দশবছরে ৭৪টি হুইলচেয়ার, ১১টি সেলাই মেশিন ও দুইটি ভ্রাম্যমাণ দোকান বিতরণ, ১১ শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার দায়িত্ব
এম.জিয়াবুল হক, চকরিয়া :
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় দিনে দিনে অসহায় প্রতিবন্ধী মানুষের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘পিস ফাইন্ডার’। সমাজহিতেষী মুলক কর্মকা-ের বদৌলতে সংগঠনটি এখন অসহায় মানুষের অন্যরকম ভালোবাসা হিসেবে রূপ পেয়েছে। কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে সংগঠনটি যাত্রা করলেও কাজের মাধ্যমে জানান দিয়েছে দেশের সচেতন মহলে।
মানবিক যোদ্ধা আদনান রামিম’র হাতধরে ‘শান্তিতে আমরা সবার পাশে- ¯ে¬াগান নিয়ে ২০১০ সালের পহেলা মে যাত্রা শুরু করে সংগঠনটি। সেই থেকে ২০২০ সালে পূর্ণ হয়েছে দশক। শুরু থেকে সংগঠনটি কাজ করছে মনের আনন্দে ও সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে। তাদের নেই কোন অসম প্রতিযোগিতা, নেই প্রতিদান কিংবা পুরস্কারের আশাও।
দশ বছরে ‘পিস ফাইন্ডার’র মানবিক কাজের হিসাবটাও কিন্তু কম নয়। ইতোমধ্যে সংগঠনটি অসহায় প্রতিবন্ধীদের মাঝে বিতরণ করেছে ৭৪টি হুইলচেয়ার, দরিদ্র পরিবারের মাঝে ১১ টি সেলাই মেশিন, ৩টি ওয়াকার, প্রতিবন্ধীদের সার্জিক্যাল সাপোর্ট, গড়ে দিয়েছে ২টি ভ্রাম্যমাণ দোকান, গ্রহণ করেছে ১১ জন দরিদ্র শিক্ষার্থীর নিয়মিত পড়ালেখার দায়িত্ব।
এমনকি প্রতিবছর একজন করে এতিম শিশুর ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয় ‘পিস ফাইন্ডার’। সঙ্গে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম, দেশব্যাপী অগণিত রক্তদান কর্মসূচি, বৃক্ষরোপন, জরুরি মুহুর্তে স্বেচ্ছাসেবী, দুর্যোগে জরুরি ত্রাণ বিতরণসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে মানবিক কাজের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যাচ্ছে।
সমাজে সবাই মানবিক হতে পারে না। সব তরুণও এক রকম নয়। কিছু ব্যতিক্রমও থাকে। কেউ কেউ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। বলতে গেলে ‘নিজের খেয়ে পরের মোষ চরানো’। মূলত তেমন কিছু তরুণদের হাত ধরেই যুগে যুগে সমাজে এসেছে পরিবর্তন।
আদনান রামিম তেমনই একজন তরুণ। যার নেতৃত্বে একটি সংগঠন মানবিক কাজে ব্রত আছে দশ বছর ধরে। মহামারী করোনার দুঃসময়েও থেমে নেই ‘পিস ফাইন্ডার’ নামক সংগঠনের মানবিক কার্যক্রম।
সমাজের স্বার্থপরতার শেকল ছিঁড়ে ফেলতে এগিয়ে যাচ্ছে দুই শতাধিক তরুণের বিশাল টিম নিয়ে। করোনাকালীন সময়ে উন্মুক্ত তহবিল গঠন করে প্রায় পাচ শাতাধিক পরিবারে ত্রান-সাহায্য পৌছে দিয়েছে, তাছাড়া প্রশাসনের আহবানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সচেতনতামূলক কর্মকান্ডেও অংশগ্রহণ করেছে সংগঠনের সদস্যরা।
সর্বশেষ ১৫ অক্টোবর সংগঠনটির উদ্যোগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাঝে হুইলচেয়ার, সেলাই মেশিন ও ভ্রাম্যমাণ দোকান বিতরণ করা হয়েছে। চকরিয়া থানা রাস্তার মোড়স্থ সিস্টেম চকরিয়া কমপে¬ক্সের সামনে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে ৬ জন প্রতিবন্ধীকে হুইলচেয়ার এবং ১জন করে সেলাই মেশিন ও ভ্রাম্যমাণ দোকান বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ শামসুল তাবরীজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন চকরিয়া পৌরসভার মেয়র আলমগীর চৌধুরী, চকরিয়া পৌরসভা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আতিক উদ্দিন চৌধুরী। অনুষ্ঠানে ৬ জন প্রতিবন্ধীকে হুইলচেয়ার এবং সেলাই মেশিন ও ভ্রাম্যমাণ দোকান তুলে দেন অতিথিবৃন্দ। অনুষ্ঠানে পিস ফাইন্ডারের সদস্য ছাড়াও শুভাকাঙ্ক্ষী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
চকরিয়া পৌরসভার মেয়র আলমগীর চৌধুরী বলেন, ‘স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পিস ফাইন্ডারের ভালো কাজের জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আগামীতে তাদের সব ধরেনের ভালো কাজে পাশে থাকব।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ শামসুল তাবরীজ বলেন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পিস ফাইন্ডারের প্রতিটি কর্মকা- ভাল লাগার মতো। প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সংগঠনের সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এ ধরণের সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবীমূলক কাজে সকল সংগঠনের পাশে থাকবো আমি।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আদনান রামিম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়ালেখা শেষ করে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন সমাজসেবা ও ছোটখাটো ব্যবসা নিয়ে। মূলত সমাজসেবাই তার সর্বাধিক পছন্দের কাজ।
‘পিস ফাইন্ডার’ সম্পর্কে আদনান রামিম বলেন, হয়তো আমরা আহামরি কিছু করতে পারিনি। আবার একেবারে বসেও থাকিনি। আমরা চেষ্টা করেছি, মানবিকতার বার্তা দিয়েছি। এই দশ বছরে আমাদের সহযোদ্ধা হয়ে অনেকেই আসছেন, আবার অনেকেই হাসছেন, অনেকই ভালোবাসছেন, আলোচনা করছেন, করছেন সমালোচনা।
তিনি বলেন, এই দশ বছরে আমরা ক্লান্ত হইনি, বরং আরও বেশি দায়বদ্ধ হয়েছি। আমরা থামতে চাইনা। আমাদের কার্যক্রম চলমান থাকবে অনন্তকাল। আগামীতেও মানবিক কাজে ব্রত থাকতে চাই সম্মিলিত উপায়ে। আমাদের প্রচেষ্ঠা সুন্দর ও উন্নত সমাজ বিনির্মাণের জন্য।’’
