“ইসলামেই মানবাধিকারের পরিপূর্ণতা”

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৭ years ago

আব্দুর রহমান হাশেমী : মানুষের সহজাত অধিকারই মানবাধিকার বলে বিবেচিত। কিন্তু নির্মম পরিহাস যে, পরিপূর্ণ মানবাধিকার নিয়ে বাঁচার সুযোগ মানুষ পায়নি। তারই প্রেক্ষিতে মানুষকে তার অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সুদীর্ঘ সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়েছে ও হচ্ছে। কিন্তু মানবাধিকারের সর্বপ্রথম কথা ইসলামের নবী মুহাম্মদ (স) এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ঘোষনা করেন। “মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা এবং মানুষকে সর্বোত্তম আদর্শরূপে সৃষ্টি করা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ হল আশরাফুল মাখলুকাত —সৃষ্টির সেরা।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার দৃষ্টান্ত যেমনি আছে, তেমনি মানবাধিকার ভূ-লুন্ঠনের দৃষ্টান্ত প্রায় সর্বত্রে দৃশ্যত।

বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৭’শ কোটি মানুষের প্রায় অর্ধেক মানবাধিকার জনিত সমস্যায় আক্রান্ত! সন্ত্রাস ও শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে কোটি কোটি মানুষ মানবেতর জীবন-যাপনে বাধ্য হচ্ছে।
বিভিন্ন রাষ্ট্রে স্বাধীনতাকামীদের বিরুদ্ধে চালিত গণহত্যা ও ধর্ষন, ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যা, নির্যাতন ও ধমন-পীড়ন ইত্যাদি সহ আরো বহু মানবাধিকার লঙ্ঘনের জীবন্ত প্রমান হয়ে আছে।

হযরত মুহাম্মদ (স) কতৃক নগর ভিত্তিক মদিনার ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের পূর্বে পৃথিবীর ইতিহাসে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে অনুপস্থিত।
রাসুলুল্লাহ (স) এর বিদায় হজ্জ্বের ভাষন মানবাধিকারের সর্বোত্তম দলিল।
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অাল্লাহর নির্দেশনায় ইসলামের নবী (স) যেসব দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন অাজ অামরা তারই কয়েকটি মাত্র সংক্ষিপ্তাকারে উপস্হাপন করার চেষ্টা করব..

১) জীবনের নিরাপত্তা লাভের অধিকার:
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “যার হত্যাকে আল্লাহ তায়ালা হারাম করেছেন, তাকে যথার্থ কারণ ছাড়া হত্যা করনা”(বনী ইসরাইল-৩৩)

রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, “আল্লাহর কাছে একজন মুমিনকে হত্যা করার চাইতে সমগ্র বিশ্বকে ধ্বংস করে দেয়া বড় অপরাধ” (তিরমিযি, নাসাঈী, ইবনে মাজাহ)

তিনি আরো বলেন, “যদি আকাশ ও জমিনের সকল অধিবাসী সম্মিলিত ভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করে তবে,আল্লাহ-তায়ালা সবাইকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন”( তিরমিযি)

ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমরাও জীবনের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করেছিল।
রাসুলুল্লাহ (স) ঘোষনা দিয়ে বলেছিলেন “যে ব্যক্তি তার দেশের কোন অমুসলিম ব্যক্তিকে হত্যা করবে সে জান্নাতের ঘ্রানও পাবেনা, আর জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দীর্ঘ পথ থেকেও পাওয়া যায়” (বুখারি)

২) সম্পদ অর্জন ও রক্ষার অধিকার:
ইসলাম মানুষকে এমন এক মানবাধিকারের সফল দৃষ্টান্তের সাক্ষী রেখেছেন রাসুল (স) এর পরবর্তি ৪’শত বছরে মাত্র ৪’টি চুরির ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল!!!
যা,পৃথিবীর ইতিহাসে মহা বিষ্ময়ের

কুরআন বলছে, “পুরুষ-নারী যে যা আয় করবে, সে-ই তার মালিক হবে”( নিসা-৩২)
রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, “শ্রমিকের ঘাম শুকাবার পূর্বেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও”
ইসলামের যুগে দুর্নীতির লেস মাত্রও ছিলনা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা অবৈধপন্থায় একে অপরের ধন-সম্পদ ভক্ষন করনা” (বাকারা-১৮৮)
রাসুলুল্লাহ (স) বলেন, “সাবধান! জুলুম করোনা। মনে রেখ, কারো পক্ষে অন্যের সম্পদ তার সন্তুষ্টি ব্যতীত গ্রহন করা বৈধনা” (বুখারি)

৩) বঞ্চিত ও অক্ষমদের অধিকার:
সক্ষম মানুষ সম্পদ অর্জন ও রক্ষা করবে, কিন্তু বঞ্চিত ও অক্ষমদের সে সামর্থ থাকেনা। তাই ইসলাম ভারসাম্যপূর্ন ও পূর্ণ মানবাধিকারের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্হাপনায় অক্ষমদের অন্ন-বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছেন।
কুরঅান বলছে, “তাদের ধন-সম্পদে সাহার্য্যপ্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে” (যারিয়াত-১৯)

