মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ : গবেষণা বলছে, প্রতিটি জ্বলন্ত সিগারেট একেকটি কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি, যা থেকে ছয় হাজারেরও বেশি ক্ষতিকর বস্তু বের হয়। এসব বিষাক্ত ও রাসায়নিক উপাদান যদি ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে ঢোকানো হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের মৃত্যু হতো। ধূমপানের সঙ্গে প্রায় ২৫ ধরনের রোগের কোনো না কোনো সম্পর্ক রয়েছে। তামাক সেবনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফুসফুস। ফলে ফুসফুসের ক্যান্সারসহ জটিল এবং দুরারোগ্য রোগ হয়। ধূমপানের ফলে জটিল করোনারি হৃদরোগ, মস্তিষ্কের স্ট্রোক, হার্টফেইল হওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি। দিনে ২০টি সিগারেট খাওয়া ধূমপায়ী প্রতিবছর প্রায় এক কাপ পরিমাণ আলকাতরা ধোঁয়ার সঙ্গে ভেতরে নেয়। এই পরিমাণ আলকাতরা ফুসফুসে ঝুল সৃষ্টি করে আবৃত করে রাখে। গর্ভাবস্থায় স্মোকিং করলে ঘন ঘন গর্ভপাত, জন্মের আগেই বাচ্চার মৃত্যু হতে পারে। আর বাচ্চার যদি জন্ম হয়ও দেখা যায়, সেই বাচ্চা কম ওজন নিয়ে বা অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেয়। ধূমপানের কারণে শরীরের ত্বকে অক্সিজেন কমে আসে। ফলে অল্প বয়সে বৃদ্ধদের মতো রুক্ষ ত্বকের সৃষ্টি হয়, এমনকি কম অক্সিজেনের ফলে অঙ্গে পচন দেখা দিতে পারে।
মদিনা ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষক ইবরাহিম মুহাম্মদ সারসিক এ বিষয়ে একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম ‘আল-আদিল্লাতু ওয়ার-বারাহিনু আলা হুরমাতিত তাদখিন’। সেখানে তিনি লেখেন, জার্মানির দুজন গবেষক Bosslet ও Reiman ১৮২৮ সালে সিগারেটে একটি বিশেষ পদার্থ খুঁজে পান, যাকে মরণের ‘মহৌষধ’ বলা যায়। এটি খুবই ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুমুখে নিয়ে যায়। ফ্রান্সের এক তামাক ব্যবসায়ী Jean Nicot -এর নামানুসারে তাঁরা এর নাম দেন নিকোটিন। গবেষকরা বলেছেন, একবিন্দু নিকোটিন কারো মুখে দিলে সঙ্গে সঙ্গে সে মৃত্যুবরণ করবে।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য মতে, ফুসফুসের ক্যান্সারের ৮৫ শতাংশের কারণ ধূমপান। পুরুষের ক্যান্সারসংক্রান্ত মৃত্যুর ২১ শতাংশ ঘটে ধূমপানের কারণে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন অধূমপায়ী ব্যক্তির চেয়ে ধূমপায়ী ব্যক্তি ২০ বছর কম বাঁচে। এ ছাড়া এ কারণে যত মৃত্যু হয় অন্য কোনো কারণে এত অপমৃত্যু হয় না।
ধূমপান রোধে ধর্মীয় অনুশাসন
ধূমপান রোধে প্রয়োজন কঠোর আইন। ধর্মীয় অনুশাসনও ধূমপান রোধে সহায়ক। নিম্নে এ বিষয়ে উল্লেখ করা হলো—
প্রথমত, মানবদেহ আল্লাহর আমানত। আর সুস্থতা আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত। অন্যদিকে ধূমপানের মাধ্যমে নিজেকে ক্রমে ক্রমে অসুস্থ করে তোলা হয়। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা (সুস্থ হতে) ওষুধ গ্রহণ করো।’ (তিরমিজি ও আবু দাউদ)
দ্বিতীয়ত, ধূমপানের মাধ্যমে অর্থ অপচয় হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘…নিশ্চয়ই অপচয়কারী শয়তানের ভাই।’ (সুরা : ইসরা/বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৭)
তৃতীয়ত, গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো কোনো সিগারেটে অপবিত্র ও নোংরা পদার্থ আছে। কাজেই এর থেকে দূরে থাকা জরুরি। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘তিনি (আল্লাহ) তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করেন।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৭)
চতুর্থত, ধূমপান মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি (কাঁচা) পেঁয়াজ-রসুন (তথা দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী বস্তু) খায়, সে যেন আমাদের থেকে দূরে থাকে, আমাদের মসজিদে না আসে।’ (বুখারি ও মুসলিম)
পঞ্চমত, ধূমপান এক ধরনের নেশাদ্রব্য। শোনা যায়, মাদকাসক্তরা মাদক না পেয়ে প্রচুর পরিমাণে সিগারেট টানে। হাদিস শরিফে মাদককে সব পাপের মূল হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া সব নেশা সৃষ্টিকারী দ্রব্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ষষ্ঠত, ধূমপানের মাধ্যমে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘…তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ো না…।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৫)
পরিশেষে, আল্লাহর ওপর ভরসা, নিজের অদম্য ইচ্ছা, ধূমপায়ীদের সঙ্গ ত্যাগ, ধূমপানের বিশেষ স্থান ত্যাগের মাধ্যমে ধূমপান ত্যাগ করা সম্ভব। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।
