জেমস বন্ড এবং তার শৈশবের নায়িকা…

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৭ years ago

মোহাম্মদ আলমগীর : আমি ক্লাস ফোরে উঠেছি, রোল নং খুব সম্ভবত ৭, হালিশহর প্রাণহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ি, আমার বাল্য বন্ধু মালয়েশিয়া প্রবাসী মাহবুব, আমেরিকা প্রবাসী নাদের শেখ ও শেখ সেলিম, পুলিশ ইন্সপেক্টর ফারুক, অমূল্য সওদাগরের ছেলে তপন, মৃত মাখন কান্তি নাথ, ডুলহাজারা সাফারি পার্কের রূপকার ফরেস্ট অফিসার মোহাম্মদ আলী, মহেশখালীর খোকন, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ইফতেখার, রাশিয়া প্রবাসী মনির, সৌদি প্রবাসী আব্দুল গফুর, বি ব্লকের মরহুম জাভেদ এবং মরহুম মনিরসহ আমাদের একটি গ্রুপ ছিল, আমারা বন্ধুরা একেকজন একেক গুনের অধিকারী ছিলাম, কেউ সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান, কেউ কোজাক, কেউ টারজান নিউ, কেউ টারজান ওল্ড, কেউ মাকগাইবার আরো কতকি, মেয়েদের মধ্যে উকিলের মেয়ে শিপ্রা ছিল ব্যায়োনিক ওমেন, আমি ছিলাম বন্ড, জেমস বন্ড, সেই হিসাবে টাশ টাশ করে বারুদ ফুটানোর একটা খেলনা পিস্তল থাকতো আমার পকেটে, কতবার যে জ্বলন্ত বারুদে আমার হাত পুড়েছে তার ইয়ত্তা নেই, আমরা গ্রূপ বেঁধে স্কুলে যেতাম, আমার বাসা ছিল হালিশহর এ ব্লক ৮ নং লাইনে, স্কুলে যাবার পথে, মায়ের দেয়া ১০ পয়সা দিয়ে সালাউদ্দিন ভাইয়ের দোকান থেকে আটার গুলগোল্লা পিঠা কিনে খেতাম, এই পিঠাতে মিষ্টি জিরার ফ্লেবার আসতো যা আমার খুব ভালো লাগতো, আজ যেটা গাউসিয়া সুইটস সেটার মালিক সালাউদ্দিন ভাই, যিনি ক্রিকেটার তামিম ইকবালের ফুপা, সালাউদ্দিন ভাই ও উনার ছোট ভাই আলী দুইভাই মিলে হালিশহর এ ব্লক ৫ নং লাইনের মোড়ে ছোট্ট একটা দোকান চালাতেন, দোকানে ১০ পয়সা করে ডাল পুড়ি এবং আটার পিঠা আর ১৫ পয়সা করে রং চা বিক্রি করতেন, সালাউদ্দিন ভাই বিনা এলেমে অটোমেটিক পীর হওয়ার আগেই অধ্যবসায়ের জন্য গাউসিয়া সুইটস করে সফল হয়েছেন, আমাদের কয়েকজন বান্ধবী ছিল, বিহারী মেয়ে শাহীনা, চাকমা মেয়ে রোজী, কেসকেসি রোকেয়া, ডাক্তার মনিরুজ্জামানের মেয়ে সাবিনা, এম পি আফসার ভাইদের বাড়ির নাসিমা, নাসরিন ও জেলে পাড়ার শোভারানীর কথাই মনে আছে, আমি ছোট বেলা থেকেই গান গাইতাম, আন্ত স্কুল প্রতিযোগিতায় চটগ্রাম বিভাগে দেশাত্মবোধক গান “এই পদ্মা এই মেঘনা” গেয়ে প্রথম হয়ে ছিলাম, প্রাইমারী স্কুলে মাইরের রাজা আব্দুর রহিম স্যার এবং অংক শিক্ষক মোকবুল স্যারের উৎসাহে গান গাইতাম, পাশের হাই স্কুল পি এইচ আমিনের বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অতিথি শিশুশিল্পী হিসাবে সেই বয়সেই হেমন্তর “আধোরাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়” গেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলাম, আমার গান শুনে পি এইচ আমিনের সুমিতা আপা খুব খুশি হয়ে বিশেষ পুরস্কার হিসাবে কান মলা দিয়েছিলেন, চিত্র নায়িকা অঞ্জু ঘোষের সাথে পি এইচ আমিন একাডেমী মাঠে শিশু শিল্পি হিসাবে একটা নাটকেও অংশ নিয়েছিলাম..”একটি পয়সা” নাটকের নাম, তাছাড়া বিটিভির নতুন কুড়ির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, আমার গানের শিক্ষক ছিল হালিশহরের সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান চৌধুরীর ছেলে টিপু ভাই , যেহেতু আমি জেমস বন্ড এবং গান গাইতে পারি সেহেতু আমার বান্ধবীরা আমাকে অন্য রকম চোখে দেখবে এটাত স্বাভাবিক!! তাছাড়া ব্রিস্টল, ক্যাপস্টান, ষ্টার সিগারেটের পেকেট দিয়ে বানানো টাকা আমার পকেটে ভরা থাকতো, কেউ আঁচার, কেউবা ১০ পয়সা দামের নাবিস্কো কোকোলা চকলেট, কেউবা ৫ পয়সা দামের গুড়ের বিস্কিট, আবার অনেকে নারকেল দেয়া রঙিন আইসক্রিমের ভাগ দিয়ে আমার বন্ধু হতে চাইতো, আমি পাত্তা দিতাম না, হাজার হলেও আমি জেমস বন্ড!! পাইরেস ব্রসনামের রোলে আছি, যার তার সাথেতো মিশতে পারিনা!! সে এক অন্য রকম ভাব, বান্ধবীদের মধ্যে শাহিনা আমাদের বাসার সামনের বাসায় থাকতো, বিহারি, তার মা নেই, সৎ মা হলেও শাহিনাকে খুব আদর করতো তার মা, তার বাবা মার্চেন্ট শিপে চাকুরী করতো, আমার বাবাও মার্চেন্ট শিপে কাজ করতো, আমরা সব ভাইবোন এবং শাহিনা সকাল বেলায় মায়ের কাছে কোরান পড়তাম, শুক্রবারে সকালে এ ব্লক ১০ লাইন মসজিদে একজন বার্মিজ হুজুর ছিল তার কাছেও পড়তে যেতাম, স্কুলে একসাথে যাওয়া আসা করতে করতেই শাহিনার সাথে আমার ভাব জমে উঠে, আমার মা এতিম মেয়ে হিসেবে শাহিনাকে অনেক আদর করতো, এটা সেটা খেতে দিতো, আমার বাবা মার্চেন্ট শিপে চাকুরী করার সুবাদে বিদেশ থেকে নানান ধরণের চকলেট, বিস্কিট নিয়ে আসতো, আমার মা এসব নিজেদের জন্য কিছু রেখে বাকিটা প্রতিবেশীদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন, আমি চুরি করে শাহিনার জন্য আলাদা করে কিছু চকলেট পকেটে রাখতাম, জেমস বন্ডের নায়িকা বলে কথা, তাকে আমি আদর করে তিতলি ডাকতাম মানে ফড়িং, ফর্সা মাসুম চেহারার শাহিনাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতাম, যেমন চুরি করে খুরশেদ সাহেবের পুকুরে একসাথে সাঁতার কেটে চোখ লাল করা, খুরশেদ সাহেবের ছোট চিড়িয়া খানায় হরিণ দেখতে যাওয়া, লুকিয়ে লুকিয়ে আঁচার খাওয়া, সি ব্লকে গিয়ে উড়ন্ত ফড়িঙের পিছু ধাওয়া করা, ফড়িং ধরে তার হাতে দেওয়া, ফড়িং হাতে নেয়ার পর যে হাসিটা সে দিতো- সেই হাসি এই পৃথিবীর চেয়েও দামি মনে হতো আমার কাছে, আজকের আর্মির আর্টিলারি সেন্টার এন্ড স্কুল ছিলো সি- ব্লক, নৌ বাহিনীর CWC এবং নাবিক পরিবারের আবাসিক এলাকা ছিল ওটা, আর এই আবাসিক এলাকার দায়িত্বে ছিলেন