লাদাখ সীমান্ত : শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধানই কাম্য

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৬ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : চীন ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক বিরোধ, পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে অনেক অসঙ্গতিপূর্ণ আলোচনা গণমাধ্যমে এসেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমরা যেন কোনো বিভ্রান্তিতে জড়িয়ে না পড়ি। একটি স্থায়ী সমাধান যতদিন না হবে, ততদিন এ আলোচনাটি প্রাসঙ্গিকতা পাবে।

গত ১৫-১৬ জুন মধ্যরাতে চীন-ভারত সীমান্তের লাদাখে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। যেখানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে তা সমতল ভূমি থেকে প্রায় দেড় হাজার ফুট উপরে। গণমাধ্যম বলছে, চীনের ৪৩ জন হতাহত হয়েছে আর ভারতের একজন কর্নেলসহ ২০ জন নিহত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্তচুক্তি অনুযায়ী একাধিক স্থানে অস্ত্র ব্যবহার না করার শর্ত আছে। লাদাখ সে রকমেরই একটি অঞ্চল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এত হতাহতের ঘটনা কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। অবশ্য ঘটনার দু’দিন বাদে ভারত সরকার ওই এলাকার সেনাসদস্যদের সঙ্গে থাকা অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেয়।

যুদ্ধের নীতি-কৌশল বিষয়ে সমরবিদ কিংবা নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাই ভালো বলতে পারবেন, তবে আমাদের মতো আমজনতারও কৌতূহল কম নয়। কেন বিরোধ, কবে থেকে বিরোধ, যুদ্ধ আরও বড় আকার ধারণ করবে কিনা, যুদ্ধের ফলাফল কার অনুকূলে যাবে ইত্যাদি নানা প্রশ্ন আমাদের মনে উঁকি মেরে বেড়ায়। তারই দু-একটির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব।

শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় তা সমগ্র জাতির আকাক্সক্ষার সঙ্গে নাও মিলতে পারে, দুটি দেশের যুদ্ধ মানে দুটি জাতির যুদ্ধ তেমনটি না-ও হতে পারে। আমরা যদি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দিকে তাকাই তাহলে দেখব আমাদের সঙ্গে বর্বর আচরণ করেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক নাগরিকই ইয়াহিয়া খানের নৃশংসতাকে সমর্থন করেনি। তাই আমাদের যত ঘৃণা তা ওই বর্বর শাসকগোষ্ঠী এবং তার সমর্থকদের প্রতি, পাকিস্তানের সব নাগরিকের প্রতি নয়। অন্যদিকে একাত্তরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারসহ শাসকগোষ্ঠী নির্লজ্জভাবে পাকিস্তানি বর্বরতাকে সমর্থন করেছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নাগরিক আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে নৈতিক ও আর্থিক সমর্থন দিয়েছিল।

তাই আমরা সে সময়ের শাসকদের ঘৃণা করি; সব মার্কিনিকে নয়। কিন্তু ভারত-চীনের নাগরিক সংস্কৃতি একটু ভিন্ন, বিশেষ করে ১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর। দু’দেশের শাসকগোষ্ঠী তাদের নিজ নিজ নাগরিকদের প্রতিপক্ষ-চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে সমর্থ হয়েছে। তাই অতি জাতিগত ভাবনা কূটনৈতিক সমাধানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কিন্তু চীন-ভারত নাগরিক সম্পর্ক সুদূর অতীতে এমনটি ছিল না। এক দেশের প্রতি অন্য দেশের মানুষজনের কৌতূহল ছিল। ভারত ও চীনের মধ্যকার আদি সম্পর্ক কেমন ছিল তা আমরা নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের লেখায় খুঁজে পাই- ‘‘সপ্তম শতাব্দীতে ভারত থেকে চীনে ফিরে এসে ই জিং (ই শিং) প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ভারতের কোনো প্রান্তে এমন কোনো মানুষই কি আছেন যিনি চীনের অনুরাগী নন?’ ই জিং-এর কথায় অল্পবিস্তর অত্যুক্তি থাকলেও সে সময় নিশ্চিতভাবেই চীন সম্পর্কে ভারতে এবং ভারত সম্পর্কে চীনে প্রভূত মননগত কৌতূহল ছিল। ১০ বছর নালন্দায় কাটানোর পর ই জিং তখন সবেমাত্র দেশে ফিরেছেন। নালন্দা ছিল উচ্চশিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠান যা দেশীয় ছাত্র ছাড়াও বহু বিদেশি পণ্ডিতকে আকৃষ্ট করত’’ (‘তর্কপ্রিয় ভারতীয়’; পৃষ্ঠা: ১৫৮)। উল্লেখ্য, ই জিং ছিলেন প্রথম সহস্রাব্দের অন্যতম সেরা চৈনিক জ্ঞানান্বেষী। কিন্তু সীমান্ত নিয়ে চীনের বিরোধ উনিশ শতক থেকে শুরু।