৪) সম্মানের নিরাপত্তার অধিকার:
কোন মানুষের সম্মান বিনষ্ট করার অধিকার অন্য কোন মানুষের নেই।
রাসুল (স) বলেন “কোন মুসলমানের সম্মানের ওপর অযথা ও অন্যায় অাক্রমন খুবই নিকৃষ্ট ধরনের বাড়াবাড়ি” (আবু দাউদ)
কুরআন বলছে “হে মুমিনগন! কোন পুরুষ যেন অন্য কোন পুরুষের উপহাস না করে, কেননা সে উপহাসকারীর তুলনায় উত্তম হতে পারে। এবং কোন নারী যেন অপর কোন নারীর উপহাস না করে, কেননা সে উপহাসকারীর তুলনায় উত্তম হতে পারে…তোমরা দোষ খুঁজে বেড়িয়োনা, আর তোমাদের কেউ যেন গীবত না করে” (হুজরাত:১১-১২)
উপরোক্ত প্রেক্ষিতে বলা যায়, কারো সম্মান যেন নষ্ট না হয়, তাই নিম্মোক্ত কাজ গুলো হতে বিরত থাকতে হবে।
– কাউকে ঠাট্টা ও উপহাস না করা।
– কাউকে দোষারোপ না করা।
– কাউকে তাচ্ছিল্য করে পীড়াদায়ক নামে না ডাকা।
– কারো দোষ অনুসন্ধান না করা।
– গীবত না করা।

৫) ধর্ম পালনের অধিকার:
মহান আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলাম, কিন্তু অপরাপর ধর্মাবলম্বীদের জন্যেও ধর্ম পালনের অধিকারও সুনিশ্চিত করেছে ইসলাম।
কুরআন বলছে-“আমি মানুষকে জীবন-পথ দেখিয়েছি, এখন সে কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবেও জীবন-যাপন করতে পারেন অথবা অকৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবেও “(দাহর:৩)
অন্য আয়াতে বলছেন- “জীবন ব্যবস্থা (দ্বীন) গ্রহনে কোন জবরদস্তি নেই”( বাকারাহ:২৫৬)

৬) বাক-স্বাধীনতা:
ইসলাম রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন কতৃপক্ষকে রাষ্ট্রের বিশৃঙ্খলা দমনে নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনি জনগনকে রাষ্ট্রের নির্যাতন ও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর হুকুম দিয়েছেন।
কুরআন বলছে-“আল্লাহ খারাপ কথা প্রকাশ পছন্দ করেন না, তবে মজলুম কতৃক জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ পছন্দ করেন” (নিসা:১৪৮)

বাক-স্বাধীনতার দৃষ্টান্ত স্হাপনে রাসুলুল্লাহ(স) এর হাদিসদ্বয়-“অত্যাচারি শাসকের সামনে সত্য কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ”(আবু দাউদ)
অন্য হাদিসে-“যে সত্য কথা বলা হতে চুপ থাকে সে বোবা শয়তান”
৭) সুবিচার লাভের অধিকার:
ন্যায় বিচার বা সুবিচার লাভের অধিকার মানবাধিকারের অন্যতম।
সমাজে পূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের মুল লক্ষ্য হলো সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা।
আল্লাহ-তায়ালা বলেন-” হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, অাল্লাহর জন্যে ন্যায় সঙ্গত সাক্ষ দান করো, তাতে তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতার বা নিকটাত্মীয় স্বজনের যদি ক্ষতিও হয় তবুও”( নিসা: ১৩৫)
ইসলামের নবী মুহাম্মদ (স) সমাজ ও রাষ্ট্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত রেখে ছিলেন।
আর ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারীদের জন্যে মহা সুসংবাদও দিয়ে গেছেন- “কেয়ামতের দিন সাত শ্রেণীর মানুষ আরশে’র ছায়ার নিচে স্হান পাবে, তন্মধ্যে অন্যতম হল ন্যায়-পরায়ণ শাসক” (বুখারি-মুসলিম)

তিনি আরো বলেন -কোন শাসনকর্তা একদিনের ন্যায় ও সুবিচারের রাজ্য শাসন করা একাধারে ৬০ বছর যাবত লাগাতর আল্লাহর ইবাদাত করা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট “(কিমিয়ায়ে সা’আদাত)

এছাড়াও সামাজিক সমানাধিকার নিশ্চিত করা মানবাধিকারের প্রধান নীতি সমুহের অন্যতম।

পরিশেষে আমরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে, মহান রাব্বুল আলামীনের নির্দেশনায় বিশ্বনবী (স) ৬২৪ সালে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সম্মতিক্রমে “মদিনা সনদ” যাকে “মহা সনদ”ও বলা হয়ে থাকে। এতে মানবাধিকারের পরিপূর্ণতা নিশ্চিত করে ছিলেন।
তাই আফ্রিকান মুসলিম স্কলার ড. বিলাল ফিলিপ্স বলেন- “Islam is not only a Religion, it’s way in life”

লেখক: আব্দুর রহমান হাশেমী
(কামিল হাদিস ও তাফসীর চলমান, মাষ্টার্স সমাজবিজ্ঞান)