শাহীন হাসনাত : কোরআনে কারিমে চক্ষু শীতলকারী সন্তান লাভের দোয়া শেখানো হয়েছে এবং যারা উত্তম স্ত্রী ও সুসন্তান লাভের দোয়া করে, তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা বলে, হে আমাদের প্রভু! আমাদের চক্ষু শীতলকারী স্ত্রী ও সন্তান দান করুন। আমাদের আল্লাহভীরু মানুষের নেতা নির্বাচিত করুন।’সুরা ফুরকান: ৭৪
কোরআনে সন্তানকে মানবজীবনের সৌন্দর্য বলা হয়েছে। সুসন্তান শুধু পার্থিব জীবনের সম্পদ নয়, পরকালীন জীবনেও তারা হবে কল্যাণের বাহক। সুতরাং সন্তানের প্রতিপালনে পিতা-মাতার দায়িত্ব ও ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের সুশিক্ষা ও যথাযথ প্রতিপালনের অভাবে অনেক পরিবারকে বিপন্ন হতে দেখা যায়। কোরআনে এ ব্যাপারে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের সম্পদ ও সন্তান ফেতনাস্বরূপ। আর আল্লাহর কাছে রয়েছে উত্তম প্রতিদান।’সুরা তাগাবুন: ১৫
বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মুমিনের জন্য তার অর্থ-সম্পদ, পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্তুতি পরীক্ষার বিষয়। কারণ এসবের ভালোবাসা মানুষকে যেমন ইমান ও আনুগত্যের পথ থেকে ফিরিয়ে রাখে তেমনি সন্তান-সন্ততি সুশিক্ষিত না হলে তা হয় দুনিয়া ও আখেরাতে লাঞ্ছনার কারণ। সন্তানের কর্মকা-ের জন্য বাবা-মাকে নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বর্তমান সময়ের কিশোর অপরাধের লাগামহীন দৌরাত্ম্য দেখে এ বিষয়ে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।
কিশোর অপরাধ আগেও ছিল, এখনো আছে। তবে দিন যত যাচ্ছে, তাদের অপরাধগুলো ক্রমেই নৃশংস ও বিভীষিকাপূর্ণরূপে দেখা দিচ্ছে। পরবর্তী প্রজন্মকে রক্ষার লক্ষ্যে এখনই এসবের লাগাম টেনে ধরা দরকার, না হলে ভবিষ্যতে এটি খুব ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সমাজ ব্যবস্থার বৈষম্য, পরিবারের লোকদের খোঁজ-খবর না রাখা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বহুমাত্রিক সাহচর্যসহ নানাবিধ উপকরণ কিশোর অপরাধীদের সংঘবদ্ধ হওয়ার উপাদান হিসেবে কাজ করে। এছাড়া উচ্চবিত্তের জীবনযাত্রা দেখে হতাশা, অস্ত্র ও মাদকের সহজলভ্যতা, সমাজে বিদ্যমান এক গ্যাং দেখে নিজে গ্যাং সদস্য হতে উৎসাহী হওয়া, অনুকরণপ্রবণতা এবং পারিবারিক পরিবেশ অনেক সময় এ জাতীয় সমস্যার পেছনে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখে। এমনও দেখা গেছে, পিতা-মাতা আদর্শবান হতে ব্যর্থ হলে অথবা পিতা-মাতার অদক্ষতা, বেকারত্ব কিংবা সংসার বিরাগী মনোভাব সন্তানদের মাঝে গ্যাং সদস্য হওয়ার প্রবণতা তৈরি করে দিতে পারে। কখনো কখনো কর্মজীবী কিংবা ব্যবসায়ী পিতা-মাতার পক্ষে সন্তানকে সময় দেওয়া দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে গ্যাং তৈরির মধ্য দিয়ে সন্তান একাকিত্ব ও হতাশা দূর করার চেষ্টা করে। পারিবারিক বিশৃঙ্খলা, ডিভোর্স ও একাধিক বিয়ে সন্তানদের মাঝে হতাশা তৈরি করে, এটাও গ্যাং তৈরির কারণ।
দুর্বল ছাত্রদের মাঝে গ্যাং গড়ার প্রবণতা থাকে। খারাপ ফলাফলের দরুন শিক্ষকের বঞ্চনা, সহপাঠীদের বিদ্রুপ থেকে গ্যাংয়ে যোগদানের প্রবণতা তৈরি হয়। এছাড়া স্কুলের পাঠদান প্রক্রিয়া কোনো কারণে ব্যাহত হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা জাগ্রত হয়। কিশোর অপরাধে জড়িত হওয়ার আরও কারণের মধ্যে রয়েছে, ব্যক্তি পর্যায়ে অপরাধে যুক্ত হওয়ার মানসিকতা, দুর্বল চিত্তের ব্যক্তিত্ব, হিরোইজম দেখানোর প্রবণতা ও অনুকরণপ্রবণতা ইত্যাদি।
