টেকনাফ টুডে ডেস্ক : চালে আবারও আমদানিনির্ভর হচ্ছে সরকার। আমন মৌসুমে ৩৬ টাকা কেজি দরে মিলারদের থেকে সরকার চাল কেনার প্রস্তাব দেয়। এই দামে চাল দিলে লোকসান হবে এমন অজুহাতে কোনো মিল মালিক সরকারকে চাল দেননি। এমনকি বোরো মৌসুমে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পরও অধিকাংশ চালকল সরকারকে চাল দেয়নি। এতে খাদ্য অধিদপ্তরের গুদাম ফাঁকা হতে শুরু করেছে। বাজারে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মোটা-চিকন সব ধরনের চালের দাম। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যে সরকার দেড় লাখ টন চাল আমদানি করেছে। আরও ৪ লাখ টন চাল আমদানির দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে পুরো প্রক্রিয়াই হচ্ছে সরকারি পর্যায়ে। তাই বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়ছে না। এমতাবস্থায় নতুন বছরে চালের বাজার আরও অস্থিতিশীল হতে পারে এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হতে না হতেই বিশ্ববাজারে চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে। একইভাবে দেশেও তিন মাস ধরে চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। করোনার স্থায়িত্ব আরও দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেবে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ভারতে রপ্তানিযোগ্য চালের দাম টনে সর্বোচ্চ ২ ডলার বেড়েছে।
এদিকে রপ্তানিযোগ্য চালের মূল্যবৃদ্ধিতে গত সপ্তাহে ভিয়েতনামের বাজারে দাম বেড়ে নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। থাইল্যান্ডে রপ্তানিযোগ্য চাল প্রায় চার মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
বিশ^ খাদ্য সংস্থা এবং বিশ^ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও ইঙ্গিত করা হয়েছে, চালের রপ্তানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে বাংলাদেশে আগামী বছরের শুরু থেকেই বাজার অস্থিতিশীল হবে যদি পর্যাপ্ত মজুদ না থাকে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোতে আঘাত করতে পারে এবং বিশ্ব ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেবে। আর এতে করে বিশ^ব্যাপী সাপ্লাই চেন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুদ না থাকলে সংকট দেখা দেবে। এ জন্য দেশে বর্তমানে উচ্চমূল্যে বিক্রি হওয়া চালের দাম আরও বেড়ে যাবে, এতে নিম্নবিত্ত, দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা সংকট দেখা দেবে।

বাজার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, চালের রপ্তানি বাজার আরও অস্থির হওয়ার আগেই দেশের কৃষক, মিলার বা আমদানি ত্বরান্বিত করে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখতে হবে। তারা বলেছেন, সরকার চাল আমদানির যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সঠিক ও সময়োপযোগী হয়েছে। তবে এখন সরকারকে আরও দু-একটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন সাড়ে পাঁচ লাখ টন কম হয়েছে বলে ইউএসডিএর পূর্বাভাস, করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের শঙ্কা, চলতি বছরে কমপক্ষে ২০ লাখ নতুন মুখের খাদ্যে ভাগ বসানো ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চাল আমদানির পরিমাণ ছয়-সাত লাখ টনে উন্নীত করার পরামর্শ দেন বাজার বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, যদি সরকারের পক্ষে একা এ পরিমাণ চাল আমদানিতে সমস্যা হয়, তাহলে বেসরকারি খাতেও আমদানির সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। সেটি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে চালসংকট সমাধানে বেসরকারি খাতকে আমদানিতে উৎসাহিত করতে চালের আমদানি শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে চালের বাজার নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসছেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। আজ রবিবার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখবেন মন্ত্রী।
গতকাল শনিবার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা (সিনিয়র তথ্য অফিসার) সুমন মেহেদী বলেন, ‘চালের বাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে সরকারি পদক্ষেপগুলো নিয়ে মন্ত্রী (খাদ্যমন্ত্রী) সংবাদ সম্মেলন করবেন।’ সরকারি হিসাবে, চলতি আমন মৌসুমে সরকার সাড়ে ৮ লাখ টন আমন ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। এর মধ্যে রয়েছে দুই লাখ টন ধান, ছয় লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং ৫০ হাজার মেট্রিক টন আতপ চাল। গত ৭ নভেম্বর থেকে এই কার্যক্রম শুরু হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ২৩ ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সরকার ১৩ হাজার ৫৬৭ টন আমন সেদ্ধ চাল, ৪৪৮ টন আতপ চাল এবং ৩০৬ টন আমন ধান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। সব মিলিয়ে চালের আকারে ১৪ হাজার ২২৯ টন। মৌসুম শেষে এর পরিমাণ লাখ টন ছাড়াবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এর আগে গত বোরো মৌসুমে সরকার ৮ লাখ টন ধান কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু কিনতে পেরেছে মাত্র ২ দশমিক ২ লাখ টন।
