পরিচয় জালিয়াতিতে মুসলিম ও হিন্দু ধর্মের দুই তরুণীকে বিয়ে ; ২য় স্ত্রীর মামলায় হিন্দু যুবক কাজলের ৩বছরের কারাদন্ড

: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ২ years ago

এম.জিয়াবুল হক : চকরিয়ায় হিন্দু স¤প্রদায়ের যুবক কাজল কান্তি দে ২০১১ সালে পরিচয় জালিয়াতির মাধ্যমে মো.সাইফুল ইসলাম সুমন নাম ধারণ করে মুসলিম সেজে প্রথমে বিয়ে করেছিলেন আসমা আক্তার নামের এক তরুনীকে। সেই সংসারে দুইটি ফুটফুটে সন্তান জন্মের পর ফের সেই কাজল এবার আসল পরিচয় নিয়ে ২০১৫ সালে এসে দ্বিতীয় বিয়ে করেন রিমিকা দাশ নামের অপর তরুনীকে। সেই সংসারেও জন্ম নিয়েছে একটি সন্তান।
বিয়ের নামে পরিচয় জালিয়াতির ঘটনাটি জানতে পেরে দ্বিতীয় স্ত্রী রিমিকা দাশ আশ্রয় নিয়েছেন আদালতের। ২০২১ সালে রিমিকা দাশ বাদি হয়ে চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেছেন। সেই মামলায় প্রতারক স্বামী কাজল কান্তি দে, বাবা স্বপন কান্তি দে ও মা রিতা রাণীকে আসামি করা হয়।
পরবর্তীতে আদালতের বিচারক বাদির নালিশী অভিযোগটি তদন্তের জন্য চকরিয়া থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। বাদি-বিবাদি ও প্রতিবেশি লোকজনের কাছ থেকে স্বাক্ষ্য গ্রহণ শেষে পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা আদালতের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপর মামলার অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু করেন আদালতের বিজ্ঞ বিচারক।
সর্বশেষ বুধবার ২০ এপ্রিল দীর্ঘ শুনানী শেষে মামলার রায় ঘোষনা করেন চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র জুড়িসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের বিচারক রাজীব কুমার দেব। আদেশে আদালত তথ্য গোপন রেখে বিয়ে করার অপরাধে অভিযুক্ত স্বামী কাজল কান্তি দে নামের ওই ব্যক্তিকে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং নগদ ১০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে প্রতারণা কাজে সহায়তার অপরাধে অভিযুক্ত কাজলের বাবা স্বপন কান্তি দে ও মা রিতা রাণীকে (বাদীর শ্বশুর-শাশুড়ি) তিন বছরের প্রবেশন সাজা প্রদান করেন আদালত।
আদালতের এই রায়ের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন চকরিয়া উপজেলা আইনজীবি সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান সাইদ। তিনি বলেন, কাজল কান্তি দে নামের এক গার্মেন্ট শ্রমিক ২০১০ সালে ধর্মান্তরিত হয়ে সাইফুল ইসলাম সুমন নাম ধারণ করেন। এর পর শরীয়তপুরের জাজিরা থানার রূপবাবুর হাটের হাজি কালাই মোড়লের কান্দি গ্রামের হানিফ মোড়লের মেয়ে আসমা আক্তারের সঙ্গে ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ২০১১ সালে।
সেই সংসারে দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে। কিন্তু সেই তথ্য গোপন রেখে বাবা ও মায়ের ইন্ধনে পূর্বের নামে সনাতনী রীতিমতে ২০১৫ সালে দ্বিতীয় বিয়ে করেন চকরিয়া পৌরসভার চার নম্বর ওয়ার্ডের মৃত যোগেশ চন্দ্র দাশের কন্যা রিমিকা দাশকে। সেই সংসারেও বর্তমানে একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। ২০১৯ সালে দ্বিতীয় স্ত্রী রিমিকার সাথে পারিবারিক কলহ দেখা দেয়।
ওইসময়ে মোবাইলের কথোপকথনে রিমিকা জানতে পারেন তাঁর স্বামী কাজল ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম তরুণীকে প্রথম বিবাহ করেন। এর পর রিমিকা স্বামী কাজলের বিরুদ্ধে প্রতারণা, তথ্য গোপন, ধর্মান্তরিত, বহু বিবাহসহ বিভিন্ন অপরাধের ধারায় ২০২১ সালের ১২ মে উপজেলা জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে মামলা রুজু করেন। মামলায় এজাহারনামী আসামি করা হয় স্বামী কাজল কান্তি দে, তার বাবা স্বপন কান্তি দে ও মা রিতা দে-কে।
তিনি বলেন, মামলায় কাজলের প্রথম স্ত্রী আসমা আক্তারও আদালতে উপস্থিত হয়ে জবানবন্দি দেন। ওইসময় বিজ্ঞ আদালত তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা, সাক্ষ্যগ্রহণ ও শুনানি শেষে গতকাল মামলার এক নম্বর আসামি কাজল কান্তি দে-কে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। অনাদায়ে আরো এক মাস কারাদণ্ডের আদেশ দেন।
একইসাথে ছেলে কাজলের এমন কর্মকাণ্ডে সহায়তা প্রদানের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বাবা স্বপন কান্তি দে প্রকাশ সোনাইয়া ও মা রিতা রাণী দে-কে ছয় মাস করে সাজা প্রদান করেন। এ সময় দুইজনকেই নগদ ১০ হাজার করে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়। তবে কাজলের বাবা ও মায়ের বয়স বিবেচনায় ৩ বছরের প্রবেশন সাজা দিয়ে জামিন দেন আদালত।
চকরিয়া আইনজীবি সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান সাইদ বলেন, ‘আদালতের রায়ে বাদীপক্ষ খুশি। এই রায়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতে এইধরণের অপকর্ম করতে কেউ সাহস করবে না। তিনি বলেন, প্রবেশনকালীন সাজায় আসামিরা এলাকায় সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন কর্মাদি সম্পন্ন করবেন। আর তাদের এই কর্মকাণ্ড নজরদারির জন্য স্থানীয় মন্দির ও সমাজ কমিটি দেখভাল করবেন। সেই নির্দেশনা দেবেন আদালত।##