পরিবারহীন ৩৬ হাজার ৩৭৩ জন রোহিঙ্গা শিশু শনাক্ত : সক্রিয় পাচারকারীরা

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৮ years ago

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া : মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে সাড়ে ৫ লাখ শিশু রয়েছে। এসব শিশুদের অনেকেই রাখাইনে শারীরিক নির্যাতন ও ধর্ষণ শিকার হয়েছে জরিপ আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার। বাংলাদেশে এসেও অভাবের দায়ে আর অনিচ্ছা সত্তে¡ও একই পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে তাদের। এদিকে কক্সবাজারে সস্তা মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে রোহিঙ্গা শিশু শ্রমিক। অর্থের প্রয়োজনে মেয়েদের বাল্যবিবাহ দিচ্ছেন মা-বাবারা। আবার অনেক রোহিঙ্গা শিশু পড়েছে পাচারকারীদের লোলুপ দৃষ্টিতে। রোহিঙ্গা শিবিরে সরেজমিনে দেখা যায়, শরণার্থী শিবিরগুলোতে দারিদ্র ও পুষ্টিহীনতা চরম আকার ধারণ করেছে। এ ছাড়া সেখানকার শিশুদের বিকাশে সুযোগ-সুবিধাও নেই বললেও চলে। এদিকে গত ৪ মাসে আসা রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন কার্যক্রমে মঙ্গলবার (২৬ ডিসেম্বর) পর্যন্ত উখিয়া-টেকনাফে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ৯ লক্ষ ১২ হাজার ৫৩৭জন। এদের মধ্যে ৬০% এর বেশি ১৮ বছরের নীচে শিশু হলেও ৩৯.৬৪% শিশু ১০ বছরের নীচে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট আবুল কালাম মো: লুৎফর রহমান। সরেজমিন দেখা যায়, কক্সবাজারের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে কাজ করছে রোহিঙ্গা শিশুরা। কর্মক্ষেত্রে সাত বছরের শিশুদের খোঁজ মেলেছে। সামান্য অর্থের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে এসব শিশুরা। অনেক শিশুকে যাত্রীবাহী গাড়ীর হেলপার, চায়ের দোকানে ও রিকশা চালাতে দেখা গেছে। অপরদিকে মেয়েশিশুদের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজের জন্য কৌশলে নিয়ে যাচ্ছে পাচারকারী চক্র। তাদের অনেকেই কক্সবাজার ছাড়িয়ে কাজ করছে আশপাশের জেলাগুলোতেও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রোহিঙ্গা দম্পতি জানান, তাদের ১৪ বছর বয়সী মেয়েকে এক বাংলাদেশির বাড়িতে কাজ করতে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে ভয়ংকর যৌন নির্যাতনের শিকার হয় সে। কাঁদতে কাঁদতে শিশুটির মা বলেন, ‘আমার মেয়েকে যে বাড়িতে কাজ করতে দিই, ওই বাসার গৃহকর্তা একজন মদ্যপ। তিনি রাতে আমার মেয়ের ঘরে ঢুকে তাকে ধর্ষণ করতেন। তিনি এই কাজ ছয়-সাতবার করেছেন। আমার মেয়ে যখন পালিয়ে আসে, তখন সে হাঁটতেও পারছিল না।’ এদিকে কাজ করতে নেমে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে ছেলেশিশুরাও। এসব তথ্য দিয়েছেন হয়রানির শিকার ওই শিশুদের মা-বাবারাই। মো: হোছনের পুত্র ফারুক নামের এক রোহিঙ্গা শিশু। কাজ করে কোটবাজারের একটি খাবার হোটেলে। ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করতে হয় বলে জানায় সে। গত ২ মাস ধরে কাজ করছে। দৈনিক ১০০টাকা পারিশ্রমিকও পায়। তথ্য নিয়ে ছবি তুলতেই তার কৌতুল বেড়ে যায়। কি জন্য ? কেন তোলা হয়েছে ছবি ? নিজেদের আর্থিক অবস্থা একটু সচ্ছল এবং দায়মুক্ত হতে অনেক রোহিঙ্গা পিতা-মাতা শিশু সন্তানদের বাল্যবিবাহ দিচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকের বয়স ১১ বছর বলে জানা গেছে। সস্তায় রোহিঙ্গা শিশুদের ঝুকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা সম্পর্কে জানতে চাইলে কোটবাজার হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম বলেন, রোহিঙ্গারা প্রতিদিন ত্রাণ সহায়তা পাওয়ায় নতুন-পুরাতন সকল রোহিঙ্গা শ্রমিক ক্যাম্পে ফিরে গেছে। এর ফলে বর্তমানে হোটেল গুলোতে শ্রমিক সংকটের কারণে নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে তিনি জানান। এদিকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগই শিশু। মিয়ানমারে বেড়ে ওঠা এসব শিশু বাংলাদেশে কেমন আছে তা নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে এসেও রোহিঙ্গা শিশুরা ভালো নেই। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেন বলেন, রোহিঙ্গাদের শরণার্থী শিবির ত্যাগ বন্ধ করতে ১১টি চেকপোস্ট থেকে নজর রাখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপরও যদি কোনো শিশুকে শিবিরের বাইরে শ্রম দেওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়, তাহলে তাদের মালিকদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে শাস্তির আওতায় আনা হবে। সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক প্রীতম কুমার চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত থাকায় বাড়ছে রোহিঙ্গা শিশুর সংখ্যা। এ পর্যন্ত ৩৬ হাজার ৩৭৩ জন পরিবারহীন বা এতিম রোহিঙ্গা শিশুদের শনাক্তকরণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে তাদের রেজিষ্ট্রেশনের কাজ চলছে। শিশুশ্রমের বিষয়ে তিনি বলেন, ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গা শিশুরা কিভাবে ক্যাম্প থেকে বের হয়ে নানা ঝুকিপূর্ণ কাজে জড়াচ্ছে সেই বিষয়টি আমাদের জ্ঞাত না। তাদেরকে ক্যাম্পে মধ্যে নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের।