মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : আল্লাহর কাছ থেকে অশেষ নেয়ামত নিয়ে আসা মাস রামাদানের প্রায়; দু-তৃতীয়াংশ শেষের পথে। বাকি এক তৃতীয়াংশ দেখতে দেখতেই শেষ হয়ে যাবে, আমরা টেরই পাব না।
শেষে শুধু আপসোসই করতে থাকব, হায়রে তেমন কিছুই তো করা হলো না! তাই আসুন সামনের দিনগুলো বিশেষ করে শেষ দশ দিনকে সামনে রেখে আমরা বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করি। আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন রামাদানের শেষ দশ দিন অতি গুরুত্ব ও ফজিলতের সময়।
নিম্নোক্ত বিশেষ তিনটি কারণে শেষ দশ দিনের গুরুত্ব ফুটে ওঠে। প্রথমত এ দিনগুলোতে প্রিয় নবিজি (সা.) ইবাদতের পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে দিতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) শেষ দশ দিনে ইবাদতের জন্য এত বেশি চেষ্টা করতেন, যা তিনি অন্য সময়ে করতেন না (বুখারি)।
তিনি আরেকটি হাদিসে বলেছেন, শেষ দশ দিন এসে গেলে প্রিয় নবিজি (সা.) রাত জেগে ইবাদতে লেগে যেতেন। পরিবারের অন্যদের জাগিয়ে দিতেন। কঠিন প্রচেষ্টা চালাতেন। কোমরের কাপড় বেঁধে নিতেন (বুখারি/মুসলিম)।
মুহাদ্দেসিনে কেরাম কোমরের কাপড় বেঁধে নেওয়ার দুটো অর্থ করেছেন, একটা হচ্ছে কঠিন প্রয়াস চালাতেন, যেমনটি আমরা বাংলায় বলে থাকি কোনো কাজে কোমর বেঁধে লাগা আর অপর অর্থ হচ্ছে-স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশা থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন। উদ্দেশ্য-পার্থিব তৎপরতা কমিয়ে দিয়ে ইবাদতে মনোনিবেশ করা।
কাজেই আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার যতদূর পারা যায় পার্থিব তৎপরতা কমিয়ে দিয়ে এ দশ দিনে আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে মশগুল রাখার চেষ্টা করা। তাহাজ্জুদ যেন একদিনও ছুটে না যায়। কুরআন তেলাওয়াত, জিকির ইস্তেগফার ও দোয়া-দরুদের আমল বেশি বেশি করে করার প্রচেষ্টা চালানো।
দ্বিতীয়ত এ দশ দিনে লুকিয়ে রয়েছে একটি বিশেষ রাত-লাইলাতুল কদর। যে রাতটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। অর্থাৎ এক হাজার মাসব্যাপী কেউ ইবাদত করলে যে সওয়াব অর্জন করবে, এই একটিমাত্র রাতে সঠিকভাবে ইবাদত করতে পারলে তারচেয়েও বেশি নেকি ও কল্যাণের অধিকারী হয়ে যাবে।
নবি করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ইমান ও ইহতেছাবের সঙ্গে রাত জেগে ইবাদত করবে, তার অতীত জিন্দেগির গুনাহগুলো মাফ করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি/মুসলিম)। এ হাদিসে ইমান এবং ইহতেছাব বলতে বোঝানো হয়েছে লাইলাতুল কদরের যে মর্যাদা এবং ফজিলত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা.)-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা এবং আমল করতে পারলে যে সওয়াব পাওয়া যাবে, তার জন্য ব্যাকুল হওয়া। কদরের রাত কোনটি?
এ প্রসঙ্গে নবি করিম (সা.) হাদিস শরিফে ইরশাদ করেছেন, ‘রামাদানের শেষ দশ দিনে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করো’-(বুখারি)। অন্য হাদিসে আরও ব্যাখ্যা করে বলেছেন, শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতগুলোয় লাইলাতুল কদরকে অন্বেষণ করো-(বুখারি)। অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন, আমি আসছিলাম তোমাদের লাইলাতুল কদরের তারিখটি বলে দিতে, কিন্তু পথিমধ্যে তোমাদের দুভায়ের ঝগড়া থামাতে গেলে, সেটা আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হলো।
তবে সেটা অবশ্যই শেষ দশ দিনের একটি বিজোড় রাত। ওপরের হাদিসগুলোর আলোকে ওলামাদের মতামত হলো লাইতুল কদরের ইবাদত শুধু এক রাতে না করে একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ এবং উনত্রিশ-এসব রাতেই করতে হবে। আর রাসূল (সা.)-কে নির্দিষ্ট রাতটি ভুলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের এক রাতের পরিবর্তে পাঁচটি রাতে বিশেষ গুরুত্বসহকারে ইবাদত করার ব্যবস্থা করে দিলেন।
এ রাতের ইবাদতগুলো হচ্ছে-সালাতুত্ তারাবিহ, তাহাজ্জুদ, কুরআন তেলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফার। হজরত আয়েশা (রা.) প্রশ্ন করেছিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি লাইলাতুল কদর পেয়ে গেলে কোন দোয়াটি বেশি বেশি করে আমল করব? তিনি বললেন, পড় ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফ্উন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী’। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি অনেক বেশি ক্ষমাকারী। ক্ষমা করা পছন্দ করেন। আমাকে ক্ষমা করে দিন।-(আহমদ, তিরমিযী, ইবন মাজাহ)।
লেখক : গবেষক, কলামিস্ট
