নুরুল করিম রাসেল, টেকনাফ টুডে ডটকম |
রোহিঙ্গা শিবির গুলোতে ত্রাণ বঞ্চিত হচ্ছে পুরুষ বিহীন পরিবার গুলো। পরিবারে কর্মক্ষম কোন পুরুষ না থাকায় ত্রাণের জন্য না পারছে তারা ছুটাছুটি করতে না পারছে মাঝিদের মাধ্যমে ত্রাণ কার্ড সংগ্রহ করতে। ফলে এইসব রোহিঙ্গা পরিবার গুলো এখনও অন্যান্য রোহিঙ্গাদের মতো ত্রাণ সামগ্রী পাচ্ছে না। এভাবে রোহিঙ্গা শিবিরে অনেক পরিবার এখনও খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। খাদ্যের পাশাপাশি রয়েছে তাদের চিকিৎসা সংকটও।
উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা শিবির সরেজমিন ঘুরে ও রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবন্ধী ও যুবতীসহ ৫মেয়ে নিয়ে তৈয়ুবার পরিবারে এখনও ত্রাণের অভাব :
ঘরত তিন্না হইচ্ছা মাইয়া পুয়া, ডরগা বুক। ওগ্গা মরত পুয়া আছে চোড়। রিলিফইল্লাই বাইরে যাই ন পারি। বউত আগে একবার শুধু চইল পাইলাম। আইচ্ছি লতি আর কিচ্ছু ন পাই। নিজস্ব ভাষায় তৈয়ুবা যা জানায় তা হলো, ঘরে তিনজন যুবতী মেয়ে, বড়টা আবার প্রতিবন্ধী (বোবা)। ছোট একটা ছেলে রয়েছে। ত্রাণের জন্য বাহিরে যেতে পারেননা। আসার পর অনেক আগে একবার চাল পেয়েছিলেন তারপর আর কোন ত্রান পাননি।
নিতান্তই করুন অবস্থা তাদের। ঘরে খাবারের অভাব। তারপরও ত্রাণের জন্য যেতে পারছেন না কোথাও। এতোদিন সড়কে ত্রাণ নিক্ষেপ করেছেন অনেকে সেই ত্রাণ হুড়াহুড়ি, কাড়াকাড়ি করে নিয়েছেন সবাই। যারা ধাক্কাধাক্কি করে নিতে পেরেছেন তারা অনেক কিছু পেয়েছেন। কিন্তু যারা নিতে পারেননি বা সেখানে যাননি তারা কিছু পাননি। জানান তৈয়ুবা।
একবার শুধু ডব্লিউএফপির চাল পেয়েছেন ২৫ কেজি। তাই দিয়ে চলছে এখনও। প্রতিবেশী ও পরিচিতদের কাছ থেকে কিছু আলু চেয়ে নিয়েছেন তাই রান্না করে খেয়েছেন সকালে।
বালুখালী রোহিঙ্গা বস্তির ময়নার ঘোনা এলাকায় একটি ঝুপড়ি ঘরে প্রায় এক মাসের কাছাকাছি বাস করছে তৈয়ুবা বেগম। রাখাইনের মংডু বলিবাজার লংদুর এলাকার বাসিন্দা তৈয়ুবার স্বামী আবু তালেব রাখাইনে অসুস্থ হয়ে মারা যান বছর খানেক আগে। গত ২৫ আগস্ট সহিংসতা শুরু হলে তাদের তাদের আশেপাশের গ্রামে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী। সেই দৃশ্য দেখে পালাতে থাকে গ্রামের বাসিন্দারা। তাদের সাথে পালিয়ে আসে তৈয়ুবার পরিবার।
এখন পাহাড়ে যে ঘরটিতে রয়েছেন সেটিও কিনে নিতে হয়েছে তাকে। আসার সময় পথে পথে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য চেয়েছেন। এভাবে কিছু টাকা জমেছিল। তা দিয়ে বসবারের ঘরটি কিনে নেন। কোরবানীর ঈদের একদিন আগে বাংলাদেশে আসেন।
এখনতো সেনাবাহিনী ত্রাণ দিচ্ছে তবুও ত্রাণ পাচ্ছেন না কেন জিজ্ঞেস করলে জানায়, তাদের মাঝি দূর্বল সে ছুটাছুটি করে ত্রাণ কার্ড সংগ্রহ করতে পারেনা। আবার অনেক মাঝি স্বজনপ্রীতি করে বলে জানায় সে।

ছোট ৫ সন্তানকে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পথ পেরিয়েছেন সৈয়দা :
