হুমায়ূন রশিদ : কক্সবাজার র্যাব-১৫ এর আভিযানিক দল অভিযান চালিয়ে টেকনাফের বাহারছড়া পাহাড় কেন্দ্রিক অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় চক্রের মূলহোতা ছালেহ উদ্দিন ওরফে ছালেহ ডাকাতকে তার অন্যতম সহযোগী সোহেল ডাকাতসহ ৬ জনকে পাহাড়ী এলাকা হতে গ্রেফতার করেছে। এসময় বিপুল পরিমাণ দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।
৬মে দুপুর কক্সবাজার র্যাব-১৫ এর কোম্পানী সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়,গত ৫মে রাতে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে টেকনাফের বাহারছড়া পাহাড় এলাকায় র্যাবের অভিযানে টেকনাফের দূর্গম পাহাড় কেন্দ্রিক বিভিন্ন সময়ে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের অন্যতম হোতা নয়াপাড়া রেজিষ্টার্ড ক্যাম্পের ব্লক-ডি,শেড নং-৭৪৯, ১নং রোমের বাসিন্দা মোহাম্মদ শফি ওরফে নাসির উদ্দিনের পুত্র হাফিজুর রহমান ওরফে ছালেহ উদ্দিন প্রকাশ ছলে ডাকাত (৩০), তার সহযোগী নুরুল আলম ওরফে নুরু (৪০), আক্তার কামাল ওরফে সোহেল (৩৭), নুরুল আলম ওরফে লালু (২৪), হারুনুর রশিদ (২৩) এবং রিয়াজ উদ্দিন ওরফে বাপ্পি (১৭) কে গ্রেফতার করে। এসময় ঘটনাস্থল তল্লাশী করে ১টি বিদেশী পিস্তল, ৩টি এসবিবিএল রাইফেল, ২টি ওয়ান শুটার গান, ৬টি দেশীয় তৈরি বন্দুক, ৫রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ১৭ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ৪রাউন্ড খালি কার্তুজ, ২টি ধারালো ছুরি, ৬টি দেশীয় তৈরি দা এবং ৭টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। জিজ্ঞাসাবাদে ছালেহ ডাকাত জানায়, টেকনাফের দূর্গম পাহাড়ে অবস্থান করে সরাসরি তারই নেতৃত্বে এই চক্রটি অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়, মাদক ব্যবসাসহ অন্যান্য অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। তার এই সন্ত্রাসী দলে ১২-১৫জন সদস্য রয়েছে। তার নেতৃত্বে এই সন্ত্রাসী দলটি টেকনাফের শালবাগান পাহাড়, জুম্মাপাড়া ও নেচারি পার্ক, বাহারছড়ার নোয়াখালী পাড়া পাহাড়, বড় ডেইল পাহাড়, কচ্ছপিয়া পাহাড়, জাহাজপুরা পাহাড়, হলবনিয়া পাহাড়, শিলখালী পাহাড় এলাকায় অবস্থান করে অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করত। কখনো অটোরিক্সার চালক, কখনো সিএনজি চালক হিসেবে ছদ্মবেশ ধারণ করে বিভিন্ন কৌশলে তারা হ্নীলা, হোয়াইক্যং, উনচিপ্রাং, শ্যামলাপুর, জাদিমোড়া ও টেকনাফ ইত্যাদি এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের টার্গেট করে অপহরণ পূর্বক মুক্তিপণ আদায় ও ডাকাতি করত।
এই ছলের নেতৃত্বে ২০২২ সালের গত ১৮ ডিসেম্বর বাহারছড়া এলাকা হতে ১০জন কৃষক, চলতি বছরের ২ জানুয়ারী রোহিঙ্গা শরনার্থী রেজুয়ানা, ২৬মার্চ ন্যাচারাল পার্কের দর্শনার্থী হ্নীলার দদমিয়ার বাসিন্দা কবির আহাম্মদের ছেলে রিদুয়ান সবুজ (১৭) ও একই এলাকার বাসিন্দা মাওলানা আবুল কালামের ছেলে নুরুল মোস্তফা (১৬), ১৫এপ্রিল হ্নীলা ফুলের ডেইল এলাকা থেকে বাবুল মেম্বারের ছেলে ফয়সাল (১৭), ৩০ এপ্রিল হামিদুল্লাহ (২৪) এবং ৩মে রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৭ বøক-ই/৬ এ বসবাসরত আবুল কালামসহ অনেক ব্যক্তিকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে ছেড়ে দিত।
অপহৃত ব্যক্তি প্রতিজন হতে ৫-১০লাখ টাকা, ক্ষেত্র বিশেষে তার চেয়ে কম-বেশি মুক্তিপণ আদায় করত। মুক্তিপণের টাকা আদায় করতে অপহৃত ব্যক্তির উপর চালানো হত পৈশাচিক নির্যাতন। প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার কারণে মুক্তিপণের অর্থ প্রদান করে ফেরত আসা অধিকাংশরাই অপহরণকারীদের সম্পর্কে অভিযোগ দিতে বা মুখ খুলতে ভয় পেত। এই সন্ত্রাসী দল কর্তৃক প্রায় অর্ধ-শতাধিক অপহৃত হয়েছে বলে সূত্রে জানা যায়।
গ্রেফতারকৃত ডাকাত ছালেহ উদ্দিন জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানায়, ২০১২সালে সে অবৈধ পথে বাংলাদেশে আসে। পরে ২০১৩ সালে সে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যায় এবং তৎকালীন সময়ে পাশ্ববর্তী দেশ সমূহের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে যোগসাজসে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে সে বাংলাদেশে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে এবং অবৈধভাবে উখিয়া ও কক্সবাজারে অবস্থান করে অবৈধভাবে পাশ্ববর্তী দেশে যাতায়াত ও অপরাধমূলক কার্যক্রম করতে থাকে। এসময় অপহরণ-ডাকাতি, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধ কার্যক্রম করে আসছিল ছালেহ উদ্দিন। ছালেহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ড সংগঠনের জন্য ১২/১৫ জন সদস্য নিয়ে ছালে বাহিনী গঠন করে। সে দুর্গম পাহাড়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান করে অপহরণ, ডাকাতি, ও মাদক চোরাচালান কার্যক্রম পরিচালনা করত। এছাড়াও মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড সহ পার্শ্ববর্তী দেশ সমূহে মানবপাচার করত বলে জানা যায়। ছালেহ ডাকাতের নামে কক্সবাজারের বিভিন্ন থানায় ১০টিসহ আরো একাধিক মামলা থাকায় সে আত্মগোপন থাকে। সে ৫জন সহযোগীসহ গ্রেফতার হলেও তার বিশাল বাহিনীর সদস্যরা এখনো পাহাড়ে অবস্থানে রয়েছে। তাদের দলনেতা আটক হওয়ায় তারা আরো উগ্র হয়ে পাহাড়ের পাদদেশের গ্রামবাসীদের উপর নির্মম নির্যাতন চালাতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার র্যাব-১৫ এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক (ল এন্ড মিডিয়া) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ আবু সালাম চৌধুরী জানান, গ্রেফতারকৃত আসামীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর কার্য্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া ছালেহ ডাকাতের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আসামীদের গ্রেফতারে র্যাবের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ####
