টেকনাফ পৌর কার্যালয় স্থানান্তর : পৌরবাসীর উদ্বেগ

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ১ বছর আগে

জয়নাল আবেদীন বিজয়: নাফ নদীর তীরবর্তী লবনের মাঠে টেকনাফ পৌরসভা প্রশাসনিক ভবন স্থানান্তরের বিষয়ে সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী, পেশাজীবি, সাবেক এমপি পুত্রসহ সর্বস্তরের পৌরবাসী।

টেকনাফ পৌরসভার সচেতন মহলের পাশাপাশি মঙ্গলবার (১৫ এপ্রিল) দুপুর ১২টায় টেকনাফ পৌরসভা‌ প্রশাসনিক ভবন স্থানান্তর: কার স্বার্থে? কেন এই উদ্যোগ? শিরোনামে এক ফেসবুক পোস্টে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন, উখিয়া-টেকনাফ-৪ আসনের সাবেক সাংসদ মরহুম আব্দুল গনির সুযোগ্য সন্তান সাইফুদ্দিন খালেদ।

তিনি ফেসবুক পোস্টে লিখেন, টেকনাফ পৌরসভার বর্তমান প্রশাসনিক ভবনটি পৌর এলাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে এখান থেকেই জনসাধারণ পৌরসেবা গ্রহণ করে আসছে। এখন শোনা যাচ্ছে! বর্তমান এই প্রশাসনিক ভবনের পরিবর্তে একটি নতুন ভবন নির্মাণ করে সেটিতে পৌরসভার কার্যক্রম স্থানান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন ভবনটি নির্মাণ করা হবে পৌরসভার একেবারে পূর্ব প্রান্তে, নাফ নদীর তীরবর্তী লবণ মাঠ এলাকায়।সম্ভবত জিরো লাইনের ( zero line ) সন্নিকটে বা তার আশেপাশে।

এই উদ্যোগ নিয়ে কিছু প্রশ্ন ও উদ্বেগ জানিয়ে তিনি লিখেন, ১. কেন এই স্থানান্তর? বর্তমান ভবন থেকে জনগণ সেবা পাচ্ছে। তাহলে কেন এবং কার স্বার্থে এত দূরে ভবন সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা? ২. এই স্থানান্তর কতটা জরুরি? মাত্র ১৬ হাজার (কম/বেশি হতে পারে) ভোটার সংখ্যার ছোট্ট পৌরসভা টেকনাফে বর্তমান ভবনে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তাহলে এই মুহূর্তে ভবন সরানো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল? ৩. জনসেবার প্রভাব কী হবে? যেখানে সহজে যাতায়াত করা যায় না, সেখানে ভবন নিলে সাধারণ মানুষ কীভাবে পৌরসেবা গ্রহণ করবে? এতে কি ভোগান্তি বাড়বে না? ৪. এটি কি কোনো গোষ্ঠীস্বার্থের অংশ? নাফ নদীর তীরে সীমান্তবর্তী জায়গা কেন বেছে নেওয়া হলো? এর পেছনে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কাজ করছে কি? ৫. নতুন ভবনের জন্য দানকৃত জমি, সেটিই কি একমাত্র বিকল্প? যে জমিতে নতুন পৌর ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে, সেটি সম্প্রতি পৌরসভার নামে দান করা হয়েছে ( খোঁজ নিলে দেখা যাবে প্রকল্প গ্রহনের অনেক পরে জমি দান করা হয়েছে )। তবে এটিই একমাত্র বিকল্প,এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। দানকৃত মানেই সেখানে প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করতে হবে—তা নয়। জমিটি পৌরসভার নিজস্ব মালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে পরবর্তীতে জনস্বার্থে অন্য যেকোনো উপযোগী কাজে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে।

সুতরাং প্রশ্ন হলো—জনসাধারণের দিক বিবেচনা না করে কেন সেই জমিতেই ভবন নির্মাণের জন্য এত তোড়জোড়? এটা কি প্রকৃতপক্ষে পৌরবাসীর সুবিধার কথা ভেবে, নাকি অন্য কোনো স্বার্থ বাস্তবায়নের অংশ? আ.র. বদির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা ও আমার নৈতিক অবস্থান।

এই ভবন স্থানান্তরের পেছনে যে পরিকল্পনা চলছে, তা নতুন কিছু নয় জানিয়ে তিনি লিখেন, এটি সাবেক সাংসদ আ.র. বদির বহুদিনের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ধারাবাহিক অংশ, যার সূত্রপাত বহু আগে থেকেই তার নানা ধরনের ভূমিকা লক্ষ্য করা গেছে। ২০২২ সালে যখন এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপের প্রয়াস দেখা যায়, তখন আমি একজন নাগরিক হিসেবে এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলাম এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২-এ আমার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রথম প্রতিবাদ জানাই। মাত্র একটি নাগরিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করায় আ.র. বদি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে সামাজিক মাধ্যমে অশালীন মন্তব্য করে ( যা-এক ধরনের হুমকি) বিষয়টি আড়াল করার অপচেষ্টা চালান। সে সময় তার ঘনিষ্ঠ মহলও একইভাবে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়- যা একজন নাগরিকের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। তবুও আমি আমার নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হইনি এবং আজও পৌরবাসীর স্বার্থে সেই অবস্থানে অটল রয়েছি। পৌর নাগরিক হিসেবে আজও আমি অধিকাংশ পৌরবাসীর পক্ষেই কথা বলছি। আজ টেকনাফের সচেতন ছাত্র – যুবসমাজ এবং পৌরবাসী এই বিষয়ে সোচ্চার হয়েছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। এখন প্রয়োজন পুরো পৌরবাসীর ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ।

