চকরিয়ায় ১১বছর আগে হারিয়ে যাওয়া খালী চেক খালী স্ট্যাম্পে চুক্তিনামা সৃজনে হয়রানির অভিযোগ

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৪ years ago

নিজস্ব প্রতিবেদক : চকরিয়া উপজেলার সাহারবিল ইউনিয়নের কোরালখালী গ্রামে নুরুল কামাল নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১১বছর আগে হারানো পুবালী ব্যাংকের একটি খালী চেক ও জমা রাখা ছয়টি খালী স্ট্যাম্পে চুক্তিনামা সৃজনে আপন চাচাকে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। আর আপন ভাতিজার জালিয়াতির মাধ্যমে সৃজন করা চুক্তিনামার বিপরীতে আইনীভাবে মোকাবেলা করতে গিয়ে শাহ আলম নামের ভুক্তভোগী বর্তমানে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। শনিবার বিকালে চকরিয়া প্রেসক্লাবে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকদের কাছে আপন ভাতিজা নুরুল কামালের জাল-জালিয়াতির লোমহর্ষক ঘটনা তুলে ধরে ভুক্তভোগী কোরালখালী গ্রামের মরহুম মোজাহের আহমদের ছেলে শাহ আলম অযথা হয়রাণি থেকে নিস্তার পেতে প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী শাহ আলম বলেন, আর্থিকভাবে সংকটে পড়ার কারণে ৩ লাখ টাকা নিয়ে ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারী আপন ভাতিজা নুরুল কামালকে দুই শতক জমি বন্ধক দিই। ওইসময় একটি ফেরতনামা কাগজও সৃজন করি। তাতে এক লাখ টাকা লভ্যাংসসহ মোট চার লাখ টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল। এরপর ওইবছরের মার্চ মাসে করোনাকালীণ সময়ে আমাদের পরিবারে কিছু বিষয়ে সমস্যা হলে তা সমাধাণের অংশ হিসেবে বড়ছেলে হিসেবে ভাতিজা নুরুল কামালকে একশত টাকা মুল্যমানের তিনটি খালী স্ট্যাম্প (যার নং কস ৯০৯৯০৭৬, ৭৭ ও ৭৮) জমা দিই। উক্ত স্ট্যাম্পের স্বাক্ষী শাহাদাত হোসেন সোহেল, ফরিদুল আলম, সানজিদ ইসলাম, মোরশেদ আলম, জুনাইদুল ইসলামসহ পাঁচজন।
পরবর্তীতে কিছু দোকানের ব্যাপারে ভাতিজা নুরুল কামালকে আমি এবং ভাই ফরিদুল মিলে আরো তিনটি খালী স্ট্যাম্প জমা দিই। তবে সময় শেষে আমি ও ভাই ফরিদ উল্লেখিত স্ট্যাম্প সমুহ ফেরত চাইলে ভাতিজা নুরুল কামাল কুটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে দিতে অনীহা প্রকাশ করে। এ ঘটনায় স্থানীয় নিকটত্মীয় আবদুর রহিম, বশির আহমদ ও মেম্বার মনজুর আলমকে বিচার দিই। তাদের বিচারে উভয়পক্ষের জবানবন্দি নিয়ে জমা নেওয়া খালী স্ট্যাম্প সমুহ ফেরত দিতে নির্দেশ দেন। তাতেও অভিযুক্ত নুরুল কামাল অনীহা দেখালে সর্বশেষ ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর খালী স্ট্যাম্প সমুহ উদ্ধারে আবেদন জানিয়ে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আদালতে একটি এমআর মামলা (১২৩/২০) দায়ের করি। এতে আদালত নুরুল কামালের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু করেন।