১৮৬৫ সালে জনসন নামের একজন ব্রিটিশ একতরফাভাবে প্রথমবারের মতো ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণ করেন। দ্বিতীয়বারের মতো ১৮৯৯ সালে ম্যাকাটনি-ম্যাগডোনাল্ড লাদাখের আকসাই অঞ্চলকে চীনের অন্তর্ভুক্ত করে চীনা রাজার কাছে পাঠালে তিনি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কিছুই বলেননি। তৃতীয়বার ১৯১৩ সালে ম্যাকমোহন লাইন নির্ধারণ করলে চীন এতে ঘোর আপত্তি জানায়। সেই থেকে চীন আপত্তিতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ থেকে ভারতের স্বাধীনতার কিছুদিন পরই চীনের কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে মার্কিন আয়োজনে সার্বিক সহায়তা করেছিল ভারত। সে সময়ে মার্কিন বিমানবাহিনী কমপক্ষে আধা ডজন ভারতীয় বিমানঘাঁটি অনায়াসে ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছিল। বৈরিতার আরও কারণ হল, ১৯৫০ সালে চীন যখন তিব্বত দখল করে নেয় তখন সেখানে চীনের বিরুদ্ধে একটি গেরিলাগোষ্ঠী তৈরি হয়।

আর সেই গেরিলাগোষ্ঠীকে সরাসরি মদদ দেয় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। এর পরিণতিতেই ১৯৬২ সালে চীন ও ভারতের মধ্যে ভয়াবহ এবং সম্ভবত প্রথম ও একমাত্র প্রথাগত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সে যুদ্ধে ভারতকে যথেষ্ট ক্ষতি মেনে নিতে হয়। তারপরও সীমান্তরেখাটি চীন কোনোকালেই মেনে নেয়নি। চীনের কথা হল, ১৮শ’ শতকে যে সীমান্তরেখা ছিল, তাতে ভারতের বর্তমান অরুণাচল প্রদেশ এবং লাদাখের কিছু অংশ তৎকালীন চীন সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। ১৯১৩ সালে ব্রিটিশরা সিমলা চুক্তির মাধ্যমে ম্যাকমোহন লাইন ও অন্যান্য যে লাইন এঁকেছিল, চীন তা বরাবরের মতো অস্বীকার করে আসছে। অন্যদিকে ভারত বরাবরই সেই সীমান্তরেখাকে মান্যজ্ঞান করে আসছে। সুতরাং সীমান্ত সমস্যার নিষ্পত্তি আজতক তিরোহিত অবস্থায়ই রয়ে গেছে; বৈরিতারও অবসান হয়নি।

এরই মধ্যে অনেকেই নানা সমীকরণে মেতে উঠেছেন। যুদ্ধ যদি বেধেই যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের রূপটি কেমন হবে? আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ইসরাইল, জাপানসহ ইউরোপের দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনকে সহ্যই করতে পারছেন না। তাই চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিগত দিনগুলোতে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সখ্য অনেকখানি বেড়েছে। সুতরাং চোখ বন্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো ভারতকে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা দেবে।

আন্তর্জাতিকভাবে চীনের বাণিজ্য প্রভূত প্রসারিত হলেও ‘বিপদে’ এগিয়ে আসার মতো কেউ নেই। রাশিয়াকে অনেকে চীনের বন্ধুরাষ্ট্র মনে করেন; কিন্তু মনে রাখতে হবে ভারতের সঙ্গেও রাশিয়ার বন্ধুত্ব অতীত নয়। আর পাকিস্তান চীনের বন্ধুত্বের তালিকায় থাকলেও তার মুরব্বি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা দেশটি জন্মকাল থেকেই হারিয়েছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। করোনা মোকাবেলায় অক্ষমতা-অবহেলা, জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ড এবং নভেম্বরের নির্বাচন- এর বাইরে গিয়ে ভারতকে কতটা সাহায্য করতে পারবে তা একটি বড় প্রশ্ন। অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে সম্প্রতি প্রতিবেশী নেপালের সম্পর্কে চির ধরেছে।

