টেকনাফ টুডে ডেস্ক : দক্ষিণ আফ্রিকায় গত সপ্তাহে শনাক্ত হওয়া করোনার নতুন ধরনটির বিস্তার রোধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে নতুন ভ্যারিয়েন্টকে উদ্বেগজনক বলে আখ্যায়িত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। শুক্রবার এক জরুরি বৈঠক শেষে করোনাভাইরাসের এ নতুন ধরনটিকে ‘ওমিক্রন’ নাম দিয়েছে ডব্লিউএইচও। ওমিক্রনে আক্রান্তের সংখ্যা এখনো খুব বেশি না হলেও ইতোমধ্যেই দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়াও বতসোয়ানা, ইসরায়েল, হংকং ও বেলজিয়ামে এই ধরনটিতে সংক্রমিত রোগীর সন্ধান মিলেছে। ইউরোপীয় দেশগুলোসহ পশ্চিমা বিশ^ ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা বিভাগের প্রধান চিকিৎসা পরামর্শক করোনার নতুন এ ধরনকে ‘ভয়াবহ’ ও ‘এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে খারাপ ধরন’ বলে বর্ণনা করেছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ওমিক্রনের স্পাইক প্রোটিনে ৩০টির বেশি মিউটেশন রয়েছে। অতি সংক্রামক ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় এই সংখ্যাট দ্বিগুণেরও বেশি। জিনগত এ রূপ বদলের বিষয়টির ওপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞানীদের পূর্বানুমান, এ ধরনটি আরও বেশি মাত্রায় সংক্রমণ ঘটাতে পারে এবং এর আগে অন্য ধরনের কারণে যাদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি হয়েছে তারাও আবার আক্রান্ত হতে পারেন। ওমিক্রনের উৎস দক্ষিণ আফ্রিকায় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি দেশটিতে যাতায়াতকারীদের জন্য কোয়ারেন্টাইনের বিধিনিষেধ আরোপ করতে শুরু করেছে বিভিন্ন দেশ। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও জাপান কোয়ারেন্টাইন জোরদারের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা ও আশপাশের দেশগুলো থেকে ফ্লাইট নিষিদ্ধ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের জোটভুক্ত সব দেশেই দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ওই অঞ্চলের সঙ্গে ফ্লাইট চলাচল বন্ধের প্রস্তাব করেছে। গত ১৪ দিনে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলো ভ্রমণ করে আসা ব্যক্তিদের ওপর ইতালিতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভাইরাসের ‘নিউ ভ্যারিয়েন্ট এরিয়া’ ঘোষণা করছে জার্মানি। এদিকে, প্রতিবেশী ভারতও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের পরীক্ষা ও নজরদারিতে রাখতে রাজ্য সরকারগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে সিঙ্গাপুর ও জাপানও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আরও পাঁচটি আফ্রিকান দেশ থেকে ভ্রমণকারীদের জন্য সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের এখন কী ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি সেসব করণীয় নির্ধারণে কাজ শুরু করা জরুরি। আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন শুক্রবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, নজরদারি বাড়াতে দেশে প্রবেশের সব পথে জনস্বাস্থ্য বিভাগের জনবল বাড়াতে হবে। এছাড়া প্রত্যেকটা কেসের জিনোম সিকোয়েন্স করা দরকার। এটা ছাড়া নতুন ভ্যারিয়েন্ট ধরা যাবে না। তবে, দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন ধরন নিয়ে বাংলাদেশে এখনই অত বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বলে মনে করছেন আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। দেশের ভাইরাসের সিকোয়েন্স করছি। আমাদের এ অঞ্চলে এখনো এই রকম কিছু পাওয়া যায়নি।’ অবশ্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, ওমিক্রনের বিস্তার রোধে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ স্থগিত করা হচ্ছে। এছাড়া সতর্কতার জন্য সব বিমানবন্দর, স্থলবন্দরসহ দেশের সব প্রবেশপথে স্ক্রিনিং আরও জোরদার করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
লক্ষ করা দরকার করোনার ডেল্টা ধরনের দাপটে ইউরোপের দেশগুলোতে এখন গণসংক্রমণের চতুর্থ ঢেউ চলছে। এর মধ্যেই শনাক্ত হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার ওমিক্রন ধরনটি। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর যোগাযোগ বেশি হওয়ায় সেখানে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই কারণে প্রতিবেশী ভারতে ওমিক্রন ধরনের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাশর্^বর্তী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের যাতায়াত-যোগাযোগ বেশি। এই অবস্থায় ভারতের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে স্থলপথের যাতায়াত বেশি হওয়ায় বাংলাদেশেও এখনই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। সতর্কতা দরকার আকাশপথেও। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, কোনোভাবেই স্ক্রিনিং ছাড়া যেন কোনো ব্যক্তি দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের এখনই সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। তারা বলছেন, এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতার অন্যতম কারণ হলো দেশে এখনো টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে সম্পন্ন না হওয়া। এই সময়েই দেশে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি খুবই খারাপ হতে পারে। কারণ বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে টিকার কার্যকারিতা মাত্র ২৫ শতাংশ। সাম্প্রতিক ডেল্টা ধরনের বিরুদ্ধে টিকার কার্যকারিতা ছিল ৪০ শতাংশ। স্মরণ করা যেতে পারে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টর বিস্তার রোধে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধের ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রায় একমাস সেটা ঠেকিয়ে রাখা গিয়েছিল। এমতাবস্থায়, করোনা মহামারী মোকাবিলার বিগত দিনের অভিজ্ঞতাগুলোর পর্যালোচনা সাপেক্ষে বর্তমান করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে প্রশাসন যাতে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে গণটিকাকরণের কর্মসূচি দ্রুত ও সফলভাবে সম্পন্ন করার ওপরও জোর দিতে হবে। পাশাপাশি এই শীতকালে সারা দেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপরও গুরুত্বারোপ করা দরকার।
