পেশায় শৃঙ্খলা আনার দায়িত্ব সাংবাদিকদের নিতে হবে

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৭ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : অনলাইন সংবাদ মাধ্যমকে পরিশীলিত ও সুশৃঙ্খল করার জন্য শীঘ্রই নিবন্ধন নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি। তবে সাংবাদিকতায় শৃঙ্খলা আনার মূল দায়িত্ব সাংবাদিকদেরকে পালন করতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইন শীঘ্রই সংসদে উঠছে বলেও জানান মন্ত্রী। গতকাল শনিবার সকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের বঙ্গবন্ধু হলে ‘সাংবাদিকতার নীতিমালা, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন ও তথ্য অধিকার আইন অবহিতকরণ’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের জন্য এ কর্মশালা আয়োজন করে।
স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে সাংবাদিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, দেশে অনলাইনের পাশাপাশি দৈনিক ও টেলিভিশনের অনলাইন রয়েছে। সকল পত্রিকারও বর্তমানে অনলাইন ভার্সন রয়েছে। অনলাইনকে নিবন্ধনের আওতায় আনছি। বিভিন্ন সংস্থা অনেক অনলাইন সম্পর্কে প্রতিবেদনও দিয়েছে। অনলাইনগুলোকে শৃঙ্খলায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেসক্লাবগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের পরিশীলিতভাবে দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের মতো যাচাই বাছাই কিংবা পরীক্ষা নিরীক্ষার সুযোগ থাকা চাই। যাতে অপসাংবাদিকতা থেকে এ পেশাকে রক্ষা করা যায়। একাজটি করতে হবে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে। যে ধরনের সমাজ ও রাষ্ট্র চাই তা গঠনে সবার অংশগ্রহণ জরুরি। বস্তুগত উন্নয়ন দিয়ে উন্নত জাতি গঠন সম্ভব নয়। বস্তুগত উন্নয়নের পাশাপাশি লাগবে আত্মিক, মেধাগত ও দেশাত্মবোধ সম্পন্ন উন্নয়ন । স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে সাংবাদিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন উন্নত রাষ্ট্র থেকে এগিয়ে। এ বন্ধন অটুট রাখতে হবে।
তথ্য মন্ত্রী আরো বলেন, দেশের প্রধান বাণিজ্যনগরী এ চট্টগ্রাম। দেশের স্বাধীকার, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে চট্টগ্রামের সাংবাদিকদের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যম রাষ্ট্র গঠন ও নতুন প্রজন্মের মনন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, অনুসন্ধানী রিপোর্ট অনেক ক্ষেত্রে আগের চেয়ে কমে গেছে। এ ধরনের রিপোর্ট সমাজের তৃতীয় নয়ন খুলে দেয়। একইসাথে দেশগঠনেও অনন্য ভুমিকা রাখে।
তিনি বলেন, সাংবাদিক কারা হবেন তা ঠিক করতে হবে। এটি ঠিক না করলে পেশার মর্যাদা ধরে রাখা যাবে না। সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
কর্মশালায় উদ্বোধকের বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু নিজেও সাংবাদিকতা করতেন। অনলাইন মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণে শীঘ্রই আইন হচ্ছে। প্রেস কাউন্সিল আইনও দ্রুত হবে বলে আশাবাদী। এ চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক ৬ দফা ও এম এ হান্নানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার সাক্ষী। লালদিঘী ময়দানেই ৬ দফার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। বর্তমানে দেশে ৮ হাজার অনলাইন র্পোটাল। এসব অনলাইন পরিচালনা নিয়ে এক ধরনের বিশৃংখলা বিরাজমান।
বিভিন্ন নাম সর্বস্ব মিডিয়া সাংবাকিতার কথা বলে লোক নিয়োগ দিচ্ছে। আবার তাদের কাছ থেকে টাকাও নিচ্ছে। এ অবস্থা চলতে পারে না। কিছু ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বম আনতে গেলেই টাকা নিচ্ছে উল্টো।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রেস কাউন্সিলের সদস্য ও বিএফইউজের সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, বর্তমানে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার নামে এখন অনেকক্ষেত্রে বস্তু অনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় রুপ নিচ্ছে। সারা পৃথিবীর পাশাপাশি বাংলাদেশেও সাংবাদিকতা নানামুখী চ্যালেঞ্জের সামনা সামনি দাঁড়িয়েছে। দুই ধরনের সংকটে আছে এ পেশা। সংকটের একটা সাংবাদিকতার ভেতরের আরেকটি বাইরের সংকট। এরপরও এগিয়ে চলেছে সাংবাদিকতা।
