আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবির মর্মান্তিক ঘটনার পর আবারও আলোচনায় এসেছে টেকনাফের মানব পাচার চক্রের তৎপরতা। ২০১৫ সালের মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্তের জঙ্গলে বাংলাদেশিদের গণকবর আবিষ্কারের পর আবার একই রুটে মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছে। শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং ও বাহারছড়া– এই উপকূলীয় এলাকাগুলো ঘিরে সক্রিয় রয়েছে সংঘবদ্ধ পাচারচক্র। গ্রামে গ্রামে রয়েছে তাদের দালাল। মানুষ বেচে লাখোপতি হওয়াই দালালদের উদ্দেশ্য। পাচারের শিকার অনেকের পরিবারকে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে দিতে হচ্ছে মুক্তিপণ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘টপটেন’ নামে পরিচিত ১০ জন দালালের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচার চলছে। বিদেশে উচ্চ আয় ও নিরাপদ যাত্রার স্বপ্ন দেখিয়ে দরিদ্র ও সহজ-সরল মানুষদের ফাঁদে ফেলে পাচারকারী চক্র। এরপর তাদের সাগরপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় পাঠানো হয়, যেখানে মৃত্যুই হয়ে ওঠে বড় নিয়তি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং ও বাহারছড়ার বিভিন্ন পয়েন্ট ঘিরে একটি পাচার চক্র সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চক্রের অন্তত শতাধিক মাঠকর্মী রয়েছে, যারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে অভাবী মানুষদের চিহ্নিত করে দালালদের কাছে পৌঁছে দেয়। বিনিময়ে তারা অর্থ পেয়ে থাকে। পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত হিসেবে স্থানীয়ভাবে যাদের নাম আলোচনায় এসেছে তারা হলেন– সাবরাং এলাকার আজম উল্লাহ, মোহাম্মদ সাদ্দাম, শাকের মাঝি ওরফে মোহাম্মদ শাকের, শাহপরীর দ্বীপের আবুল হাশিম ওরফে পোয়া মাঝি, মাহবুবুর রহমান ওরফে মাম্মা, আজগর আলী মাঝি, আবু তাহের, মোহাম্মদ ইসমাইল, সৈয়দ উল্লাহ, বাহারছড়ার আব্দুল আলী ও আজু। এ ছাড়া আবদুল আমিন, কাসেম, ফারুক, আবদুল করিম, হেলাল উদ্দিন, হাসু, সাহেব মিয়া, মোস্তফা কামাল, ফয়সাল, শওকত, ফজল আহমেদ, শফিক, সাদ্দাম হোসেন, জুবাই, জসিম, রাসেল ও আয়াত উল্লাহর নামও স্থানীয়ভাবে উঠে এসেছে।
টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল বলেন, ‘মানব পাচারের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে যে ১০ জনের নাম আলোচিত হচ্ছে, তারা ঘটনায় জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে, কিছু প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে। আমরা তদন্ত শুরু করেছি, জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’
দালাল সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘আমি ২০২৫ সাল পর্যন্ত এসব কাজে জড়িত ছিলাম। কিন্তু থাইল্যান্ড গণকবর আবিষ্কারের ঘটনা সামনে আসার পর আমি পলাতক ছিলাম, আমার বিরুদ্ধে দুটি মামলাও হয়। এ কারণে এখনও আমার আসছে।’
শাহপরীর দ্বীপের কোনাপাড়া এলাকার এক ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, কিশোরী রোকসানা আক্তার ও রুমেনা আক্তারকে বাজারে নেওয়ার কথা বলে দালালদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে তাদের পরিবারকে বিদেশ থেকে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। রোকসানার মা মমতাজ বেগম বলেন, ‘এক মাস পর থাইল্যান্ড থেকে ফোন করে ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না থাকায় এখনও মেয়েকে ফেরত আনতে পারিনি।’
সাবরাং এলাকার এক স্কুলছাত্রকে জিম্মি করে পাচারের অভিযোগ উঠেছে আবদুল আমিনের বিরুদ্ধে। পরিবারের দাবি, তাকে মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয়, পরে তার খোঁজ মেলে ট্রলারডুবির ঘটনায়। নিহত ও নিখোঁজদের বহু পরিবার আজও অপেক্ষায় রয়েছে স্বজনদের ফিরে আসার। স্থানীয়দের মতে, গত এক দশকে শতাধিক পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়েছে এই মানব পাচার চক্রের কারণে। শাহপরীর দ্বীপের আবু তাহেরের নামও বিভিন্ন ঘটনায় উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, জেলে পেশা থেকে তিনি মাদক ও মানব পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন। স্থানীয়দের দাবি, একাধিক ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা থাকলেও তাকে ঘাটায় না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
অন্যদিকে, আবুল হাশিম ওরফে পোয়া মাঝির নাম ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডে গণকবর আবিষ্কারের পর দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন সমুদ্রপথে মানব পাচারে জড়িত। অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি অতীতে কিছু কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলেও বর্তমানে মানব পাচারের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
আজগর আলী মাঝির বিরুদ্ধেও থাইল্যান্ডে পাচারকৃত শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণে রাখার অভিযোগ রয়েছে। টেকনাফের বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া ও মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন এলাকা এখনও পাচারের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। জুম্মাপাড়ার আবদুল আলীর বিরুদ্ধেও অপহরণ, মাদক ও মানব পাচারসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।
টেকনাফের ছাত্র প্রতিনিধি রুবায়েত হোসাইন বলেন, ‘২০১৫ সালে গণকবর আবিষ্কারের পর খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টেকনাফের অসংখ্য মানুষ পাচারের শিকার হয়েছেন। অথচ পাচারের সঙ্গে জড়িতরা ধরাছোঁয়ার বাইরে।’
এ বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মো. অহিদুর রহমান বলেন, ‘মানব পাচার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা এককভাবে পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি, চক্র শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে এটি দমন করতে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’