লেঃ কমান্ডার নেওয়ার কুমার চাকমা, আজ যেটা হালিশহর শাপলা আবাসিক এলাকা সেখানে এক সময় জঙ্গলের মতো ছিলো, ওখানে আমরা বন্ধুরা যেতাম বুটকুনী ফল খাওয়ার জন্য, এ ব্লক বাদামতলীতে বাদাম না থাকলেও বড় একটা লোহার গেইট ছিলো, সেই গেইটের পাশে বিহারি ছেলেরা লাল, হলুদ রং দিয়ে রাঙানো আলুর চটপটি বিক্রি করতো, চটপটি বিক্রেতা বিহারী ইব্রাহিম আমার বন্ধু ছিলো, সে ছিলো আমার ভিলেন, সে ভালোমতো বাংলা বলতে পারতোনা, বাংলা উর্দুর মিশালে অদ্ভুত এক ভাষায় কথা বলতো, কতবার যে তাকে আমি মিথ্যা মিথ্যা গুলি করে মেরেছি…শালা মরতেই চায়না!! মরার ভান করে কিছুক্ষন পড়ে থেকে উঠে বলতো…”মে বাঁচ গেয়া…তেরা গোলিমে দম নেহি হায়” এনিয়ে তার সাথে কতযে ঝগড়া হতো, বৃষ্টির দিনে আমরা বন্ধুরা নীল প্লাস্টিকের তেরপালের নিচে আশ্রয় নিয়ে স্কুলে যেতাম, মেয়েরা থাকতো তেরপালের মধ্যে আমাদের চার বন্ধু বৃষ্টিতে ভিজে তেরপালের চার কোনা ধরে থাকতাম I একদিন হলোকি, আব্দুর রাজ্জাক স্যার তিনি আমাদের বাংলা পড়াতেন, গাঁধার কান কবিতার প্রথম ১০ লাইন মুখস্ত করতে দিয়েছিলেন, আমাদের বন্ধু মাহবুব ছাড়া আমরা কেউ সেদিন পড়া দিতে পারিনি, শাস্তি হিসাবে আমাদের সবাইকে কান ধরে খালি পায়ে স্কুলের সামনে কড়া রোদে লাইন করে দাড় করিয়ে রাখলেন, সবাই অপমানে নীরবে কান্না করছিলাম, মাহবুব এখন আমাদের শত্রু, সে কেন পড়া পারলো? জেমস বন্ডের পিটুনির ভয়ে মাহবুব কয়েকদিন স্কুলেও আসেনি, শাহিনা মাথা নিচু করে কাঁদছে, তার চোখ মাথার সামনের চুল দিয়ে ঢাকা, তার গাল বেয়ে পানি পড়ছে মানে সে কাঁদছে, এক পায়ের আঙ্গুল দিয়ে আরেক পায়ের আঙ্গুল নিয়ে খেলছে, তার চেহারা লাল হয়ে আছে লজ্জায়, ওকে দেখে আমার খুব মায়া হচ্ছিলো, হটাৎ রাজ্জাক স্যারের উপর আমার রাগ উঠে গেলো, আমি কান ছেড়ে দিলাম, স্যারেরা কেউ নেই, শাহিনার হাত ধরে বললাম… আয় চল বাসায় যাবো, তাকে নিয়ে দৌঁড় দিলাম, দুজনেরই খালি পা, ফারুক বললো…কই যাস তোরা? আমি পিছনে ফিরে বললাম…বাসায়, ফারুকও আমাদের পিছু পিছু কিছুটা দৌঁড়ে আসলো , আবার কি মনে করে ফিরে গেলো, আমরা দৌড়াচ্ছিত দৌড়াচ্ছি, শাহিনা ঘামছে, বাতাসে তার চুলগুলো চেহারায় লেপটে যাচ্ছে, আমি শক্ত করে তার হাত ধরে আছি, যেন সে পড়ে না যায়, শাহিনা আমার সাথে তাল মিলিয়ে দৌড়াচ্ছে, শাহিনার চেহারায় খুশির ঝিলিক, আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে সে, অপার্থিব এক রূপ তার চেহারায়, হালিশহর এ ব্লকের এইচ এস রোডের এলুমিনিয়াম ফ্যাক্টরির সামনে এসে দাঁড়ালাম আমরা, দুজনেই হাপাচ্ছি, শাহিনা বললো….পানি খাবো.. ফ্যাক্টরির সামনেই আমার বন্ধু কল্লোলদের বাসা, দরজায় নক করলাম…আন্টি দরজা খুললো…কিরে!!…তোরা!!! বললাম…আন্টি পানি খাবো, আন্টি পানির সাথে আমাদের দুজনকে বিস্কিটও খেতে দিলো…খালাম্মা আমাকে বললো…তোর মা কি করে….