কেউ কেউ সামরিক শক্তিরও তুলনা করেছেন। বিগত দশকগুলোতে চীন ও ভারত উভয়েই অস্ত্র সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। একদিকে বিদেশি প্রযুক্তি আমদানি করে দেশেই অস্ত্র তৈরি করছে, অন্যদিকে সরাসরি অস্ত্র আমদানিতেও কম যায়নি। ভারত সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইসরাইল থেকে অস্ত্র আমদানি করে থাকে।

অপরদিকে চীন কেবল রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনে, তবে বেশিভাগই তারা দেশীয়ভাবে উৎপাদন করে। কিন্তু দেখার বিষয় হল, যে জায়গাগুলো চীন-ভারত সীমান্তবর্তী সেগুলো গিরিসংকুল এলাকা। তাই ভূমিস্তরে যারা সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হবে তারা খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না, অনেকখানিই নির্ভর করতে হবে আকাশপথের ওপর। শক্তির বিচারটা এখানেও করতে হবে। তবে স্মরণে রাখা দরকার, চীনের অর্থনীতির আকার হচ্ছে ১৪ ট্রিলিয়ন ডলার; যেখানে ভারতের হল মাত্র ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। আবার, চীনের সামরিক ব্যয় ২২০ বিলিয়ন ডলার আর ভারতের ৫২ বিলিয়ন ডলার। তবে সমানে সমান যা আছে তা হল দুটি দেশই পারমাণবিক শক্তিধর।

কথা উঠেছে, আদৌ এ দুই দেশ চূড়ান্তভাবে বৃহত্তর কোনো সামরিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়বে কিনা? একটি যুদ্ধ সমাধা করতে যা যা লজিস্টিক সাপোর্ট লাগে তার সবটাই দু’দেশ করেছে। সৈন্য সংখ্যা বাড়িয়েছে, আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবস্থা করেছে, রাস্তাঘাট করেছে আর করেছে বিমানঘাঁটি। যুদ্ধে সক্ষমতা বাড়াতে ‘মহড়া’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট; সে কাজটিও চীন ও ভারত সফলভাবেই করে এসেছে। রাজনৈতিকভাবে চীন ও ভারতে জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা জোরদার হয়ে উঠেছে। দু’দেশের দুই নেতাই জাতীয়তাবাদী আবেগকে অতিরিক্ত আমলে আনার চেষ্টা করছেন, সেই সঙ্গে সামনাসামনি সৈন্য সমাবেশকে করেছেন জোরদার। সব মিলিয়ে বলা যায়, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ না হলেও প্রস্তুতিতে কোনো খামতি নেই।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোনো না কোনো পক্ষ নেয়ার একটা বাইরের চাপ থাকে। সে ক্ষেত্রে আমাদের দু’টি দেশের কথাই ভাবতে হবে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মকে চীন ভালো চোখে দেখেনি। কিন্তু বর্তমান অবস্থা হল, বাংলাদেশ চীন থেকে অস্ত্র কিনেছে, চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণে অবদান রেখেছে, আমাদের সেনা অফিসাররা চীনে প্রশিক্ষণ নিয়েছে, করোনাকালে বাংলাদেশে সে দেশের বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছে। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি থাকা এবং নদ-নদীর হিস্যা অমীমাংসিত থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণে রেখে আমরা ভারতকে বন্ধু রাষ্ট্রই মনে করে।

তাছাড়া নিকটতম প্রতিবেশী। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে ভারত কিংবা চীনকে সরাসরি সমর্থন কিংবা বিরোধিতা করার কোনো সুযোগ থাকবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের কথায় যুদ্ধ হবেও না আবার বাংলাদেশের কথায় যুদ্ধ মিলিয়েও যাবে না। তাই কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশের দূরে থাকাই মঙ্গল। বাইরের কোনো চাপ যাতে না আসে সেজন্য কূটনৈতিক দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে।

সাধারণত যুদ্ধ জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়েই শেষ হয়। যুদ্ধ ভুল বোঝাবুঝির কারণে হয়, ইগোর কারণে হয়, আবার আগ্রাসনকে ঘিরেও হয়; কিন্তু ক্ষতিটা হয় উভয় পক্ষেরই। চীন-ভারত যুদ্ধ হলে হয়তো সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি হবে না; কিন্তু সেনাক্ষয় তো হবেই। এটা স্রেফ ‘ভুল বোঝাবুঝি’ কিংবা ‘ইগো সমস্যা’। চীন ও ভারতের উচিত দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনা অথবা আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সীমান্ত সমস্যার সমাধান করা। করোনাকালীন বিশ্ব আমাদের জানান দিচ্ছে অস্ত্রের অসারতা। মানুষ আর অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখতে চায় না, চায় জীবন রক্ষাকারী ভ্যাকসিন।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়