বাঁচতে চাই, আর ইয়াবা ব্যবসা করব না

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৮ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক :
টেকনাফ সাবরাং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের হাজি খুইল্যা মিয়ার ছেলে জাফর আহমদের বয়স ৪৩ বছর। এইচএসসি পাস করা জাফর আহমদ তাঁর ইয়াবাজীবনের গল্প শুনিয়েছেন এভাবে:

“সংসারে স্ত্রী ছাড়াও স্কুলপড়ুয়া দুই ছেলে, এক মেয়ে আছে। আমি গরু ব্যবসা করতাম। ২০১৩ সালের পর এলাকায় দেখতে পাই, মিয়ানমার থেকে গুটি (ইয়াবা) এনে অনেকেই বিক্রি করছে। রিকশাওয়ালারাও ইয়াবা বিক্রি করে লাখ টাকা আয় করছে। এরপর আমিও লোভে পড়ি। শুরু করি ইয়াবা ব্যবসা। একদিন আমার বাড়িতে এক হাজার ইয়াবা নিয়ে তিনজন লোক এসেছিল। ওই সময়ই পুলিশ আমাদের ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে। আমি কারাগারে যাই ইয়াবা মামলায়। সেটি ছিল প্রথম ইয়াবা মামলা। চার মাস সাত দিন কারাভোগের পর আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসি। এর পরও ইয়াবা পাচারে ছিলাম।

“সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচাররোধে বিজিবি ও কোস্ট গার্ড আছে। আর স্থলভাগে আছে পুলিশ। কিন্তু শুরুর দিকে বেশির ভাগ ইয়াবার বড় চালান আসত স্থলবন্দর দিয়ে, বৈধ পণ্যের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে। এই কারণে ধরা পড়ত কম। আবার নাফ নদ ও বঙ্গোপসাগর দিয়ে যখন পাচার শুরু হয় তখন বেশি হারে ধরা পড়তে থাকে। এরই মধ্যে বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও পুলিশের নাম দিয়ে স্থানীয়দের অনেকেই সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করে। শুনেছি সোর্সরা ইয়াবা ধরিয়ে দেয়। সে ক্ষেত্রে সোর্সরা কমিশন পায়। ৩০-৫০ শতাংশ কিংবা তার চেয়ে বেশি পর্যন্ত কমিশনও নাকি পায় সোর্সরা। যেমন ধরা পড়ল ১০ লাখ ইয়াবা, কিন্তু ওই বাহিনী উদ্ধার দেখাল এক লাখ। বাকিগুলো হাওয়া। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সোর্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী শুধু ইয়াবা পাওয়া যায়। কোনো আসামি পাওয়া যায় না। সেখানে মূলত ইয়াবার বড় চালান থাকে। ওই চালানের একটি ক্ষুদ্র অংশ উদ্ধার দেখিয়ে বাকিগুলো ‘হাওয়া’ করে দেওয়া হয়।

“শুরুতে যারা ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়েছিল তাদের মধ্যে একজনের নাম শুনেছি ‘একটেল রমজান’। তাদের গ্রুপ অনেক টাকা আয় করেছে। আমরা যারা ছোট ব্যবসায়ী তারা খুব বেশি কিছু করতে পারিনি। তবে একজন পাচারকারী সবাইকে ম্যানেজ করতে পারে না। এক বাহিনীকে ম্যানেজ করা সম্ভব হলে অন্য বাহিনীকে ম্যানেজ করা সম্ভব হয় না। ফলে মাল ধরা পড়ে। টেকনাফে দ্রুত ধনী হওয়ার আশায় যুবসমাজের মধ্যে অন্তত ৯০ শতাংশ ইয়াবা পাচারে জড়িত। কেউ প্রকাশ্যে স্বীকার করছে, অনেকেই করছে না। নিজদের নির্দোষ দাবি করে দূরে থাকছে। বাস্তবে আমরা তো জানি, টেকনাফের যুবসমাজের প্রকৃত চিত্র কী।

“আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি মূলত মৃত্যুর ভয়ে। এখন সরকার কঠোর অবস্থানে আছে। পাচারকারীরা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাচ্ছে। পরিচিত অনেকেই এরই মধ্যে মারা গেছে। আমার সংসার-সন্তান আছে। আমি এখনই মরতে চাই না। বাঁচতে চাই। এই কারণে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই। ভবিষ্যতে আর ইয়াবা ব্যবসা করব না।

“এমন দুবির্ষহ জীবন হবে, তা ইয়াবা ব্যবসা শুরুর সময় চিন্তাও করিনি। এখন রাতে ঘুমাতে পারি না। রাতের অন্ধকারে কোনো আওয়াজ শুনলেই মনে হয়, এই বুঝি ধরা পড়ে গেলাম। আর পরদিন হয়তো স্বজনরা মরদেহ পাবে কোনো বিলে বা সড়কের ধারে। আমার সন্তানরা এতিম হবে। এটা আমি ভাবতেও পারি না। এ ছাড়া সমাজের মানুষ এখন ঘৃণার চোখে দেখে। কলঙ্কময় জীবন নিয়ে বাঁচতে চাই না বলেও আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

‘টাকার নেশা পেয়ে বসে’

টেকনাফের মৃত মোহাম্মদ কাশেমের ছেলে আলী আহমদের বয়স প্রায় ৩৫ বছর। তিনি ইয়াবা পাচারে জড়ানোর গল্প শুনিয়েছেন এভাবে :

“আমি ছিলাম সৌদি আরবপ্রবাসী। ২০০৫ সালে ধরা পড়লে বাংলাদেশে ফিরে আসতে বাধ্য হই। ২০১১ সালে বিয়ের সময় পর্যন্ত ছিলাম বেকার। বিয়ের পর সংসারে অর্থকষ্ট শুরু হয়। ওই সময়ই শুক্কুর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে পড়ি। ইয়াবা যে শুরুতে বুঝিনি। আমার দায়িত্ব ছিল মাল তোলার সময় সড়কে দাঁড়িয়ে পাহারা দেওয়া। আমি তাই করতাম। শুক্কুর আমাকে দু-এক হাজার করে টাকা দিতো। পরে এসব বুঝতে শিখি। তখন আমিও বেশি টাকা দাবি করি। তাই প্রতি ট্রিপে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা করে দিত। তখন বুঝতাম মাল বেশি উঠেছে। একপর্যায়ে আমি খুচরা পর্যায়ে পাচার শুরু করি। এক দফায় এক হাজার মাল ধরা পড়েছিল। আমার বিরুদ্ধে মামলাও হলো।

“ইয়াবা পাচার যে খারাপ একদিন তা বুঝতে পারি। কিন্তু তখন টাকার নেশাও পেয়ে বসেছিল। আর সম্প্রতি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ অনেক পাচারকারী মারা গেছে। কিছু দিন আগে শুনতে পাই, আমি নাকি আবুল কালামকে ‘হত্যা’র রাতে সেখানে পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। অথচ আমি এসবের কিছুই জানি না। আমি হয়ে গেলাম ক্রসফায়ার মামলার আসামি। পরে চিন্তা করলাম, এভাবে তো বেঁচে থাকা যাবে না। যেকোনো সময় ধরা পড়ব এবং ‘বন্দুকযুদ্ধে’ যাব। তাই জীবন রক্ষার্থে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ভবিষ্যতে আর ইয়াবা পাচার করব না। দুই সন্তান-সংসার নিয়ে বাঁচতে চাই।”

সূত্র : কালের কন্ঠ