বললাম…জানিনা আন্টি..আম্মু বাসায়, এখন বাসায় যাবো, ….খেয়ে আবার বাসার দিকে দৌঁড়, আন্টি চিৎকার করে বললো…এই পাগলা রাস্তা দেখেশুনে যাস, অতীতের সেই হৃদ্যতা আজকের সমাজে নেই, আর যা আছে সবি সেলফি নির্ভর লোক দেখানো, জেমস বন্ডের অভিশাপে ফারুক আজ পুলিশে, সেদিন আমাদের পিছনে দৌঁড়েছিলো আজ অপরাধীদের পিছনে দৌড়াচ্ছে, বাসার কাছাকাছি এসে দৌঁড় থামালাম, দুজনেই হাপাচ্ছি, বাসায় এসে আমার মাকে বললাম সব, আম্মু শুনলেন কিছু বললেননা, আমি ওই স্কুলে আর পড়বোনা, হায় আল্লাহ … বিকাল বেলায় দেখি হেড স্যারসহ অনেক টিচার আমাদের বাসায়, আমার আব্বুর সাথে কি যেন কথা বলছে, আমি ভয়ে দেয়াল বেয়ে বাসার ছাদে, আম্মু ডাকলো আমাকে, শুর শুর করে দেয়াল বেয়ে নেমে এলাম, আম্মু আমাকে ধরে আব্বুর হাতে দিলো, আব্বু আমাকে স্যারদের সামনে নিয়ে গেলো, আব্বু আমাকে স্যারদের সামনেই জিজ্ঞাসা করলো….স্কুল থেকে পালিয়ে এসেছি কেন? আমি চুপ…সবাইকে দেখছিলাম, আব্বু আমাকে বললো স্যারদের কাছে মাফ চাও…. এই রকম আর কখনো করবেনা বলো….আব্বু আমার বন্ধুর মতো ছিলো, আমি কখনো আমার বাবার কথার অবাধ্য হয়নি সেদিন হয়েছিলাম…বললাম স্যার অন্যায় করেছে আমি মাফ চাইবো কেন?….আমার আব্বু টাশ করে আমার গালে চড় বসিয়ে দিলেন, মকবুল স্যার সাথে সাথে আব্বুর কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে নিজের কাছে টেনে নিলেন…বললেন তোমার স্যার কি অন্যায় করেছে, আমি বললাম….শাহিনা যদি স্যারের মেয়ে হতো তাহলে উনি কি তাকে খালি পায়ে রোদে দাঁড় করিয়ে রাখতেন?, শাহিনার মা নেই…তার কান্না আমার ভালো লাগেনি, তাই স্কুল থেকে চলে এসেছি, আমার এই কথা শুনে স্যারেরা সবাই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো, হেড স্যার আমাকে অনেকক্ষন ধরে বুকে জড়িয়ে রেখেছিলেন, এমনকি রাজ্জাক স্যারও আমাকে আদর করলেন I স্যারেরা চলে যাবার পর আমার আম্মু আমাকে বললো….আর কখনো এই রকম করবিনা…যদি করিস শাহিনার সাথে তোকে বিয়ে দিয়ে দিব? মাকে বললাম…..বিয়ে আবার কি?….মা আর উত্তর দেননি, একদিন বিকাল বেলা খেলার মাঠে কাউকে দেখলাম না…. কিছুক্ষণ পর বিহারি বন্ধু ইব্রাহিম আসলো বললাম কোথায় ছিলি? …বললো …ছিলিমা দেখতেছিলাম…..বললাম …ছিলিমা? …. কি সিনেমা?….সে বললো…”তেরা লাম্বার ফেকু উস্তাদের লেন্ড”…বললাম…মানে?….তোকে বলছিতো ..”তেরা লাম্বার ফেকু উস্তাদের লেন্ড” এই ছিলিমা টিভিতে চালু আছে ….আমি হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিলাম… ছবির নাম ছিলো….”