নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম |
চেক আর নগদ মিলে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা এবং ফেনসিডিলসহ রেল পুলিশের হাতে গ্রেফতার চট্টগ্রাম কারাগারের জেলার সোহেল রানাকে নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে।
জেলারের এ বিপুল অর্থের উৎস নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর চট্টগ্রাম কারাগার নিয়ে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম কারাগার যেন একটি ‘টাকার খনি’।
কারাগারে যত অনিয়ম-দুর্নীতি হয় তার নেপথ্যে সক্রিয় থাকেন জেলের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। কারাবন্দিদের জিম্মি করে অন্তত ৫ ধাপে আদায় করা হয় লাখ লাখ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে- বন্দি বেচা-কেনা, সাক্ষাৎ বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য, খাবার বাণিজ্য এবং জামিন বাণিজ্য। কারাগারে বন্দিদের থাকার জন্য ছয়টি পাঁচ তলা ভবনে ১২০টি ওয়ার্ড আছে।
এসব ওয়ার্ড মাসে লাখ লাখ টাকায় নিলামে উঠে। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে জেলার হিসেবে যোগদানের পর সোহেল রানা বিশ্বাস হয়ে উঠেন এ অবৈধ আয়ের নিয়ন্ত্রক।
শুক্রবার ভৈরব স্টেশনে পুলিশের তল্লাশিতে ৪৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা, ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার ব্যাংক চেক, আড়াই কোটি টাকার এফডিআর, পাঁচটি চেক বই এবং ১২ বোতল ফেনসিডিলসহ ধরা পড়েন তিনি। এর মধ্যে দিয়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে অবৈধ আয়ের বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট হয়।
১ হাজার ৮৫৩ জন ধারণক্ষমতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে সব সময় কয়েকগুণ বেশি বন্দি থাকেন। বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার বন্দি রয়েছেন। আর এসব বন্দিদের পুঁজি করেই চলে অপরাধ। কারাভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরনো বন্দি আর এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী চট্টগ্রাম কারাগারকে বানিয়েছে ‘অপরাধের স্বর্গরাজ্য’। এ কারাগারে প্রতি মাসে লেনদেন হয় কোটি টাকা।
কারাগারে বন্দিবাণিজ্য : কথা হয় সদ্য জামিনে মুক্তি পাওয়া এক বন্দির সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দিরা খুবই অসহায়। বন্দিদের জিম্মি করে পদে পদে টাকা আদায় করা হয়। তিনি জানান, কারাগারে নেয়া নতুন বন্দিদের রাতে একটি কক্ষে রাখা হয়। ওই কক্ষকে ‘আমদানি’ বলা হয়। সেখানে রাখা বন্দিদের বলা হয় ‘গরু’।
এখান থেকে কারারক্ষীরা নতুন বন্দিদের বিক্রি করে দেন পুরাতন প্রভাবশালী বন্দিদের কাছে। এর মধ্যে সচ্ছল বন্দিরা ১২শ’ এবং অসচ্ছল বন্দিরা ৬শ’ টাকায় বিক্রি হন। নতুন বন্দিদের ওয়ার্ডে নিয়ে আরেক দফা নিলামে তোলা হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন ওয়ার্ডের ‘নিয়ন্ত্রক’ পুরাতন বন্দিরা তাদের ক্রয় করেন। এর মধ্যে মেডিকেলে থাকলে প্রতি মাসে ১২ হাজার টাকা, মেডিকেলে ভিআইপি কেবিনে ২০ হাজার টাকা, বাকি ওয়ার্ডগুলোতে থাকতে গেলে সর্বনিু ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয় বন্দিদের কাছ থেকে।
তবে কারাগারে ইয়াবা ব্যবসায়ী এবং স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বেশি দামে বিক্রি হন। তিনি বলেন, মেডিকেলে বন্দি নিয়ন্ত্রণ করেন জিল্লুর নামে সাজাপ্রাপ্ত এক আসামি। এছাড়া কারাগারের ১২০টি ওয়ার্ডের ‘নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে আছেন দাপুটে বন্দি সাজাপ্রাপ্ত নোয়াখালীর জামাল উদ্দিন।
প্রতিটি ওয়ার্ডের ‘নিয়ন্ত্রক’ও আছেন একজন করে। প্রতি মাসেই ১২০টি ওয়ার্ড নিলামে উঠে। পুরনো বন্দিদের মধ্যে সর্বোচ্চ অর্থদাতারা এসব ওয়ার্ডের দায়িত্ব পান। যেসব বন্দি ওয়ার্ড নিয়ন্ত্রকদের টাকা দিতে অক্ষম তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা ছাড়াও তাদের দিয়ে অন্য বন্দিদের কাজ করানো, টয়লেট পরিষ্কার, ঝাড়– দেয়াসহ অন্যান্য কাজ করানো হয়। অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক পরোক্ষভাবে এসব অনিয়মের কথা স্বীকার করেন। যুগান্তরকে বলেন, ৩ মাস আগে আমি যোগদানের পর এ চক্রটিকে ভাঙতে প্রভাবশালী ৭ বন্দিকে অন্যত্র সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি।
