয়া হবে। এরপর ঘুষ দিতে রাজি হলে আনোয়ারের এক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে থানা পুলিশ। আর মোটা অংকের দান মারতে এসআই সাইফুল ছাড়াও একে একে এ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হন ওসি ফরমান আলী, পরিদর্শক ওয়াহেদুজ্জামান ও বনানী ফাঁড়ির ইনচার্জ ইয়াসিন গাজী।

পুলিশ কর্মকর্তাদের ভয়েস রেকর্ডে স্পষ্ট শোনা যায়, আনোয়ার নামের ওই ব্যক্তিকে আটকের পর ঘুষ বাণিজ্যের পটভূমি তৈরির প্রস্তুতি নেয় পুলিশ। ঘুষের রেট বাড়াতে ওয়াহেদুজ্জামান নিজেই ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘুষের অংক চূড়ান্ত করেন। ৩ লাখ টাকা থেকে দরকষাকষি করে শেষমেশ নির্ধারণ হয় এক লাখ টাকা দিলে তিনি আনোয়ারকে ছেড়ে দেবেন। কিন্তু ঘুষের টাকা হস্তান্তরের আগেই ঘটনাটি জেনে যায় থানার ওসি ফরমান আলী ও বনানী ফাঁড়ির ইনচার্জ ইয়াসিন গাজী। পরে তারাও আটককৃত আনোয়ারের কাছ থেকে মোটা অংকের ঘুষ আদায়ে মাঠে নেমে পড়েন।

এদিকে পরিকল্পনা অনুযায়ী পুলিশ ফাঁড়ির এসআই ইয়াসিন গাজী অনেকটা দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন। একদিকে তিনি আনোয়ারকে রক্ষার কথা বলে তার স্বজনদের সঙ্গে সহানুভূতি প্রকাশ করে কথা বলেন। অন্যদিকে পরিদর্শক ওয়াহেদুজ্জামানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আনোয়ারকে ছাড়াতে ঘুষের ভাগ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যান।

একপর্যায়ে থানার ওসি ফরমান আলী বিষয়টি জেনে যান। তিনি বুঝতে পারেন, তাকে ঘুষের ভাগ না দিয়ে এভাবে আটককৃত আসামি ছেড়ে দেয়ার পাঁয়তারা চলছে। এরপর ঘুষের পুরোটাই নিজের পকেটে পুরতে তিনি আসামি ছাড়া না-ছাড়ার বিষয়টি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।

ভয়েস রেকর্ডের সূত্র ধরে ঘুষদাতা আনোয়ারের জনৈক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সন্ধান পায় যুগান্তর। নিরাপত্তার কারণে তিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি জানান, বনানী থানার ওসি ফরমান আলী তাকে বলেন, নগদ এক লাখ টাকা দিলে তিনি আনোয়ারকে ছেড়ে দেয়ার ব্যবস্থা করবেন। এতে আনোয়ারের স্বজনরা কিছুটা আশ্বস্ত হন। এরপর আমার মাধ্যমে তারা ওসিকে এক লাখ টাকা দিতে রাজি হন। সে অনুযায়ী ঘুষের এক লাখ টাকা নিয়ে পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় গুলশান ক্লাবের আশপাশে আসতে বলেন ওসি। নির্ধারিত সময়ে তিনি সেখানে গেলে সরকারি গাড়ি নিয়ে ওসিও হাজির হন এবং তার কাছ থেকে ঘুষের পুরো এক লাখ টাকা বুঝে নেন।

জানা যায়, পরদিন যথারীতি আনোয়ারকে ছেড়ে দেয়া হয়। তবে থানা থেকে নয়, আদালতের মাধ্যমে। যেহেতু পরিদর্শকসহ আরও কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বিষয়টি জানেন তাই আনোয়ারকে থানা থেকে সরাসরি ছেড়ে দিতে চাননি ওসি ফরমান আলী। এ জন্য তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা না দিয়ে শুধু ডিএমপি অধ্যাদেশে (পুলিশের ভাষায় পাঁচ আনি মামলা) চালান দেয়া হয়। ফলে খুব সহজে পরদিন তিনি আদালত থেকে মুক্তি পেয়ে যান।

ভয়েস রেকর্ডে ঘুষ লেনদেনের কথোপকথন : ঘুষের টাকার জন্য বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ওয়াহেদুজ্জামানের যেন তর সইছিল না। যে কারণে সরাসরি কথা বলা ছাড়াও একপর্যায়ে তিনি টাকার জন্য আটক হওয়া আনোয়ারের জনৈক বন্ধুর সঙ্গে মোবাইল ফোনে বারবার তাগাদা দিতে থাকেন। তাদের ফোনালাপের অংশবিশেষ নিচে তুলে ধরা হল-

ওয়াহেদুজ্জামান : কী ব্যাপার, আর কতক্ষণ বসে থাকব?

আনোয়ারের বন্ধু : আসতাছি স্যার। আসতাছি।

ওয়াহেদুজ্জামান : কিন্তু উল্টা-পাল্টা কী শুনতাছি। ওসি স্যারকে নাকি কে টাকা-পয়সা দিতে চাইছে।

আনোয়ারের বন্ধু : না, না। কে বলল এসব কথা।

ওয়াহেদুজ্জামান : তাহলে কখন আসবেন? এখন কি আমি থাকব, না চলে যাব?