ভাবনার বিষয় হলো, কিশোর অপরাধীরা খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদকসেবন ও বিক্রি, নিজেদের মধ্যে মারামারি, ইভটিজিং, অপহরণ, ধর্ষণসহ ৭-৮ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের অপরাধ সম্পর্কে অভিভাবক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বেশিরভাগ সময় টের পাচ্ছেন না। ফলে অপরাধমূলক নানা ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কিশোর অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পর আফসোস আর চমকিত হওয়া সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমতাবস্থায় সমাজ বিজ্ঞানীরা কিশোর অপরাধ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ বেশি জরুরি বলে মনে করছেন। তাদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়, চূড়ান্ত দাওয়াই হচ্ছে অভিভাবকদের সচেতনতা।
প্রত্যেক মা-বাবাকে সন্তান সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে, সে বিষয়ে মা-বাবাকে খেয়াল রাখতে হবে। অস্বাভাবিক কিছু নজরে এলে তাকে বোঝাতে হবে। দিনে একবার হলেও পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে বসে খাবার খেতে হবে। ভালো হয় একসঙ্গে নামাজ ও দিনের নির্দিষ্ট একটি সময় ধর্মীয় কোনো বইয়ের তালিমের ব্যবস্থা করলে। এর ফলে সন্তানের সঙ্গে বাবা-মার ভাবের আদান-প্রদান হয়, তাদের আচার-আচরণ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ মেলে, সন্তানদের চাহিদা সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব মতে, বাংলাদেশে গড়ে প্রতি বছর কমপক্ষে দুই হাজার শিশুকে নানা ‘অপরাধে’ আটক করা হয়। আটক এই শিশুদের জন্য গভীরভাবে ভাবতে হবে। কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র বা জেলখানা নয়, তাদের সত্যিকার অর্থে পারিবারিক পরিবেশে সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘মুমিনরা! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোর স্বভাব ফেরেশতারা। তারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয় তাই করে।’ সুরা আত তাহরিম: ৬
বর্ণিত আয়াতে মুমিন-মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো। মুফাসসিরদের মতে, আল্লাহর আজাব থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য চেষ্টা চালানোর মধ্যেই কোনো মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য সীমাবদ্ধ নয়। বরং যে পরিবারের কর্তা তার কাঁধে এ দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, তার পরিবারের সদস্যরা যাতে আল্লাহর প্রিয় মানুষরূপে গড়ে উঠতে পারে সে জন্য সাধ্যমতো শিক্ষা দেওয়া তার কাজ। এ বিষয়ে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্ত লোকদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। শাসকও দায়িত্বশীল, তাকে তার অধীনস্ত লোকদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। নারী তার স্বামীর বাড়ি এবং তার সন্তান-সন্ততির তত্ত্বাবধায়ক, তাকে তাদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।’ সহিহ বোখারি: ৮৯৩
লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক
