শ্রমিকের কাজ ও সুরক্ষার দায়িত্ব নিন

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৫ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : বৈশ্বিক করোনা মহামারীর দ্বিতীয় বছর চলছে এখন। মে দিবসের প্রাক্কালে বিশ্বব্যাপী করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ কোটি ৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। আর সারা বিশ্বে করোনায় মৃতের সংখ্যা ৩২ লাখ ছাড়িয়েছে। কিন্তু অনেক বিশ্লেষক বলছেন, করোনা মহামারীতে স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়কে ছাড়িয়ে যাচ্ছে অর্থনৈতিক অভিঘাত। আর করোনাকালের অর্থনৈতিক স্থবিরতায় সবচেয়ে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে শ্রমিক শ্রেণি। শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে লকডাউনসহ অন্যান্য পরিস্থিতির শিকার হয়ে যেমন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক স্থায়ী ও সাময়িক বেকারত্বের শিকার হয়েছেন, তেমনি বিপুলসংখ্যক শ্রমিক সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েও কাজ করে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনই এক বাস্তবতায় করোনা মহামারীকালে আরেকটি মে দিবস উদ্যাপন করছে দুনিয়ার মানুষ।

মহামারীর অর্থনৈতিক বিপর্যয় বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এর অন্যতম কারণ বাংলাদেশে মোট শ্রমশক্তির সিংহভাগই বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। একদিকে বারবার গণপরিবহন বন্ধ হচ্ছে এবং লকডাউনের অচলাবস্থা চলছে; অন্যদিকে কাজ না থাকায় বেশিরভাগ শ্রমিক আয়-রোজগার হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। আবার কাজ ও খাদ্যের সন্ধানে পথে নেমে করোনা সংক্রমণের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে। কিন্তু সরকারের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও যথাযথ পরিকল্পনা ও সমন্বয় না থাকায় মহামারীকালে শ্রমিক ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর এই সংকট দূর হচ্ছে না। দেখা গেছে, করোনা মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত সোয়া লাখ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ সহায়তা বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়ীরা দফায় দফায় পেলেও ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পগুলোর উদ্যোক্তারা এক্ষেত্রেও বঞ্চিত হয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেষ্টা সত্ত্বেও গত বছর এই খাতে সরকারের দেওয়া ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের সিংহভাগই এখনো উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করা যায়নি। অথচ দেশের শ্রমশক্তির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই এই খাতে নিয়োজিত। এটা অবশ্যই সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর একটি নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা। কেননা, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সহায়তার জন্য তহবিল বরাদ্দ করা হলেও বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়নি।

এই জাতীয় দুর্যোগে শ্রমিকদেরই সবার আগে সহায়তা পাওয়ার কথা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, কর্মে নিয়োজিত মোট জনশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশ রয়েছে বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। এদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই দৈনিক মজুরিতে কাজ করে। রিকশা-ভ্যান-ব্যাটারিরিকশা-ইজিবাইক চালক, নির্মাণশ্রমিক, হোটেল-রেস্তোরাঁ শ্রমিক, মোটর মেকানিক, হকার, দর্জি শ্রমিক, ক্ষুদ্র চা-দোকানের মালিক-শ্রমিক, সেলুন কর্মচারী, গৃহকর্মী, পাদুকা শ্রমিকসহ নানা পেশায় থাকা এমন শ্রমিকরা করোনার দিনগুলোতে কাজ হারিয়েছেন। একই সঙ্গে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সড়কপথের প্রায় ৭০ লাখ চালক-শ্রমিক ও নৌপথের ২০ লাখ শ্রমিক মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কেননা এদের বেশিরভাগই দৈনিক মজুরি ও চুক্তিতে কাজ করেন। এদের সঙ্গে দুর্দশায় পড়েছে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশুশ্রমিক। কিন্তু এদের সহায়তায় যে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে তা সত্যিই অপ্রতুল।

মে দিবসকে ঘিরে দেশের শ্রমিক শ্রেণির বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা করলে যে চিত্র পাওয়া যায় তা খুবই হতাশাজনক। দেশের শ্রমিকদের বড় অংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত থাকায় যেমন তারা নিজেদের সংকট দূর করা ও দাবি আদায়ে সংঘবদ্ধ হতে পারে না, তেমনি সরকারের পক্ষ থেকেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষা এবং উন্নয়নে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার সর্বজন স্বীকৃত হলেও দেশে আইনি এবং আইনবহির্ভূত নানা বাধার কারণে ট্রেড ইউনিয়নের সংস্কৃতি খুবই অসংগঠিত ও দুর্বল। দেশের ৪৩টি খাতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের আইনি সুযোগ থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা কার্যকর নয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ‘৮ ঘণ্টা কর্মদিবস’ ঘোষণার সোয়া শত বছর পরও দেশের প্রায় ৬৬ শতাংশ শ্রমিক ১০ ঘণ্টার বেশি কাজ করে। ফলে মহামারী মোকাবিলার বিশেষ উদ্যোগগুলোর সঙ্গে দেশের শ্রম খাতের কাঠামোগত সংস্কারের কাজে হাত না দিলে শ্রমিকশ্রেণির ভাগ্য বদল দুরাশাই রয়ে যাবে।

এটা মনে রাখা জরুরি যে, দেশের শ্রমিক শ্রেণিই অর্থনীতির চাকা ঘোরানোর সবচেয়ে বড় শক্তি। এই শ্রমিকরাই দেশে-বিদেশে কাজ করে বাংলাদেশের ভাগ্য বদলে অবদান রেখে যাচ্ছে। প্রবাসে পাড়ি জমানো অভিবাসী শ্রমিকরা দেশের জন্য রেকর্ডপরিমাণ রেমিট্যা›স পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দিচ্ছেন। আবার দেশের ভেতরে থেকেই তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা রপ্তানি আয়ের ৮৬ ভাগের জোগান দিচ্ছেন। অন্যদিকে, দেশের কৃষক বা কৃষিশ্রমিকরাই দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে মানুষের অন্নের জোগানে সবচেয়ে মুখ্য ভূমিকা রাখছেন। আর দেশের ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের শ্রমিকরাই এককভাবে জিডিপির ২৫ শতাংশের জোগান দিচ্ছেন। শ্রমিক শ্রেণির উন্নয়ন ছাড়া যে বৃহত্তর সমাজের উন্নয়ন সম্ভব নয়, এই সত্যটি অনুধাবণ না করলে দেশ কখনোই সামনে এগোতে পারবে না।