রাখাইনের শোয়াপ্রাং গ্রামের ইউনুচ, মা-ভাইসহ ৪ জন নিহত হয়েছে সেনা-পুলিশের হামলায়
নুরুল করিম রাসেল, টেকনাফ টুডে ডটকম |
রাখাইনের শোয়াপ্রাং গ্রামে চরম নৃশংসতা চালিয়েছে সেদেশের সেনা ও পুলিশ। অভিযানের প্রথম দিনেই তারা এ গ্রামের পাঁচ শতাধিক মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে, পুড়িয়ে ও কেটে হত্যা করে। গ্রামের দুই শতাধিক বাড়ি পুড়িয়ে দেয় তারা। বাড়িঘরে আগুন লাগানোর পর পলায়নপর মানুষের উপর চালিয়েছে বৃষ্টির মতো গুলি। এমনকি নিহতদের জানাযা ও দাফন পর্যন্ত করতে দেয়নি বর্বর সেনাবাহিনী। শোয়াপ্রাং গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে নৃশংসতার বর্ণনা পাওয়া গেছে।
রাখাইনের রাচিডং এর শোয়াপ্রাং গ্রামের কৃষক ইউনুচ, সৈয়দুল আমিন, শামসুল আলম, বশির আহমদসহ অনেকের সাথে কথা বলে সেদিনের নৃশংস হামলার ঘটনার বর্ণনা ফুটে উঠে।
ইউনুচ জানায়, মগ সেনা ও বিজিপির যৌথ হামলায় হামলায় চোখের সামনেই পরিবারের ৪ জন নিহত হয়। জলন্ত বাড়ির ভিতর পুড়ে মারা যায় মা মায়েনা খাতুন, গুলি করে হত্যা করা হয় ভাই আব্দুল জলিল, ভাতিজা সরোয়ার কামাল, রেজোয়ানসহ ৪জনকে।
সে জানায়, কয়েকদিন আগে থেকে উত্তেজনা চলে আসছিল গ্রামে। আরসা নেতা মৌলভী আবুল হাশিমের নেতৃত্বে রোহিঙ্গা মুসলমানরা সংগঠিত হতে শুরু করেছিল গ্রামে। বৃহস্পতিবার রাতে রাখাইনের অন্যান্য স্থানের মতো শোয়াপ্রাংয়ের বিজিবি ক্যাম্পে হামলা চালানোর কথা থাকলেও পাহারা থাকার কারণে হামলা চালানো সম্ভব হয়নি রোহিঙ্গাদের পক্ষে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর গরু জবাই করে ভোজনের আয়োজন চলছিল। এসময় খবর পেয়ে গ্রামে আসে ৩জন সেনা ও কয়েকজন বিজিপি সদস্য। গ্রামে লোকজনের জমায়েত দেখে সন্দেহ হয় তাদের। গ্রামের এক বাড়িতে তল্লাশী চালিয়ে পেয়ে যায় কিছু কিরিচ। এসময় ক্ষেপে যায় সেনারা। জমায়েত হওয়া লোকদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে তারা। এতে মারা পড়ে কয়েকজন রোহিঙ্গা যুবক। উপায়ান্তর না দেখে রোহিঙ্গা যুবকরাও হামলার চেষ্টা করে সেনা ও পুলিশের উপর। এতে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে দুই শতাধিক সেনা ও পুলিশ গ্রামটি ঘিরে ফেলে নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে। একের পর এক বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এসময় ইউনুচ একটি কচুরীপানা ভর্তি পুকুরে ডুবে থেকে জীবন বাঁচায়। মাঝরাত পর্যন্ত চলে সেনা পুলিশের হত্যাযজ্ঞ। এ নৃশংসতায় একদিনেই আগুনে পুড়ে ও গুলিতে নিহত হয় ৫ শতাধিক রোহিঙ্গা।
বেঁচে যাওয়া লোকজন যে যেভাবে পারে পাহাড়ে-ঝোপ জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। সেখানে তারা তিনদিন অবস্থান করে। একপর্যায়ে নিহতদের জানাযা ও দাফন করতে গ্রামের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে সেনারা তাদের উপর গুলি ছুড়ে।
মিয়ানমার বাহিনী নিহতদের গর্ত করে পুঁতে ফেলে আবার অনেককে কেটে আগুনে নিক্ষেপ করে তাদের ধ্বংসলীলা মুছে ফেলার চেষ্টা চালায়। এভাবে নির্বিচারে গনহত্যা চালায় তারা শোয়াপ্রাং গ্রামে।
পরে গ্রামের লোকজন পাহাড়ে পালিয়ে থাকা বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গাদের হিসাব করে দেখতে পায় গ্রামের ২০৩টি বাড়িতে প্রায় ১২শতাধিক লোক ছিল। তারমধ্যে জীবিত খুঁজে পায় ৫ শতাধিক রোহিঙ্গাকে। বাকিদের পুড়িয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
হামলায় বেঁচে যাওয়া ইউনুচ পরিবারের স্ত্রী ও সন্তানদের খুঁজে নিয়ে পরবর্তীতে মংডু হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে চলে আসে। প্রায় ১৬দিন পর তারা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।
