কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া : উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন বনাঞ্চলের, ফসলি জমিতে ও লোকালয়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে গড়ে উঠা ইটভাটা গুলো বর্ষাকালে ঝিমিয়ে থাকলেও তৎপর হয়ে উঠে সুষ্ক মৌসুমে। প্রতি বছরের ন্যায় চলতি মৌসুমেও এসব ইটভাটা গুলোতে চলছে পরিবেশ বিধ্বংশি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। ইট পুড়ানো কালো ধোঁয়ায় এলাকার পরিবেশ দুষিত হলেও দেখার কেউ নেই। ফসলি জমি ও পাহাড় কাটা মাটি দিয়ে ইট তৈরী হচ্ছে বন সম্পদ পুড়িয়ে। বিশেষ করে লোকালয়ে গড়ে উঠা ইটভাটার কারনে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও মাদ্রাসা পড়–য়া ছাত্র/ছাত্রী সহ বয়োবৃদ্ধরা বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অবৈধ ইটভাটা বন্ধে এলাকাবাসি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করলেও ইটভাটা মালিকের কালো টাকার জোরে তা ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক সাইফুল আশরাফ জানান, সংশোধিত আইনে সংযোজিত পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধূনিক প্রযুক্তির ইট ভাটা অর্থাৎ জিগজাগ কিলন, টানেল কিলন বা অনুরূপ উন্নততর প্রযুক্তিতে ইট ভাটা স্থাপন করতে হবে। কৃষি জমি বা পাহাড় বা ঢিলা থেকে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে ইটের কাচাঁমাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে ইট তৈরি করার জন্য মজা পুকুর, খালবিল, নদনদী, চরাঞ্চল বা পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ করা যাবে না। মাটির ব্যবহার কমানোর জন্য কমপক্ষে ৫০ শতাংশ ফাঁপা ইট তৈরি করতে হবে। নির্ধারিত মান মাত্রায় কয়লা ব্যবহার করতে হবে। যেসব জায়গায় ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না সেগুলো হচ্ছে উপজেলা সদর, সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য বাগান বা কৃষি জমি, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা, নিষিদ্ধ এলাকার সীমা রেখা থেকে নূন্যতম ১ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে ইট ভাটা করা যাবে না। উখিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকা আজুখাইয়া ঘুরে স্থানীয় গ্রামবাসির সাথে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় প্রভাবশালী গুরা চাঁন মেম্বারের ছেলে আবুল কালাম চৌধুরী গত ৩বছর ধরে লোকালয়ে একটি অবৈধ ইটভাটা গড়ে তুলেছে। বোল্ড ড্রেজার ব্যবহার করে পাহাড় কাটা মাটি ও ডাম্পার গাড়ী দিয়ে ফসলি জমির মাটি বিশাল আকার স্তুপ করে রেখেছে বর্ষাকালীন সময়ে। সরজমিন ওই ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায়, হাজার হাজার মণ কাঁচা লাকড়ি মজুদ রাখা হয়েছে ইটভাটায় জ¦ালানী হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। এব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে ইটভাটা মালিক আবুল কালাম চৌধুরী জানান, তার নিজস্ব বাগানের গাছ কেটে লাকড়ি মজুদ রাখা হয়েছে। ইটভাটার বৈধতা আছে কিনা জানতে চাওয়া হলে সে জানায় ঘুমধুম ইউপি চেয়ারম্যান একে জাহাঙ্গীর আজিজ এই ইটভাটার সাথে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সাংবাদিকদের প্রতি তার উদ্যতপূর্ণ আচরণ দেখে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা হতভাগ হয়ে পড়ে। বিষয়টি ঘুমধুমের চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হলে তিনি বলেন, ওই ইটভাটার সাথে তার কোন সম্পৃক্ততা নেই। তবে মাঝে মধ্যে রাস্তা সংস্কারের জন্য ২/৩গাড়ী ইট সরবরাহ দিয়ে থাকেন। এ জন্য সে তার নাম ব্যবহার করছে। পাশের চাইল্যাতলি নামক আরো