তেরো নম্বর ফেকু উস্তাদগার লেন”… ইব্রাহিম ভাষাগত ত্রুটির কারণে ছবির নাম বলতে পারছিলোনা, ইব্রাহিম এখন পাকিস্তানে থাকে I এক দিন স্কুলে যাবার জন্য শাহিনাকে ডাকতে তাদের বাসায় গেলাম, দরজা খুলে দিল তার মা, যা দেখেছি তার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না, শাহিনাকে দেখলাম কয়লা দিয়ে দাঁত মাজছে, জেমস বন্ডের স্বপ্নের পৃথিবী উল্টে গেলো, আমি অনেকক্ষন শাহিনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, শাহিনার ঠোঁট কয়লার কালোতে কালো হয়ে আছে, সেও আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আশাভঙ্গ মন নিয়ে বাসায় এসে মাকে জড়িয়ে ধরে নীরবে কাঁদতে লাগলাম, আম্মু আমাকে বললো…কান্না করছো কেনো? আমি মাকে জড়িয়ে ধরে ছিলাম, চোখ দিয়ে টপ টপ পানি পড়ছে, বললাম…আম্মু আমি শাহীনাকে বিয়ে করবোনা…আম্মু বললো কেন? ….ওর টুট ব্রাশ নাই….ও কয়লা দিয়ে দাঁত মাজে… আমার কথা শুনে আম্মু হাসতে হাসতে শেষ… কিন্তু আমার মনে শান্তি নেই….জেমস বন্ডের নায়িকার টুট ব্রাশ থাকবেনা এটা কিভাবে হয়!!….আমার ভালোবাসা ভেঙে গেলো, সেদিনের পর থেকে আমি শাহিনাকে এড়িয়ে চলতে লাগলাম, শাহিনা আমার সাথে মিশতে চাইত…..কিন্তু আমি তার কাছ থেকে দূরে থাকতাম…. সে মন খারাপ করতো…মাথা বাঁকা করে নীরবে ছলোছলো চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতোI

আমি ক্লাস নাইনে পড়ার সময় শাহিনার বিয়ে হয়েছিল তাও মুম্বাইয়ের এক ছেলের সাথে, ছেলেটা দারুন দেখতে, একদম সঞ্জয় দত্তের মতো লম্বা চুল ছিলো তার, বিয়ের পর শাহিনা মুম্বাই চলে গিয়েছিলো….যাওয়ার দিন শাহিনা আমার আম্মুর সাথে দেখা করতে আসলো, খুব কাঁদলো আম্মুকে জড়িয়ে ধরে….আম্মুও কাঁদছেন…..আম্মু তাকে শান্তনা দিলেন, শাহিনার হাতে কিছু টাকা দিলেন পথে খরচ করার জন্য, আম্মু এমন আচরণ করলেন যেন নিজের মেয়েকেই বিদায় দিচ্ছেন, বারান্দায় আমার সাথে শাহিনার দেখা হলো, হেসে বললো….কিরে জেমস বন্ড? ….তখনও তার চোখ ভেজা কিন্তু মুচকি হেসে বললো…চল…ওই দিনের মতো দুইজনে মিলে আবার একটা দৌঁড় দেই….এটা বলে সে খিলখিলিয়ে হেসে দিলো… তার কথায় আমি খুব লজ্জা পেলাম…..বললো..খালাম্মার দিকে খেয়াল রাখিস….তুই অনেক ভালোরে ভাই…অনেক ভালো ….সে হাঁটা দিলো, হটাৎ পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে দুই চোখ ব্রুকুটি করে বললো…জীবনে আর কখনো কয়লা দিয়ে দাঁত মাজবোনা ….দুজনই হেসে দিলাম…চলে গেলো সে…আমি জানালা দিয়ে তার চলে যাওয়া দেখছিলাম…আমার বুকের মধ্যে শুন্যতা অনুভূব করলাম, যে হাত একদিন শাহিনাকে শক্ত করে ধরে রেখেছিল, আজ সেই হাত শূন্য….খুব লজ্জা লেগেছিলো সেদিন আমার অতীতের ছেলেমানুষির জন্য….অতীতের ফেলে আসা দিনগুলি প্রবাসে আমাকে কখনো হাসায় আবার কখনো কাদাঁয়, যে বন্ধুরা এক সময় জীবনের অংশ ছিলো আজ তারা একেকজন বহুদূরে….আজ আমি প্রবাসে একা….সেদিনের জেমস বন্ড আজ একদম একা… ভীষণ একা

লেখক:
মোহাম্মদ আলমগীর, সাবেক নৌবাহিনীকর্মকর্তা