সাক্ষাৎবাণিজ্য : কারাভোগীরা জানিয়েছেন, কারাগারে বন্দিদের সঙ্গে টাকা ছাড়া সাক্ষাৎ মেলে না স্বজনদের। প্রতিদিন ৮শ’ থেকে ৯শ’ বন্দির সঙ্গে অন্তত ১২শ’ থেকে ১৫শ’ স্বজন সাক্ষাৎ করেন। এর মধ্যে অফিস কলের জন্য (অফিসের ভেতর সরাসরি সাক্ষাৎ) প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৪শ’ টাকা করে আদায় করা হয়। এছাড়া সাক্ষাৎ কক্ষে দেখা করতে জনপ্রতি ২শ’ থেকে ৫শ’ টাকা আদায় করা হয়। কারারক্ষীরা এ টাকা আদায় করে থাকেন। স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসার সময় বন্দিদের ‘মিয়া সাহেব’ নামে কারারক্ষীকে ১০০ টাকা দিয়ে আসতে হয়। যিনি বন্দিদের ডাকতে যান তাকে দিতে হয় ৫০ টাকা। শুধু সাক্ষাৎবাণিজ্য থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আদায় করছেন অসাধু কারারক্ষীরা।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের ডিআইজি প্রিজন পার্থ গোপাল বণিক যুগান্তরকে বলেন, ‘কারাগারে এক সময় সাক্ষাৎবাণিজ্য থাকলেও এখন নেই। যেসব পুরনো বন্দি কারাগারে সমস্যা করত তাদের কয়েকজনকে অন্য কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’
জামিনবাণিজ্য : চট্টগ্রাম কারাগারে জামিনবাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেট। আটক বন্দিদের আদালত থেকে জামিননামা কারাগারে পৌঁছলে তা নিয়ে বন্দিদের সঙ্গে দেন-দরবার শুরু করেন অসাধু কারারক্ষীরা। চাহিদামতো অর্থ না দিলে পুনরায় থানা পুলিশের কাছে তুলে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। জামিন পাওয়া বন্দির কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। জামিন পাওয়া বন্দিরা যদি বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মী হন তবে তো কথাই নেই। কারাগারের এ অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে জেলা ও নগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি চক্র জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ক্যান্টিনে অস্বাভাবিক খাবারের দাম : চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর বন্দিদের জন্য রয়েছে শুধু একটি ক্যান্টিন। কারাভোগীরা জানিয়েছেন, এ ক্যান্টিনে খাবারসহ সব কিছুর দাম বাজার দরের চেয়ে অন্তত তিনগুণ বেশি। এখানে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয় ১২০, বরবটি ২শ’, দেশি মাছ ৮শ’, সামুদ্রিক মাছ ৬শ’, ফার্মের মুরগি ৫শ’, দেশি মুরগি ৭শ’, কাঁচা মরিচ ৪শ’, গরুর মাংস ১২শ’ ও চিংড়ি দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ৬ মাস পরপর নিলামে তোলা হয় এ ক্যান্টিন। প্রতি ৬ মাসের জন্য ৪০-৪৫ লাখ টাকায় নিলামে বিক্রি হয়। তবে খাতা-কলমে তা দেখানো হয় না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক বলেন, ক্যান্টিনের দায়িত্বে ছিলেন গ্রেফতার সোহেল রানা বিশ্বাস। যোগদানের পর তাকে আমি এ ব্যাপারে সতর্কও করেছি। তাকে স্বাভাবিক দামে জিনিসপত্র বিক্রির তাগিদ দিয়েছি।
নগদ টাকা যাচ্ছে কারাগারে : কারাগারে আটক বন্দিরা কারারক্ষী ও পুরনো প্রভাবশালী বন্দিদের অশালীন আচরণ থেকে রক্ষা পেতে তাদের কথায় কথায় দিতে হয় টাকা। এজন্য পরিবারকে কারাগারে টাকা পাঠাতে হয়। কারাগারে ১ হাজার ৫শ’ টাকা পাঠালে সেখান থেকে ২শ’ টাকা কেটে রাখেন কারারক্ষীরা। প্রতিদিন কারাগারে নগদ লাখ লাখ টাকা ঢুকছে।
গ্রেফতারের পর সোহেল রানা পুলিশকে জানিয়েছেন, তার কাছে থাকা ৪৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকার মধ্যে ৫ লাখ টাকা তার নিজের বাকি টাকা চট্টগ্রাম কারাগারের ডিআইজি (প্রিজন) পার্থ কুমার বণিক ও সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিকের। ময়মনসিংহ ব্যাংক থেকে তুলে ঢাকায় দু’জন লোকের কাছে এ টাকা পৌঁছে দেয়ার কথা ছিল।
ভৈরব থানার ওসি আবদুল মজিদ যুগান্তরকে জানান, কারাগার থেকে অবৈধভাবে আয় করা অর্থ অন্যদেরও ভাগ দিতেন। তিনি কারাগারে মাদক সেবনের পাশাপাশি মাদক বিক্রিও করতেন বলে জানিয়েছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। আজ কিশোরগঞ্জ আদালতে তার রিমান্ড শুনানি হবে। এ প্রসঙ্গে সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক যুগান্তরকে বলেন, সোহেল রানার নানা অনিয়মের কারণে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলাম।
এ কারণে তিনি (জেলার) উদ্দেশ্যমূলকভাবে এসব মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন। তবে তার দেয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন বলেও তিনি জানান। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামে ডিআইজি প্রিজন পার্থ গোপাল বণিক যুগান্তরকে বলেন, ‘জেলার সোহেল রানাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এখন সে নানা মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিজে বাঁচার চেষ্টা করছেন।’
৩ সদস্যের কমিটি গঠন : ভৈরব প্রতিনিধি জানান, সোহেল রানার ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্য তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। বরিশাল কারাগারের ডিআইজি প্রিজন সগীর মিয়ার নেতৃত্বে কমিটির অপর সদস্যরা হচ্ছেন- যশোর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. কামাল হোসেন ও খুলনা কারাগারের জেলার জান্নাতুল ফরহাদ। ঘটনার পরদিন তাকে মৌখিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও রোববার তা কার্যকর হয়।
