মো. আবদুল মজিদ মোল্লা : ইবরাহিম (আ.) ছিলেন আল্লাহর একজন বিশিষ্ট নবী। তাঁকে ‘খলিলুল্লাহ’ (আল্লাহর বন্ধু) ও ‘আবুল আম্বিয়া’ (নবীদের পিতা) নামেও স্মরণ করা হয়। পবিত্র কোরআনে ইবরাহিম (আ.)-কে মুসলিম জাতির পিতা বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘এটা তোমাদের পিতা ইবরাহিমের মিল্লাত।
তিনি আগে তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম এবং এই কিতাবেও। ’ (সুরা হজ, আয়াত : ৭৮)
পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে ইবরাহিম (আ.)-এর সপ্রশংস আলোচনা এসেছে। নবুয়ত লাভের আগেই তরুণ ইবরাহিম (আ.) তাঁর সম্প্রদায়ের অন্যায় ও অবিশ্বাসের প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর পিতা (বা পিতৃতুল্য) আজরের পৌত্তলিকতার প্রতিবাদ করেন। কিন্তু তার সেই প্রতিবাদ ছিল বুদ্ধিদীপ্ত, সংযত ও শিষ্টাচারপূর্ণ।
পিতা-পুত্রের কথোপকথন : পবিত্র কোরআনের বর্ণনা হলো—‘স্মরণ কোরো, এই কিতাবে উল্লিখিত ইবরাহিমের কথা; সে ছিল সত্যনিষ্ঠ নবী। যখন সে তাঁর পিতাকে বলল, হে আমার পিতা, আপনি তার ইবাদত কেন করেন যে শোনে না, দেখে না এবং আপনার কোনো কাজেই আসে না? হে আমার পিতা, আমার কাছে এসেছে জ্ঞান, যা আপনার কাছে আসেনি। সুতরাং আমার অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সঠিক পথ দেখাব। হে আমার পিতা, শয়তানের ইবাদত করবেন না। শয়তান তো দয়াময়ের অবাধ্য। হে আমার পিতা, আমি তো আশঙ্কা করি যে আপনাকে দয়াময়ের শাস্তি স্পর্শ করবে, তখন আপনি হয়ে পড়বেন শয়তানের বন্ধু। পিতা বলল, হে ইবরাহিম, তুমি কি আমার দেব-দেবী হতে বিমুখ? যদি তুমি নিবৃত্ত না হও তবে আমি প্রস্তরাঘাতে তোমার প্রাণ নাশ করবই; তুমি চিরদিনের জন্য আমার কাছ থেকে দূর হয়ে যাবে। ইবরাহিম বলল, আপনার প্রতি সালাম। আমি আমার প্রতিপালকের কাছে আপনার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করব, নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রতি অতিশয় অনুগ্রশীল। আমি আপনাদের থেকে ও আপনারা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করেন তাদের থেকে পৃথক হচ্ছি। আমি আমার প্রতিপালককে আহ্বান করি। আশা করি, আমার প্রতিপালককে আহ্বান করে আমি ব্যর্থ হবো না। ’ (সুরা মারিয়াম, আয়াত : ৪১-৪৮)
শ্রদ্ধা ও কল্যাণকামিতা : উল্লিখিত কথোপকথনে পিতার প্রতি নবী ইবরাহিম (আ.)-এর শ্রদ্ধা ও কল্যাণকামিতার নানা দিক ফুটে উঠেছে। যেমন—
১. ভালোবাসার সম্বোধন : ইবরাহিম (আ.) একাধিকবার ‘হে আমার পিতা’ বলে সম্বোধন করেছেন। যা একজন পিতার জন্য সবচেয়ে মধুর ও শ্রদ্ধার সম্বোধন।
২. যুক্তি প্রদান : ইবরাহিম (আ.) নিজের দাবির পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, ‘আপনি তার ইবাদত কেন করেন যে শোনে না, দেখে না এবং আপনার কোনো কাজেই আসে না?’ তিনি অযৌক্তিক তর্কে লিপ্ত হননি।
৩. বিনয়ের সঙ্গে সত্যপ্রকাশ : ইবরাহিম (আ.) বিনয়ের সঙ্গে সত্য জ্ঞান লাভের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার কাছে এসেছে জ্ঞান, যা আপনার কাছে আসেনি। সুতরাং আমার অনুসরণ করুন। ’ তিনি বলেননি আমি আপনার চেয়ে বেশি জানি বা বেশি জ্ঞানী।
৪. পরিণতি সম্পর্কে সতর্ককরণ : পিতা বয়সে বড় হলেও ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে তাকে সতর্ক করাই কল্যাণকর। ইবরাহিম (আ.) তাঁকে সতর্ক করে বলেন, ‘আমি তো আশঙ্কা করি যে আপনাকে দয়াময়ের শাস্তি স্পর্শ করবে। ’
৫. মতের অমিল হলেই রূঢ়তা নয় : পিতা সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়ার পরও ইবরাহিম (আ.) তাঁর প্রতি কোনো রূঢ় আচরণ করেননি। তিনি বলেছেন, আপনার প্রতি সালাম (আপনি শান্তিতে থাকুন)।
৬. কল্যাণ কামনা : ইবরাহিম (আ.) শেষ পর্যন্ত বলেছেন, ‘আমি আমার প্রতিপালকের কাছে আপনার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করব। ’ যা সন্তান হিসেবে পিতার প্রতি সর্বোচ্চ কল্যাণকামিতার নিদর্শন।
৭. ঈমানের প্রশ্নে আপসহীন : ইবরাহিম (আ.) পিতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও কল্যাণকামী হওয়ার পরও তিনি ঈমানের প্রশ্নে কোনো আপস করেননি। তিনি বলেছেন, ‘আমি আপনাদের থেকে ও আপনারা আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করেন তাদের থেকে পৃথক হচ্ছি। ’
অমুসলিম মা-বাবার সঙ্গে আচরণ : সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) বলেন, আমার ব্যাপারে চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। আমার মা শপথ করেন আমি মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করা পর্যন্ত তিনি পানাহার করবেন না। আল্লাহ তখন অবতীর্ণ করেন, ‘যদি তারা (মা-বাবা) বাধ্য করে আমার সঙ্গে শিরক করতে যে ব্যাপারে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে অনুসরণ কোরো না। তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো। …’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ২৪)
আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘কোনো মা-বাবা সন্তানকে আল্লাহর অবাধ্য হতে বললে সে তাদের আনুগত্য করবে না। তবে তাদের এই নির্দেশ পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক নয়। ’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)
ইমাম তাবারি (রহ.) বলেন, ‘অমুসলিম মা-বাবার যে নির্দেশ আল্লাহর আনুগত্যের পথে প্রতিবন্ধক নয়, তা অনুসরণ করাও সন্তানের জন্য আবশ্যক। ’ (তাফসিরে তাবারি)
আসমা বিনতে আবি বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.)-এর যুগে আমার মা রাগিবা (অমুসলিম) আমার কাছে এলেন। আমি রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, তার সঙ্গে কি আমি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৭৮)
আল্লাহ মা-বাবার সঙ্গে ধৈর্য, সংযম ও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করার তাওফিক দিন। আমিন।