একটি ইটভাটা দিয়ে দেখা যায়, কয়েক মণ কয়লা ইটভাটার সামনে মজুদ রাখা হয়েছে। ইটভাটার পাশে গিয়ে দেখা যায় হাজার হাজার মণ কাঁচা লাকড়ি। এসময় কয়েকজন শ্রমিক জানান, সামাজিক বনায়নের গাছ ক্রয় করে লাকড়ি যোগান দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিক মাঝির সাথে কথা বলে জানা গেছে, উখিয়া ফলিয়াপাড়া গ্রামের ইসহাক সওদাগরের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৬সালের শেষে দিকে এ ইটভাটায় লাকড়ির যোগান দিতে গিয়ে ২টি রোহিঙ্গা শিশু অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী আমির হোসেন, ইয়াকুব আলী সহ বেশ কয়েকজন গ্রামবাসি জানান, তৎকালীন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু শাফায়েত মুহাম্মদ সাহেদুল ইসলাম উক্ত ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে ইটভাটা মালিককে ৪লক্ষ টাকা জরিমানা করে ইটভাটা সীলগালা করে দেয়। এসময় ভালুকিয়া পাতাবাড়ী এলাকায় প্রতিষ্টিত প্রদীপ বড়–য়ার মালিকানাধীন ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে উখিয়া উপজেলার তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ৪লক্ষ কাঁচা ইট জব্ধ করেন। এবং ইটভাটার সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। ওই ইটভাটার মালিক প্রদীপ বড়–য়া তার ইটভাটা পুর্বের স্থান থেকে স্থানান্তরিত করে বর্তমানে রেজু আমতলি এলাকায় বিশাল পাহাড়ী এলাকা দখল করে নির্বিচারে পাহাড় কেটে বিরান ভূমিতে পরিনত করেছে। এছাড়াও হলদিয়াপালং ইউনিয়নের মরিচ্যা পাগলির বিল ১০একর ফসলি জমির উপর গড়ে তোলা হয়েছে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে মান্দাতার আমলের আদলে তৈরী ইটভাটা। তার একটু পূর্ব দিকে পাতাবাড়ী বাজারের দক্ষিণে গড়ে উঠা ইটভাটা থেকে কালো ধোঁয়া উঠছে। ছোট ছোট যান বাহনে করে নেওয়া হচ্ছে লাকড়ি। জানতে চাওয়া হলে স্থানীয়রা বলেন, এটা সরওয়ার বাদশার নিয়ন্ত্রণাধীন ইটভাটার মূল মালিক রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের নুরুল হক। তার সাথে যোগাযোগ করা হলে সে এব্যাপারে লেখালেখি না করার জন্য অনুরোধ করেন। তার আরো একটু উত্তরে পাহাড়ের ভিতর গিয়ে দেখা যায়, আরো একটি ইটভাটায় পাহাড়সম লাকড়ির স্তুপ। এসময় লাকড়ি সহ ইটভাটার ছবি ধারণ করতে গেলে সংবাদকর্মীদের বাধা দেওয়া চেষ্টা করে ইটভাটার কতিপয় কর্মচারী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন গ্রামবাসির জানান, ফজল করিম মেম্বারের মালিকানাধীন এ ইটভাটায় জ¦ালানী ও ইট সরবরাহ করতে ভারী যানবাহন আসা-যাওয়া করায় গ্রামীন যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। উক্ত ইটভাটার সামান্য অদুরে বিশাল আকার ফসলি জমিতে গড়ে তুলা হয়েছে আরো একটি ইটভাটা। ওই ইটভাটার অফিস কক্ষে গিয়ে ইটভাটা মালিকের নাম জানতে চাওয়া হলে কর্তৃব্যরত ম্যানেজার তেলে বেগুনে জ¦লে উঠে মারমূখী হয়ে উঠেন। পরে মুঠোফোন থেকে ওই ম্যানেজারের কাছে মূল মালিকের সাথে কথা হয়। পরে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ম্যানেজার নমনীয় হয়ে সংবাদকর্মীদের আপ্যায়নের অনুরোধ করেন। এভাবে উপজেলার বিভিন্ন জনগুরুত্ব পূর্ণ স্থানে, লোকালয়ে, ফসলি জমিতে ও বনভূমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় ১২ টি ইটভাটা। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নিকারুজ্জামান জানান, উখিয়ায় যে সমস্ত ইটভাটা রয়েছে ওই সমস্ত ইট ভাটা গুলোর বৈধতা আছে কিনা এবং যেসব এলাকায় ইটভাটা গুলো প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে ওই সব এলাকার পরিবেশ ইট ভাটা নীতিমালার বর্হিভুত কিনা তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