শাহ আলম অভিযোগ করে বলেন, ২০২০ সালে নুরুল কামালের সৃজনকৃত চুক্তিপত্রে দেখানো চেকটি ২০১০ সালে আমার কাছ থেকে হারিয়ে যায়। মুলত উল্লেখিত চেকবইসহ আমার অনেক ডকুমেন্ট সেইসময় ভাতিজা নুরুল কালামের দোকানে রক্ষিত ছিল। কারণ ওইসময় আমি চকরিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করছিলাম। সেই সুবাদে ভাতিজা নুরুল কামাল ছিল আমার নির্বাচনী এজেন্ট। চেক হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আমি জানতে পারি ঢাকায় জরুরী কাজে গিয়ে।
২০১০ সালের ২৭ আগস্ট নুরুল কামালের দোকান থেকে রক্ষিত ব্যাগটি নিয়ে আমি ঢাকা যাই। পরে দেখি ব্যাগের ভেতরে থাকা চেকবইয়ে কয়েকটি পাতা নেই। এসময় জানতে চাইলে ভাতিজা নুরুল কামাল আমাকে বলে চেকের ব্যাপারে আমি কিছুই জানিনা। পরে আমি ভাগিনা আবদুর রহিমসহ গুলশান যাবার পথে গাড়িতে ব্যাগটি হারিয়ে ফেলি। সেখানে চেকবই, আমার ভোটার আইডি কার্ড ও নগদ টাকা ছিল। এ ঘটনায় ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট ঢাকার রমনা থানায় একটি জিডি (নং ২১৩৬) দায়ের করি।
পরে দেখা গেছে, ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারী নুরুল কামালকে দুই শতক জমি বন্ধক দেয়ার সময় বলে আমার কাছে চাচা শাহ আলমের চেক জমা আছে। ওইসময় অভিযুক্ত নুরুল কামাল চকরিয়া আইনজীবি সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট হাবিব উদ্দিন মিন্টু ও আমার ভাই ফরিদুল আলমের সামনে উক্ত ব্যাংক চেক জমা আছে এবং তাদের হাতে ফেরত দেবে বলে স্বীকার করেন। কিন্তু পরবর্তীতে আর তাদের কাছে ফেরত দেয়নি।
এ ঘটনায় আমি চেক ফেরত চেয়ে ২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারী চকরিয়া থানায় একটি এজাহার দায়ের করি নুরুল কামালের বিরুদ্ধে। পরে থানার পরামর্শে চেক উদ্ধারে আইনী সহায়তা চেয়ে ২১ সালের ৯ ফেব্রæয়ারী চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আদালতে একটি মামলা (নং ৩৯/২১) রুজু করি। বর্তমানে মামলাটি চলমান।
ভুক্তভোগী শাহ আলম দাবি করেন, ১১ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া উল্লেখিত চেক নিয়ে নুরুল কামাল কুটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে উল্টো ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রæয়ারী চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে আমার বিরুদ্ধে একটি মামলা (নং ২৮৩/২১) দায়ের করেন। ওই মামলার আর্জিতে বাদি নুরুল কামাল দাবি করেন বিবাদি (শাহ আলম) ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর চেকটি আমাকে দিয়েছেন। অথচ ২০২০ সালের ২২ এপ্রিল সৃজনকৃত বানোয়াট চুক্তিপত্রে বলেছে বিবাদি শাহ আলম উল্লেখিত চেক (নং সি ৮১২২৪২৮ পুবালী ব্যাংক চকরিয়া শাখার হিসাব নং ২১০৬) বাদি কামালকে দিয়েছে।
হয়রাণির শিকার শাহ আলম বলেন, ভাতিজার কাছে আগে জমা দেওয়া আমার (শাহ আলমের) একক তিনটি খালী স্ট্যাম্পসমুহ পুরণ করে লোভের বশবর্তী হয়ে ২০২০ সালের ২২ এপ্রিল ৪০ শতক জমি বিক্রি বাবত ৫০ লাখ টাকা গ্রহণ করেছে মর্মে উল্লেখ করে আমার অগোচরে তাঁর মনোনীত উকিলের মাধ্যমে একটি ভিত্তিহীন চুক্তিনামা সম্পাদন করে। এতে ৫০ লাখ টাকার চেক প্রদান করা হয়েছে উল্লেখ্য করলেও অথচ নোটারীকারী আইনজীবি দিদারুল ইসলাম সহকারি পুলিশ সুপার (চকরিয়া সার্কেল) কতৃক নিযুক্ত তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বলেছে, নোটারীকালে দাতা শাহ আলম উপস্থিত ছিলনা। এতে প্রমাণিত হয় ওই চুক্তিনামাটি অবৈধ।
পাশাপাশি ২০২০ সালের ৩০ মে তারিখে পৈত্রিক কিছু জমিজমা ভাইপোদের বন্টন করে দেয়ার আশ^াসে আমি (শাহ আলম) ও ভাই ফরিদুল আলমের স্বাক্ষরে একশ টাকা মুল্যমানের আরো তিনটি খালী স্ট্যাম্প (যার নং কস ৮৯২০৩৩৯, ৪০ ও ৪১ জমা দিই ভাতিজা নুরুল কামালকে। সেই খালী স্ট্যাম্পের একটি বদল করে নতুন একটি স্ট্যাম্প (যার নং ৮৯২৪৩৩২) সংযুক্ত সেখানে ১ থেকে ১১ জনকে গ্রহিতা সাজিয়ে ১৫ লাখ টাকা গ্রহণ করেছি মর্মে লিখে ২০২০ সালের ২২ এপ্রিল একটি জমি হস্তান্তরনামা তৈরী করেন। অথচ সেখানে গ্রহিতা দেখানো কামরুল, জয়নাল , আহকাম, শাহেদ গংকে জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা উল্লেখিত হস্তান্তরনামা করেননি বলেও আমার কাছে স্বীকার করেন।
ভুক্তভোগী শাহ আলম সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়ে বলেন, মুলত আমার জমি ও দোকানঘর অবৈধভাবে জবরদখলের কুমানষে অভিযুক্ত ভাতিজা নুরুল কামাল ১১ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ব্যাংক চেকটি ব্যবহার করে ৫০ লাখ টাকার সাজানো চুক্তিপত্র সৃজন ও পৈত্রিক সমস্যা নিরসনকল্পে জমা দেওয়া ছয়টি খালী স্ট্যাম্প পুরণ করে আমাকে হয়রাণির চেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ সহকারি পুলিশ সুপার কতৃক নিযুক্ত তদন্ত কর্মকর্তার তদন্তে এসব জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। তবে তদন্তে আমার বিরুদ্ধে চুক্তি ও চেকের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ আনা হলেও তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখিত চেক ও চুক্তিপত্র কোথা থেকে আসলো তা উল্লেখ্য করেনি বলে দাবি করেন ভুক্তভোগী শাহ আলম। এই অবস্থায় অনেকটা নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগী শাহ আলম সর্বশেষ ২০২১ সালের ৪ মে চেক জালিয়াতি ও খালী স্ট্যাম্পসমুহ উদ্ধারে আবেদন জানিয়ে চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে নতুন একটি মামলা (নং ৫৪০/২১) দায়ের করেছেন অভিযুক্ত নুরুল কামালের বিরুদ্ধে। বর্তমানে মামলাটি কক্সবাজার সিআইডি পুলিশ তদন্ত করছেন বলে জানিয়েছেন বাদি শাহ আলম।
অভিযোগে শাহ আলম আরও বলেন, অভিযুক্ত নুরুল কামাল ৮-১০বছর আগে চকরিয়া উপজেলায় ইউনিপেটু নামের একটি প্রতারণা কোম্পানীর মাধ্যমে জনগনের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। প্রশাসনের যে সংস্থা তাঁর ব্যাংক একাউন্ট তদন্ত করলে অভিযোগের সত্যতা পাবে। পাশাপাশি তিনি জালিয়াতির মাধ্যমে সৃজন করা চুক্তিপত্রের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণপুর্বক অযথা হয়রাণি থেকে রক্ষা পেতে আদালতের বিজ্ঞ বিচারক ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তান এবং চকরিয়া থানার ওসিসহ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। ##