ছোট ছোট ৪ মেয়ে ও ১ ছেলে নিয়ে বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে অপর রোহিঙ্গা নারী সৈয়দা খাতুন। বড় মেয়ে মোস্তাকিমার বয়স ১২ বছর। সেও প্রতিবন্ধী। অপর মেয়ে রইসানা সাত বছর, কাওছাড়া ৫বছর, জাইতুন নারা ৩ বছর। দেড় বছরের এক ছেলে মোঃ ওমর। রাখাইনের বুচিদং থানার ফাতিয়ার পাড়ায় ছিল তাদের বসতি। তার স্বামীকে সহিংসতা শুরু হলে মেরে ফেলে সেনারা।
১৫দিন আগে সে পালিয়ে এদেশে আসে। রাখাইনে ১২দিন পায়ে হেঁটে ছোট সন্তানদের নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেন। সৈয়দা জানায়, অনেকটা হামাগুড়ি দিয়ে সে এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। ছোট দুই সন্তানকে দুই পাশে নিয়ে অন্য তিনজনকে রশি দিয়ে গায়ের সাথে বেধে দীর্ঘ এ পথ পাড়ি দিয়েছেন। কখনও পাহাড় কখনও খাল-বিল অতিক্রম করেছেন এভাবেই। হাঁটতে হাঁটতে পায়ের আঙ্গুল কেটে গেছে, নখে পচন ধরেছে দেখাল সে। তবে পথে খাবারের তেমন অসুবিধা হয়নি জানাল সে। একবেলা আধবেলা খেয়ে থাকলেও উপোষ থাকতে হয়নি। পলায়নরত হাজার হাজার মানুষ। যার যা ছিল তা অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করে খেয়েছেন। আবার পথিমধ্যে এমন গ্রাম পাওয়া গেছে যেসব গ্রাম পুড়িয়ে দেয়নি সেনারা। সেইসব গ্রাম ছিল জনমানব শূন্য। কিন্তু তাদের বাড়ি ঘরে চাল সহ সবধরনের খাবারের মজুদ ছিল। তা নিয়ে রান্না করে খেয়েছেন পলায়নপর মানুষগুলো। এভাবে সৈয়দা ছোট ৫ সন্তানকে নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পারলেও এখানে ত্রাণ পাচ্ছেনা সে। পরিবারে কোন পুরুষ নেই। ছোট সন্তানদের ফেলে কোথাও যেতে পারছেন না। তাই ত্রাণ ও পাচ্ছেন না।
শুধু তৈয়বা ও সৈয়দাই নই রোহিঙ্গা শিবির গুলোতে এরকম শত শত পরিবার রয়েছে যেসব পরিবারে কোন পুরুষ সদস্য নেই। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা অনেকে সেনা হামলায় নিহত হয়েছে। আবার অনেকের কোন হদিস নেই। রয়েছে শুরু নারী ও শিশু। আবার কোন কোন পরিবারে শুধু শিশু রয়েছে।
এইসব পরিবার ত্রাণ বঞ্চিত হয়ে রয়েছে।
আবার সেনাবাহিনী যাদের মাধ্যমে বর্তমানে তারা ত্রাণ সামগ্রী বিতরন করছেন সেই রোহিঙ্গা মাঝিদের বিরুদ্ধেও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করেছেন অনেক রোহিঙ্গা।
বালুখালী-২ শিবিরের জি ব্লকের শেড ২০ এর মাঝি রফিক জানায় প্রতি ১শ ঘর নিয়ে একজন মাঝি, আবার এরকম ৮/১০ জন মাঝিদের রয়েছে একজন হেড মাঝি। এইসব হেড মাঝিরা বালুখালী রোহিঙ্গা শিবিরে আগে থেকে রয়েছে। ফলে তারা নতুনদের চেয়ে পুরাতন রোহিঙ্গাদের বেশী প্রাধান্য দিয়ে যাচ্ছেন ফলে নতুন রোহিঙ্গারা ত্রাণ বঞ্চিত হয়ে রয়েছে।
এব্যাপারে রোহিঙ্গা মাঝিদের স্বজনপ্রীতির অভিযোগ নিয়ে সেনাবাহিনীর দায়িত্বরত একজন মেজর পদমর্যাদার কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, রোহিঙ্গা শিবিরে রোহিঙ্গারাই তাদের মাঝি নির্বাচন করেছে। সেনাবাহিনী এই মাঝিদের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরনে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। মাঝিদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে, সেনা সদস্যরা শিবিরে দায়িত্ব পালন করছে। তা খতিয়ে দেখবেন বলে জানান তিনি।
