এম.জিয়াবুল হক, চকরিয়া :
সাতদিনের অব্যাহত ভারী বর্ষণ ও মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে বানের পানিতে ভাসছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বির্স্তীণ জনপদ। উপজেলার সাড়ে লাখ মানুষের মধ্যে আনুমানিক ৭০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৪ লাখ মানুষ কমবেশি পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। রান্না করতে না পেরে বেশিরভাগ পরিবার দুদিন ধরে খাওয়া-দাওয়া করতে পারছেনা। গ্রামীণ জনপদে বেশিরভাগ টিউবওয়েল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পানিবন্দি মানুষ তীব্র সংকটে পড়েছে বিশুদ্ধ পানীয়জলের। সাথে শুকনো খাবার সংকটও রয়েছে। পানির নিচে তলিয়ে থাকায় অভ্যান্তরীন যোগাযোগ প্রায় বন্ধ। এ অবস্থার কারণে ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে অনেকেই খাবার সংগ্রহ করছে। অপরদিকে দুর্গত জনপদে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পানিবন্দি মানুষের জন্য লঙ্গনখানা চালু করেছে। কয়েকটি ইউনিয়নে খিচুঁরি রান্না করে নৌকায় করে দুর্গত মানুষের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা নিয়েছে। লক্ষ্যারচর ইউনিয়নে বন্যাদুর্গত অন্তত ১০ হাজার পরিবারের মাঝে বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে রান্না করা খিচুঁড়ি বিতরণ করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তাফা কাইছার।
এদিকে লক্ষ্যারচর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা কাইছারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে বন্যাকবলিত লোকজনের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এলাকার লোকজন। বিষয়টি নিয়ে ভূয়শী প্রশংসা করেন অনেকেই।
তবে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা হাল্কা শুকনো খাবার ও খিচুড়ি রান্না করে বানবাসি মানুষদের কাছে দিলেও তা পর্যাপ্ত নয়। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোর মধ্যে সড়কের পাশে থাকা দুর্গতরা এসব শুকনো খাবার পেলেও বেশিরভাগ দূর্গতরা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন। তাই বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানি পৌছে দেয়ার দাবি জানান দূর্গতরা।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চকরিয়া পৌরসভা ও ১৮টি ইউনিয়নের কমবেশি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ৫০ থেকে ৬০টি গ্রাম তলিয়ে যায়। শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে ২ থেকে ৩ ফুট পানি রয়ে গেছে।
জানা গেছে, গত শুক্রবার থেকে চকরিয়া-পেকুয়া, পার্বত্য জেলা বান্দরবানের লামা ও আলীকদমে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির পানি রাতের দিকে মাতামুহুরী নদী দিয়ে নেমে আসে ভাটির দিকে । এসময় নদীর দু’কুল উপচিয়ে লামা-আলীকদম প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি চকরিয়ার সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, লক্ষ্যারচর, বরইতলী, সাহারবিল, চিরিংগা, কৈয়ারবিল, কোণাখালী, বিএমচর, ঢেমুশিয়া, পশ্চিম বড় ভেওলা, ফাঁসিয়াখালী ও পৌরসভার অধিকাংশ এলাকা এবং পেকুয়া সদর, উজানটিয়া, মগনামাসহ বেশ ক’টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যায়।
সুরাজপুর-মানিকপুরের ইউপি চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম, কাকারা ইউপি চেয়ারম্যান শওকত ওসমান ও লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তাফা কাইছার জানান, বৃষ্টি কমলেও বন্যার পানি করেমনি। শতশত পরিবারে রান্নার কাজ বন্ধ রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে পানিবন্দি মানুষের মাঝে খিচুড়ি রান্না করে ও শুকনো খাবার দেয়া হচ্ছে। তবে তা পর্যাপ্ত নয়।
চকরিয়া পৌরসভার মেয়র মো.আলমগীর চৌধুরী বলেন, টানা বৃষ্টিতে শতাধিক পরিবার জলাবদ্ধতার কাছে জিন্মি হয়ে পড়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি কমতে শুরু করলে পৌর এলাকার যেসব ওয়ার্ডে পানি আটকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে আশা করি ওইসব পানি দ্রুত নেমে যাবে।
চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি আলহাজ্ব ফজলুল করিম সাঈদী বলেন, সরকারিভাবে যেসব চাউল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ এসেছে তা ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে দুর্গত মানুষের মাঝে বিতরণ শুরু করেছে। তবে দুর্গত মানুষের সংখ্যা অনুপাতে আরো বরাদ্দ দেয়ার জন্য কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবগত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারি বরাদ্দের পাশপাশি গতকাল শুক্রবার সকালে থেকে আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বন্যা কবলিত এলাকার অন্তত সাড়ে তিন হাজার পরিবারের মাঝে নতুন কাপড়, চাল-ডালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। বন্যার পানি কমে না যাওয়া পর্যন্ত দুর্গতদের পাশে থাকবো। পানি নেমে গেলে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে করণীয় ঠিক করা হবে।
জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চকরিয়া উপজেলার বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষের জন্য শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এসব শুকনো খাবার দুর্গত এলাকায় পৌছে দিচ্ছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। প্রশাসনের লোকজনও কাজ করছে।#
চকরিয়ায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে চলছে
জোয়ার-ভাটা, হুমকির মুখে বাটাখালী সেতু
কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পয়েন্টে ভেঙে গেছে বেড়িবাঁধ, ফলে লোকালয়ে ঢুকছে বানের পানি। গতকাল সকালে তোলা ছবি।
এম.জিয়াবুল হক,চকরিয়া
অব্যাহত ভারী বর্ষণ ও মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে কক্সবাজারের চকরিয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিশাল এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। গতকাল শুক্রবার ভোরে উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পয়েন্টে ঘটেছে এ ঘটনা। এরপর থেকে বেড়িবাঁধের ভেঙে যাওয়া অংশদিয়ে লোকালয়ে অনায়সে প্রবাহিত হচ্ছে ঢলের পানি। এ অবস্থার কারণে উপজেলার উপকূলের সাত ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি চরম অবনতি ঘটেছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
অপরদিকে ভারী বর্ষণ পরবর্তীতে লামা-আলীকদমের পাহাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তান্ডবে মাতামুহুরী নদীতে ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত দুইদিনে নদীর দুই তীরের বিভিন্ন পয়েন্টে অন্তত ২০ থেকে ২৫ অংশে বড়ধরণের ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ভাঙ্গনের কবলে পড়ে চরম হুমকির মুখে পড়েছে চিরিঙ্গা-বদরখালী-মহেশখালী সড়কের বাটাখালী সেতুটি। পাশাপাশি নদীতে বিলীন হবার পথে রয়েছে সেতুর পাশের একটি জামে মসজিদ, ওই এলাকার অন্তত ৫০ থেকে ৬০টি বসতি এবং বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি। ভাঙ্গনে বাটাখালী সেতুর পুর্বঅংশের এপ্রোচ অংশের মাটি সরে গেলে যে কোন মুর্হুতে চিরিঙ্গা-বদরখালী-মহেশখালী সড়কের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের চকরিয়া উপজেলার চিরিঙ্গা শাখা কর্মকর্তা (এসও) এসএম তারেক বিন সগীর। তিনি বলেন, ভারী বর্ষণ পরবর্তীতে পাহাড়ি ঢলের তান্ডবে মাতামুহুরী নদীতে ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
পানির প্রবল ধাক্কায় গতকাল শুক্রবার ভোরে উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পয়েন্টে প্রায় ৩০ মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এরপর থেকে বেড়িবাঁধের ভেঙে যাওয়া অংশদিয়ে লোকালয়ে অনায়সে প্রবাহিত হচ্ছে ঢলের পানি। অন্যদিকে গত দুইদিনে নদীর দুই তীরের বিভিন্ন পয়েন্টে অন্তত ২০ থেকে ২৫ অংশে বড়ধরণের ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ভাঙ্গনের কবলে পড়ে চরম হুমকির মুখে পড়েছে চিরিঙ্গা-বদরখালী-মহেশখালী সড়কের বাটাখালী সেতুটি। পাশাপাশি নদীতে বিলীন হবার পথে রয়েছে সেতুর পাশের একটি জামে মসজিদ, ওই এলাকার অন্তত ৫০ থেকে ৬০টি বসতি এবং বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি।
তিনি বলেন, ভাঙ্গনে বাটাখালী সেতুর পুর্বঅংশের এপ্রোচ অংশের মাটি সরে গেলে যে কোন মুর্হুতে চিরিঙ্গা-বদরখালী-মহেশখালী সড়কের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বিষয়টি ইতোমধ্যে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জরুরী ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্থ পয়েন্টে মেরামত কাজ শুরু করতে বরাদ্দ চেয়ে পাউবোর উর্ধ্বতন বিভাগে অবহিত করেছেন। বরাদ্দ পাওয়া গেলে অতি সহসা সেখানে মেরামত কাজ শুরু হবে।
মাতামুহুরী সাংগঠনিক উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পশ্চিম বড়ভেওলা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাবলা বলেন, অবিরাম ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে এমনকিতে এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সেখানে গতকাল ভোররাতে হঠাৎ করে মাতামুহুরী নদীর চকরিয়ার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পয়েন্টে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এরপর থেকে বেড়িবাঁধের ভেঙে যাওয়া অংশ দিয়ে অনায়সে লোকালয়ে নতুন করে ঢুকে পড়ছে বানের পানি।
তিনি বলেন, এ অবস্থার কারনে উপজেলার উপকূলীয় সাত ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো তলিয়ে যাওয়ায় সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এসব ইউনিয়নের সাথে উপজেলা সদরের।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পয়েন্টে বেড়িবাঁধের ভেঙে যাওয়ার ঘটনাটি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আমাকে জানিয়েছেন। বিষয়টি কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবগত করা হয়েছে। তিনি কথা দিয়েছেন সহসা ক্ষতিগ্রস্থ পয়েন্টের বেড়িঁবাধ মেরামত কাজ শুরু করবেন।
তিনি বলেন, উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের ‘বন্যার্তদের মাঝে বিতরণের জন্য জেলা প্রশাসন ৪০ মেট্টিক টন চাল ও ২০০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দিয়েছেন। এসব ত্রান সামগ্রী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।#
