হুমায়ূন রশিদ / জসিম উদ্দিন টিপু / মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম / ফরিদুল আলম : সরকারের বিশেষ নির্দেশনায় সারাদেশে সন্ত্রাস ও মাদক বিরোধী অভিযান জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে পরিচালিত হওয়ায় টেকনাফের প্রত্যন্ত এলাকায় মাদকের অপতৎপরতা এবং সন্ত্রাসী কর্মকান্ড কমলেও রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিত্তিক অপতৎপরতা কমেনি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এসব অপরাধ দমনে আইন-শৃংখলা বাহিনী সক্রিয় থাকায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প সমুহের পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি আস্তানায় অবস্থান নেওয়া স্বশস্ত্র গ্রæপ সমুহ বেকায়দায় পড়ে যায়। এসব চিহ্নিত অপরাধীরা তাদের অপকর্মের সম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য নানা ধরনের অপতৎপরতা শুরু করেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্বরত বøক মাঝি এবং পাহারায় নিয়োজিত ভলান্টিয়ারদের বিভিন্ন কৌশলে তাদের আয়ত্বে নিয়ে তাদের অপকর্ম অবাধ করার জন্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তারা বেপরোয়া হয়ে না উঠার পূর্বেই কঠোর হস্তে দমনের দাবী উঠছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়,টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং চাকমারকূলে ২১নং ক্যাম্প, ঊনছিপ্রাং রইক্ষ্যং ২২নং ক্যাম্প, বাহারছড়া শাপলাপুরে ২৩নং ক্যাম্প, লেদা ২৪নং ক্যাম্প, আলীখালী ২৫নং, নয়াপাড়া শাল বাগান ২৬নং এবং দক্ষিণ জাদিমোরা হতে দমদমিয়া নেচার পার্ক পর্যন্ত ২৭নং ক্যাম্পের অবস্থান। এসব ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য পাশর্^বর্তী পাহাড় সমুহে স্বশস্ত্র বিশাল রোহিঙ্গা দূবৃর্ত্ত গ্রæপের অবস্থান। পুরো টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছে কুখ্যাত আব্দুল হাকিম ডাকাত ও তার সহযোগীরা।
বিভিন্ন ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারা জানায়,আমরা নিজ দেশ থেকে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে এদেশে আশ্রয় নিয়ে শান্তিতে থাকতে চাই। কিন্তু এখানে রাতের বেলায় কেউ না থাকায় অস্ত্রধারী ডাকাতেরা তাদের কথা মত চলতে বাধ্য করছে। এর ব্যতিক্রম হলে পরবর্তী সময়ে নিমর্মভাবে খুনের ভয়ে রোহিঙ্গারা তাদের ভয়ে চলে। এসব কারণে তারা নিজ দেশে ফিরতে চাইলেও অবৈধ অস্ত্রধারীদের কারণে মুখ ফুটে কাউকে কিছুই বলতে পারছেনা। এছাড়া ক্যাম্প সমুহের বিভিন্ন সংস্থায় নিয়োজিত মানবতা কর্মীরা দায়িত্ব পালনকালীন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের অবৈধ অস্ত্রের মহড়া দেখে সর্বদা প্রাণনাশের ভয়ে আতংকিত থাকেন। কিন্তু চাকরীর তাগিদে কেউ মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারেনা বলে বিভিন্ন ক্যাম্পের উন্নয়ন কর্মীদের দাবী। পাহাড় থেকে নেমে অপহরণ করে নির্যাতন চালিয়ে এবং অস্ত্রের মুখে সাধারণ রোহিঙ্গাদের জিম্মি করে তাদের অনুসরণ করতে বাধ্য করছে। যার কারণে একাধিকবার স্বদেশ প্রত্যাবাসন পর্যন্ত ব্যাহত হয়।
এসব চক্রকে পরিচালনার জন্য মোটাংকের টাকার দরকার হওয়ায় পাহাড়ে অবস্থানরত অপরাধীরা মাদক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অস্ত্র বেচা-বিক্রি, ভাড়াটে খুনি, অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্য চালিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ পাশর্^বর্তী স্থানীয় বাসিন্দাদের জন-জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। অপরদিকে পাহাড়ে অবস্থানরত স্বশস্ত্র গ্রæপ সমুহকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর আলাদা কোন চেকপোস্ট বা চৌঁিক নেই। তাই অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে যা ইচ্ছে করে বেড়াচ্ছে। এসব রোহিঙ্গা ক্যাম্প সমুহের মধ্যে ২৬নং শাল বাগান ক্যাম্পটি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসের আখড়া বা জনপদে পরিণত হয়েছে। এখানে সাধারণ রোহিঙ্গা, এনজিও কর্মী, আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য কেউ নিরাপদ নন।
এই কারণে আইন-শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর জোরালো অভিযানের মুখে স্বশস্ত্র অপরাধীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তাই তারা নিজেদের অপকর্মের রাজত্ব ধরে রাখার জন্য ক্যাম্প সমুহে নিয়োজিত চেয়ারম্যান, ব্লক মাঝি ও ভলান্টিয়ারদের নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা নেয়।