আনোয়ারের বন্ধু : আমার লোক যাচ্ছে স্যার। এই ধরেন দশ-পনেরো মিনিট লাগব।

ওয়াহেদুজ্জামান : ওকে, ঠিক আছে। আসেন, থানায় বসে আমরা কথা বলব। কেমন?

আনোয়ারের বন্ধু : ঠিক আছে স্যার।

এদিকে এসআই ইয়াসিন গাজীও আনোয়ারের বন্ধুকে দফায় দফায় ফোন করে দ্রুত টাকা নিয়ে থানায় যেতে বলেন। ইয়াসিন গাজীর ফোনালাপ এখানে হুবহু দেয়া হল-

ইয়াসিন গাজী : থানা থেকে গাজী ভাই বলতাছি। কই আপনার লোক তো আইলো না।

আনোয়ারের বন্ধু : আইবো স্যার। আইবো।

ইয়াসিন গাজী : সেলিমকে ফোন দিলাম, কই সে তো কিছুই জানে না কইলো।

আনোয়ারের বন্ধু : কইসি, কইসি। এই মাত্র কইসি স্যার। যাইবো।

ইয়াসিন গাজী : দেরি হয়া যাইতাছে। তদন্ত স্যার (পরিদর্শক ওয়াহেদুজ্জামান) এখনই উঠে যাবে। মামলার এজাহারটা স্যারের কাছেই আছে।

আনোয়ারের বন্ধু : পাঠাইতাছি স্যার। তদন্ত স্যারের কাছেই পাঠাইতাছি এক লাখ টাকা নিয়া।

ইয়াসিন গাজী : পাঠান তাড়াতাড়ি। স্যার উঠে গেলে কিন্তু আমও যাবে ছালাও যাবে। শোনেন, তদন্ত স্যার আপনাকে কিছু বলছে, বোধহয় না (মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি)। আমার কথা শোনেন, মামলা-টামলা কিছুই না। আমি কাজ করে ফেলেছি। ডিসি স্যারকে (গুলশান জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার মোশতাক আহমেদ) সব বলেছি। স্যারকে আমি ম্যানেজও করেছি। কিন্তু এটা আপনি-আমি ছাড়া আর কাউকে বইলেন না। এমনকি ওসি স্যারকেও বইলেন না। ডিসি স্যারকে ম্যানেজ করেছি। ওরে পাঁচ আনি (ডিএমপি অধ্যাদেশ) করে দিবে। অসুবিধা নাই।

আনোয়ারের বন্ধু : স্যার আমি আপনার ওপর বিচারের ভার দিছি। আপনি যা বলবেন তাই করব। আপনি যদি বলেন, ওমুক খানে বিশ হাজার, পঞ্চাশ হাজার ট্যাকা লাগবে আমি দিমু। আমি আপনার কথা কোনোদিন হালামু (ফেলব) না।

ইয়াসিন গাজী : হ্যাঁ, বুঝছি। কিন্তু তদন্ত স্যার আমাকে ফোন দিয়েছিল। বলল এক লাখের কথা নাকি কইছে। স্যার যখন এক বলছে, তখন এক লাখ ম্যানেজ করে কাউকে দিয়ে পাঠায়ে দেন। আনোয়ারের কান্না দেখে আমার নিজেরও খারাপ লাগছে। শুধু আপনার কারণে আমি ডিসি স্যারকে বলেছি। তা না হলে বলতাম না। আমি স্যারকে বলেছি, স্যার এবারের মতো মাফ করে দেন। পরে মামলা লাগলে আমি দিব, স্যার। ওকে ছেড়ে দেন। ডিসি স্যার রাজি হইছে। এখন আপনি ওইটা (ঘুষ) তাড়াতাড়ি পাঠায়া দেন।

আনোয়ারের বন্ধু : তাইলে স্যার ওইটাই কি পাঠাইয়া দিব? এক লাখ পুরোটাই?

ইয়াসিন গাজী : হ্যাঁ পুরোটাই পাঠান। না হলে পরে ভেজাল করবে।

কিন্তু টাকা পৌঁছাতে কিছুটা দেরি দেখে উত্তেজিত হন এসআই ইয়াসিন গাজী। রূঢ স্বরে তিনি আনোয়ারের বন্ধুকে বলেন- কই, এখনও ওইটা পাঠাইলেন না। ওসি স্যার বইসা রইছে। আনোয়ারের বন্ধু কাঁচুমাচু হয়ে বলেন, যাইতাছে স্যার। যাইতাছে।

মোবাইল ফোনের ভয়েস রেকর্ড শুনে স্পষ্ট বোঝা যায়, থানার কয়েকজন কর্মকর্তা তাদের ঘুষ বাণিজ্য হালাল করতে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙাতে মোটেও দ্বিধা করেননি। ঘুষের রেট বাড়াতে মোবাইল ফোনালাপে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বারবার গুলশান বিভাগের ডিসি (উপ-কমিশনার) মোশতাক আহমেদের নামও ব্যবহার করেন। যদিও ঘুষ লেনদেনের গোটা প্রক্রিয়ায় ডিসি মোশতাক আহমেদের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ মেলেনি।