জনস্বার্থে বর্তমানে মেয়রের দায়িত্বপ্রাপ্ত টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনি এই বিষয়ে পৌরবাসীর উদ্দেশ্যে একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিন। পৌর ভবন থাকবে পৌরবাসীর সুবিধার কেন্দ্রে, গুটিকয়েক লোকের স্বার্থের প্রান্তে নয়।

২০২২ এর (১৫ ফেব্রুয়ারি) ‘টেকনাফ পৌরসভা কার্যালয় ভবন স্থানান্তর’ শিরোনামে এক ফেসবুক পোস্টে প্রথম প্রতিবাদ জানান, সাবেক এমপি পুত্র সাইফুদ্দিন খালেদ।

ওই পোস্টে তিনি লিখেন, শোনা যাচ্ছে টেকনাফ পৌরসভা কার্যালয় ভবন স্থানান্তর করে পৌরসভার পূর্বের শেষ সীমানা (বাংলাদেশ ও মায়ানমারের zero line) নাফ নদীর তীরে লবণ মাঠের মাঝে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। টেকনাফ পৌরসভার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বর্তমান পৌর ভবনকে কি কারণে কার স্বার্থে স্থানান্তর করার প্রয়োজন হচ্ছে! আনুমানিক ১৬০৮৫ (কম/বেশি হতে পারে) ভোটারের ছোট এই টেকনাফ পৌরসভার বর্তমান পৌর ভবন স্থানান্তর কি কারণে জরুরী ? জনসেবার কার্যালয় পৌর ভবন নাফ নদীর তীরে (zero line) স্থানান্তর হলে পৌরবাসীর সুবিধা/অসুবিধা কি অর্জিত হবে? পৌরবাসী জানতে চাই!

তিনি আরও লিখেন, পৌর ভবন স্থানান্তর প্রক্রিয়া কোন একটি গোষ্ঠীকে লাভবান করার সুদূরপ্রসারি চক্রান্তের অংশ কিনা? যদি তা না হয় নাফ নদীর তীরে (zero line) কেন জমি পছন্দ করা হচ্ছে? মেয়র এর উচিৎ পৌরবাসীর নিকট এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া। একজন নাগরিক হিসেবে আমি এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দাবি করছি। জনস্বার্থে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করছি।

ওই পোস্টে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে ভুলে ভরা বানানে ২টি মন্তব্য করেন, দেশের আলোচিত/সমালোচিত উখিয়া-টেকনাফ ৪ আসনের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি।

মন্তব্যে তিনি বলেন, টেকনাফ পৌরসভাই কিছু কুকুর আছে গাও গাও করে। কামড় দেয় না। যদি কোন বাপের ব্যাথা থাকে। এবং পৌরসভার জন্য যদি কেহ জমি দান করার মতো দাতা থাকেন। আসেন পৌরসভার মালামাল গাড়ি ঘোড়া রাখার জন্য। 50 শতক জায়গা দান করেন। যে দান করতে পারবে সেখানেই পৌরসভার ভ্রমর নির্মাণ করা হবে।

আরেক মন্তব্যে তিনি লিখেন, বর্তমান পৌরসভার ভবনটি। পুরসভার মূল ভবন হিসেবে থাকবে। সেখানে নয়জন কমিশনারের জন্য নয়টি অফিস, তিনজন মহিলা কমিশনের জন্য একটি অফিস, সচিব ও এক্স এন এর জন্য একটি করে অফিস থাকবে। মেয়র মহোদয়ের অফিস থাকবে। পৌরসভার গাড়ি-ঘোড়া রাখার জন্য একটি গ্রেস দরকার আছে। অগোছালোভাবে গাড়িগুলো রাখার কারণে অনেক গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। সেটা বিবেচনা করে, পৌরসভা কে 50 শতক জায়গা দান করা হচ্ছে। এতে আপনাদের এত চুলকানি কেন। যদি বাপে শুদ্ধ করে জন্মদিয়ে থাকে, গাও গাও না করে পুরসভাকে 50 শতক জায়গা দান করেন।সেখানেই ভবন নির্মাণ করা হবে।

এদিকে, জাইকার অর্থায়নে আধুনিক বহুতল ভবন কাম পৌরসভা অফিস এর জন্য প্রস্তাবিত সাইটের জমির মালিক স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য বদি ১ একর জমি বিনামূল্যে রেজিস্ট্রি দিতে সম্মতি জানালে, পৌরসভার নামে রেজিস্ট্রি নেওয়ার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বলে উল্লেখ করা হলেও অনুপস্থিত ছিলেন তৎকালীন ৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নুরুল বশর নুরশাদ। জনস্বার্থে বদির ১ একর জমি দানের কথা উল্লেখ থাকলেও তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, (২ জুলাই) ২০২৪ তারিখের ১৬৪৩ নং দলিল মূলে আবু মুসা পিতা- আইয়ুব আলী সওদাগর, সাং কায়ুকখালি পাড়া ১ একর জমি পৌরসভাকে দান করেছেন, গ্রহিতা- টেকনাফ পৌরসভার পক্ষে মেয়র।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জমি দাতা আবু মুসা বলেন, পৌর কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে আমাকে জমি দানের জন্য প্রস্তাব করলে আমি রাজি হয়। এখানে অন্য আরেক জনের নাম কেন উল্লেখ করা হয়েছে আমি জানি না, প্রকৃতপক্ষে জমির মালিক আমি, এই জমি বিনা অর্থে দান করেছি।

সর্বোপরি টেকনাফ পৌরভবন স্থানান্তর বিষয়ে সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী, পেশাজীবি, সাবেক এমপি পুত্রসহ সর্বস্তরের জনসাধারণ উদ্বেগ জানিয়েছেন।