সর্বশেষ গত ৩ ফেব্রæয়ারী (সোমবার) রাত সাড়ে ৮টারদিকে নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে জকির গ্রæপের এক সদস্যকে জিম্মি করে রাখা, মাদক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, ভাগ-বাটোয়ারা ও আধিপত্য বিস্তারের সুত্রধরে নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পের ডি-ব্লক হতে রোহিঙ্গা ডাকাত সালমান শাহ এবং খাইরুল আমিনের মধ্যে গোলাগুলির সুত্রপাত হয়। এই ঘটনায় সি-ব্লকের এমআরিস নং-৩৭৬৯৮, শেড নং-৮২৬/৫ এর বাসিন্দা বশির আহমদ, এমআরিস নং-২৫৬২০, শেড নং-৮৬৬/৩ এর বাসিন্দা মোঃ জুবায়ের, এমআরিস নং-২১১১২/এ, শেড নং-৮৩০/৫ এর বাসিন্দা মোঃ হোসাইন, এমআরিস নং-৩৫৬৫৫, শেড নং-৮৯৪/২ এর বাসিন্দা মোঃ ফারুক, এমআরিস নং-৬৩২৯৮, শেড নং-৮৯১/২ এর বাসিন্দা মোঃ সোহাগ, শেড নং-৮৫৯/২ এর বাসিন্দা মোঃ সোহেল, এমআরিস নং-০০২২৭, শেড নং-৮১০/৪ এর বাসিন্দা মোঃ করিম, এমআরিস নং-৬৩২৯৮, শেড নং-৮৮৫/৬ এর বাসিন্দা মোঃ শহিদসহ ১৫/১৬জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ ৮ জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এদিকে গত ৪ ফেব্রæয়ারী (মঙ্গলবার) রাতের প্রথম প্রহরে র্যাব-১৫ এর একটি চৌকষ আভিযানিক দল ২৬নং শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডাকাত জকির গ্রæপের অপতৎপরতার খবর পেয়ে অভিযানে গেলে রোহিঙ্গা স্বশস্ত্র গ্রæপের হামলায় র্যাবের ৩জন সদস্য আহত এবং ঘটনাস্থলে শালবাগান ক্যাম্পের ডি-১ ব্লকের মৃত মোঃ শফির পুত্র মোঃ ইলিয়াছ (৪০) গুলিবিদ্ধ হয়। তখনই ঘটনাস্থল তল্লাশী করে ১টি থ্রি-কোয়ার্টার গান, ১টি ওয়ান শুটার গান এবং ৪টি তাঁজা বুলেট উদ্ধার করে। চিকিৎসার জন্য উপজেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গুলিবিদ্ধ ডাকাত সদস্য ইলিয়াছ মারা যায়। উল্লেখ্য, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে মোচনী এলাকায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের গুলিতে দুই র্যা ব সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লাইফ সাপোর্টে ছিল। পরে দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণে বেঁচে যায়।
এখনো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে ডাকাত জকির, ছৈয়দ হোছন ওরফে পুতিয়া, সালমান শাহ, খাইরুল আমিন, কামাল, নুর আলী, আমান উল্লাহ, হামিদ, রাজ্জাক, বুলো ওরফে বুইল্লা, রফিক, মোঃ নুর ওরফে ছোট নুর, নুর কালাম ওরফে সোনা মিয়া, রজক, আলী, ওসমান, শফি আলম, লালু, নুরুল ইসলাম ওরফে নুর সালামের নেতৃত্বে স্বশস্ত্র ডাকাত গ্রæপ অবস্থান করছে। তারা সময় সুযোগে ক্যাম্পে এসে নানা অপতৎপরতা চালিয়ে আইন-শৃংখলার অবনতি করে আসছে। তাদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবী উঠায় উল্টো উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাটে চাপানোর জন্য পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা মাথাচড়া দিয়ে উঠার আগেই প্রয়োজনে কম্বিং অপারেশনসহ কঠোর হাতে দমন করা দরকার।
উপরোক্ত অভিযানে রোহিঙ্গা দূবৃর্ত্ত ইলিয়াছ নিহতের ঘটনায় স্বশস্ত্র ডাকাত দলের টাকা ও কথায় প্ররোচিত হয়ে উল্টো আইন-শৃংখলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে বর্হিবিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার অপচেষ্টা চালাতে শুরু করেছে। যা নিয়ে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে চরম ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
উপরোক্ত বিষয়ে র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ সংবাদ কর্মীদের জানান, যতই দিন গড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা ততই বেপরোয়া হয়ে বিভিন্ন অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা ডাকাত দল সক্রিয় থেকে নানা অপকর্ম করায় অভিযানকালে র্যা ব সদস্যরাও গুলিবিদ্ধ হচ্ছে। রোহিঙ্গা ডাকাত দলকে সহযোগিতাকারি কিছু মাঝিদের নাম পাওয়া গেছে ; তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় লোকজন জানায়,পাহাড়ে অবস্থানকারী দূবৃর্ত্ত হতে সাধারণ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনসাধারণকে নিরাপদ রাখতে হলে কাটা তারের বেড়া নির্মাণের পাশাপাশি বিশেষ নিরাপত্তা চৌঁকি স্থাপন এবং বেপরোয়া চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা সময়ের দাবী। ###