বিচারাধীন বিষয় নিয়ে রিপোর্ট করার বিষয়ে হাইকোর্টের নিদের্শনার বিষয়ে তিনি বলেন, বিচারাধীন বিষয় নিয়ে রিপোর্ট করা যাবে না এটা আজকের কথা নয়, অনেক আগ থেকেই এ নির্দেশনার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখে সাংবাদিকতা চলে আসছে। তাহলে আজকে এ কথা আবার আসল কেন? এক্ষেত্রে কোন জায়গায় সংকট আছে বলে মনে হয়।
তিনি তথ্যমন্ত্রীর কাছে দুইটি দাবির কথা উল্লেখ করে বলেন, ১৯৭৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল গঠন করেছিলেন। এ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য গণমাধ্যম দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হোক। এছাড়া সাংবাদিকদের একটি ডাটাবেইজ থাকা দরকার। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, অনেকক্ষেত্রে সাংবাদিকরা এখন দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করছেন। এ কারণে এ পেশার মান-মর্যাদা আজ তলানীতে। দলীয় কর্মীর মতো আচরণ সাংবাদিকতা হতে পারে না। তার চেয়ে বরং নিজেরাই দলীয় কর্মী হয়ে যাওয়া ভাল। দলীয় নেতারা বলতে বা করতে পারলে আমরা লিখতে সমস্যা কোথায়?
তিনি আরো বলেন, ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশী বিদেশী সাংবাদিকদের অবদান ভুলবার মতো নয়।
ট্রাফিক পুলিশের কাছে চাঁদা চাওয়ার মতো সাংবাদিকতার দরকার নেই আমাদের।
নঈম নিজাম আরো বলেন, সাংবাদিকদের মর্যাদার আসন ধরে রাখতে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। সাহসের সঙ্গে গণমানুষের কথা বলতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার পক্ষে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তবে দলীয় কর্মী হওয়া যাবে না।
সাংবাদিকরা দলীয় কর্মী হয়ে গেলে আখেরে সরকারেরই ক্ষতি। এ ধরনের সাংবাদিকতার কারণে সরকার আসল পরিস্থিতি থেকে বঞ্চিত হয়।
সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ভয়হীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করার জন্য একদিকে যেমন সরকারের দায়িত্ব আছে, অন্যদিকে মানসম্পন্ন সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে ভুমিকা রাখার বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করতে হবে।
প্রেস কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ শাহ আলমের সঞ্চালনায় উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্যে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সভাপতি আলী আব্বাস বলেন, দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও দেশাত্মবোধের বিষয়টি মাথায় রেখেই সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নিতে হবে। প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ বলেন, সাংবাদিকতায় ভুঁইফোড় সাংবাদিকরা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। সাংবাদিকতায় এটা বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ। পেশাকে সুরক্ষায় এসব ভুঁইফোড় সাংবাদিকদেরকে শক্ত হাতে প্রতিরোধের সময় এসেছে। ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী বলেন, আমাদের যা কিছু সংকট সবকিছু কাটিয়ে উঠে সাংবাদিকতা এগিয়ে যাবে এটা আমরা বিশ্বাস করতে চাই।
চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস বলেন, সাংবাদিকতায় আমাদেরকে আত্মমর্যাদার জায়গা শক্ত করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে অনেকক্ষেত্রে সাংবাদিকরা হয়রানির শিকারে পরিণত হচ্ছেন।
তিনি আরো বলেন, দেশে সাংবাদিকের অভাব নেই। সংগঠনের (ভুঁইফোড় সাংবাদিকদের সংগঠন) নামে দোকানেরও অভাব নেই। এসব দোকানের লাগাম টানতে হবে মহান এ পেশার স্বার্থে।