আ,ন,ম তৌহিদুল মাশেক তৌহিদ : ডেল কার্নেগির একটি উক্তি দিয়ে আমার লেখাটা শুরু করছি। তিনি বলেছেন, “ অনুকরণ নয়, অনুসরণ নয়, নিজেকে খুঁজুন, নিজেকে জানুন, নিজের পথে চলুন।” লিখতে চাই সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা ও আমাদের অবস্থা নিয়ে। আমার ছোট্ট জ্ঞানে সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা বলতে যা বুঝি তা হল ,যে শিক্ষা ব্যবস্থায় ছাত্র-ছাত্রীরা প্রথাগত গাইডবই বা অন্যের তৈরী করা নোট মুখস্ত করে শুধুমাত্র পরীক্ষা পাশের আশায় পড়াশোনা গলধকরণ করবে না বরং তারা সেখানে জ্ঞান সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে উঠবে তা-ই সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে শুধু পাঠদান পদ্ধতি সৃজনশীল হলে হবেনা বরং সম্মানিত শিক্ষক মন্ডলী, প্রতিষ্ঠান সমূহের পরিচালনা কমিটির সম্মানিত সদস্যবৃন্দ সহ এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সৃজনশীল হতে হবে। এক্ষেত্রে সবচাইতে যেটা আমি জরুরী বলে মনে করি তা হল ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষকবৃন্দের সৃজনশীল চিন্তা চেতনা চর্চার ও তা প্রকাশ করার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা যা বর্তমানে একেবারেই অনুপস্থিত। কাউকে অনুসরণ বা অনুকরণ করার নাম নিশ্চই সৃজনশীলতা নয়। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে আমরা সৃজনশীলতার অনুসন্ধান করি অন্যকে অনুকরণ বা অনুসরণের মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে, অন্যকে অনুকরণ বা অনুসরণ করার পূর্বে তার বিষয়গুলো আমার ক্ষেত্রে কতটা প্রযোজ্য তা গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। যেমন, একজন ৬ বছরের শিশু যদি ৩০ বছরের একজন যুবককে ১মণ ওজনের একটি বস্থা কাঁধে তুলতে দেখে নিজেও বড় হওয়ার জন্য সেটা অনুসরণ বা অনুকরণ করে নিজের কাঁধে নিতে চায় তাহলে বিপদ অবশ্যম্ভাবি। কারণ তার শারীরিক গড়ন, তার হাড়, তার অস্থিমজ্জা এখনো এই বোঝা নেয়ার মত পরিপক্ক হয়নি। পাশের জনের ১তলা দালানকে ১০তলার অট্টালিকা বানানো অনুসরণ করে নিজের ১তলা দালানকেও ১০ তলা অট্টালিকা বানাতে যাওয়ার আগে বারংবার ভাবতে হবে আমার দালানের উপাদান যেমন লোহা, দালান তৈরীর সময়কার প্রদত্ত ভিত্তি সব ১০ তলা অট্টালিকার ভার বহন করবার মত করে তৈরী করা হয়েছিল কিনা নচেৎ ধসে পড়া নিশ্চিত। এ পৃথিবীতে ব্যতিক্রম, অসাধারণ কোন কিছুই কাউকে অনুকরণ করে সৃষ্টি হয়নি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার , “An Eastern University” প্রবন্ধে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোকে একপ্রকার কটাক্ষ করে বলেছেন, “ Educational institutions in our country are India’s alms-bowl of knowledge; they lower our intellectual self-respect; they encourage us to make a foolish display of decorations composed of borrowed feathers!” যার বাংলা অর্থ হলঃ আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হ’ল ভারতের ভিক্ষার বাটি; তারা আমাদের বৌদ্ধিক আত্ম-সম্মান হ্রাস করে; তারা আমাদের ধার করা পালকের সমন্বয়ে সজ্জাগুলির একটি নির্বোধ প্রদর্শন করতে উৎসাহ দেয়। এখানে ভারত বলতে গোটা ভারতীয় উপমাহাদেশকে বুঝিয়েছেন।
সুতরাং সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা সফল হতে হলে অবশ্যই শিক্ষকবৃন্দকে তাঁদের চিন্তা-চেতনায় সৃজনশীল হতে হবে এবং এই চেতনা চর্চার জন্য এর সাথে সংশ্লষ্ট সকলকে একটি উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে সচেষ্ট হতে হবে। কারণ, (আবার রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত্ত করছি,) “ঘুরিয়া ফিরিয়া যেমন করিয়াই চলি না কেন শেষকালে এই অলঙ্ঘ্য সত্যে আসিয়া ঠেকিতেই হয় যে, শিক্ষকের দ্বারাই শিক্ষাবিধান হয়, প্রণালীর দ্বারা হয় না।”
পরিশেষ বলতে চাই,অসাধারণ কোন সৃষ্টি পেতে হলে অন্যকে অনুকরণ বা অনুসরণ করে বা তা করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে নয় বরং সৃজনশীলতার চর্চার মাধ্যমে নিজের চিন্তা চেতনা কাজে লাগালেই স্বার্থকতা নামের সোনার হরিণ আমাদের কাছে ধরা দেবে।
লেখক :
আ,ন,ম তৌহিদুল মাশেক তৌহিদ
প্রভাষক (অর্থনীতি)
মঈন উদ্দিন মেমোরিয়াল কলেজ।
হ্নীলা, টেকনাফ, কক্সবাজার।