বোরো ও আমন মৌসুমে সরকার ধান-চাল কিনতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারের গুদামের মজুদে ভাটা পড়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের ২৩ ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের খাদ্যগুদামে চালের মজুদ আছে ৫ লাখ ৪২ হাজার টন। অথচ জুলাইয়ে সরকারের খাদ্য মজুদের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ১৪ হাজার টন। আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৩৩ হাজার টনে। সেপ্টেম্বরে ১৩ লাখ ৯২ হাজার টন, অক্টোবরে ১০ লাখ ৮১ হাজার টন এবং নভেম্বরে সরকারের গুদামে মজুদ ছিল ৮ লাখ ৮০ হাজার টন। মজুদকৃত খাদ্যশস্যের অধিকাংশই চাল।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) জানিয়েছে, চলতি বছর আউশ, আমন ও বোরো মিলিয়ে ৩ কোটি ৭০ লাখ ৪২ হাজার টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। আগামী জুন পর্যন্ত মাথাপিছু দৈনিক ৪০৫ গ্রাম চাল ধরে ১৬ কোটি ৭০ লাখ জনসংখ্যার চাহিদা পূরণ করার পরও ৩০ লাখ টন চাল বেশি থাকবে। ধান উৎপাদনের শতকরা ২৬ ভাগ নন-হিউম্যান কনসাম্পশনের বার্ষিক চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। বাজারেও সব ধরনের চালের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কিন্তু এরপরও বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত এক মাসে মানভেদে কেজিপ্রতি চালের দাম বেড়েছে ৪-৮ টাকা। মোটা চালের কেজিও এখন ৫২-৫৫ টাকা। মিলারদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে বাজারে ধানের দাম অনেক বেশি হওয়ায় তাদের অতিরিক্ত দামে চাল বিক্রি করতে হচ্ছে।
সরকারকে চাল না দেওয়ার বিষয়ে রশিদ অটোর মহাব্যবস্থাপক আবুল খায়ের ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারে মোটা ধানের মণ ১২০০-১৩০০ টাকা। সরকার চাইছে ৩৬ টাকা কেজি দরে চাল কিনতে। আমরা তাদের কীভাবে চাল দেব? শুনেছি সরকার আমদানিনির্ভর হচ্ছে। এতে বাজার নিয়ন্ত্রণ হয় তো ভালো। আমরাও তো চাল কিনে খাই।’
এ বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারে সংকট সৃষ্টি হওয়ার মূল কারণ ধানের দাম বেশি। এখন কৃষক কিন্তু ভালো দাম পাচ্ছেন। আমরাও এটাই চাইছি। কোনো মিল মালিক আমাদের চাল দেননি। তাই আমরা চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ইতিমধ্যে কিছু চাল এসেছে। আগামী মাসে আরও আসবে। রাতারাতি তো আর অবস্থার পরিবর্তন হবে না। একটু তো সময় লাগবেই।’
সরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি করলে খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়বে কীভাবে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন আমরা সরকারি পর্যায়ে যে চাল আনাচ্ছি, সেগুলো খোলাবাজারে বিক্রি করা হবে। সবগুলো মহানগরীতেই এই চাল বিক্রি হবে। এতে যেটা হবে, মোটা চাল খায় এমন বড় একটা অংশ খোলাবাজারে যাবে। তখন খুচরা বাজারে স্বাভাবিকভাবেই চাপ কমে যাবে। এরপরও যদি দেখি বাজারে দাম কমছে না, তখন বেসরকারিভাবেই চাল আমদানি করা হবে। তবে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যাতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত না হন। এটা মাথায় রেখেই কিন্তু এখনো দেশব্যাপী ওএমএস কার্যক্রম শুরু করিনি।’
২০১৭-১৮ অর্থবছরের পর এবারই সরকার সবচেয়ে বেশি চাল আমদানি করছে। এমনকি গত বছর সরকারি পর্যায়ে কোনো চাল আমদানি হয়নি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে চালের সংকট দেখা দেয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মোটা চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার চাল আমদানিতে শুল্ক উঠিয়ে দেয়। ওই অর্থবছরে ৩৮ লাখ ৯২ হাজার ৯৯০ টন চাল আমদানি হয়। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৯৯০ টন এবং বেসরকারি পর্যায়ে ৩০ লাখ ৭ হাজার টন চাল আমদানি হয়। যদিও ওই অর্থবছরে এর চেয়ে কম স্বল্পতা ছিল। পরের অর্থবছরে ২ লাখ ৫ হাজার ৭৯০ টন চাল আমদানি হয়। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে ৭০ হাজার টন এবং বেসরকারি পর্যায়ে ১ লাখ ৩ হাজার ৫৫৪ টন চাল আমদানি হয়। ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কোনো সমীক্ষা ছাড়াই চাল আমদানি হওয়ায় বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ দেখা দেয়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বাড়ায় চালের বাজারে ধস নামে। কৃষকরা দাম না পেয়ে ধানক্ষেতে আগুন দেন। এমতাবস্থায় সরকারিভাবে মজুদ বৃদ্ধি ও চাল আমদানিতে আবারও শুল্ক আরোপ করা হয়। এরপর বাজার কিছুটা স্বাভাবিক হতে থাকে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বেসরকারিভাবে ৪ হাজার ১৮০ টন চাল আমদানি হয়েছিল। তবে সেটা সুগন্ধি জাতের চাল ছিল। কিন্তু এবার মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় সরকার নিজেই বিপাকে আছে। তাই আমদানির পথে হাঁটতে হচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিত্যপণ্যের দাম করোনার মধ্যে ভোক্তার জন্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। এর মধ্যে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব জরুরি। সরকারের উচিত সরকারি গুদামে মজুদ বাড়িয়ে ও বাজার তদারকি করে চালের দাম কমিয়ে আনা। এতে ভোক্তার স্বস্তি ফিরবে। আগামী বছরে বিশ্বজোড়া দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা রয়েছে। বিশ^ খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বিসলে সম্প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, আগামী বছর (২০২১) চলতি বছরের চেয়ে খারাপ হবে। ২০২১ সালে হানা দেবে বিশ্বজোড়া দুর্ভিক্ষ।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশে^ অতিগরিব মানুষের সংখ্যা বেশি এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ২ কোটি ২৯ লাখ অতিগরিব মানুষ আছে।
