হুমায়ূন রশিদ : টেকনাফে সাগরের (ছদ্মনাম) সংসারে দুই স্ত্রী ও ৪/৫ জন ছেলে-মেয়ে এবং সোহেল (ছদ্মনাম) বাবার বেকার ছেলেদের একজন। স্থানীয় দালালের মুখের বুলিতে প্রলোভিত হয়ে সাগর পথে মালয়েশিয়া গিয়ে অমানবিক কষ্ট এবং নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরে আসা দুই ব্যক্তি। এক সময়ে স্থানীয় ও রোহিঙ্গা দালাল সিন্ডিকেটের সমন্বয়ে গড়ে উঠা শক্তিশালী মানব পাচারকারী সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে মৃত্যুরমুখে দাড়িয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া গমনের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও গা শিউরে উঠা কাহিনী জনস্বার্থে তুলে ধরা হল।
২০১৫ইং সাল তখন টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের হিড়িক পড়ে। প্রত্যন্ত এলাকার হাজার হাজার মানুষ কর্মের আশায় সাগর পথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান আবার অনেকে দৈব-দূর্বিপাকে পড়ে সাগরে প্রাণ হারান। আবার অনেকে বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনী ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক হয়ে কারাভোগ করছেন। যাওয়ার সময় বোটে দৈনিক ৩ বেলা ভাত ও নাস্তা দেওয়ার পর নিরাপদে পৌঁছানোর স্থানীয় দালালের কথা বিশ্বাস করে নিজের ও সংসারে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় সাগর এবং সোহেল ঐ বছরের ৭ই রমজান টেকনাফ বাজার হতে প্রয়োজনীয় রসদ নিয়ে কচুবনিয়া গ্রামে জনৈক দালালের বাড়িতে আশ্রয়ের নেওয়ার জন্য যায়। উক্ত বাড়িতে গেলেই মালয়েশিয়াগামী ১৫/২০ জনকে বেঁধে তাদের পকেটে থাকা টাকা ও নাস্তাদি কেড়ে নিয়ে বেঁধে ফেলে। রাত ৩টারদিকে শাহপরীরদ্বীপ ভাঙ্গা পয়েন্ট দিয়ে ছোট মাছ শিকারী ভোটে করে সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ-পূর্বদিকে মিয়ানমার সীমান্তে আশ্রয় নেওয়া থাইল্যান্ডের মানব পাচারকারী বোটে তুলে দেওয়া হয়। ঐ বোটের ধারণ ক্ষমতা ছিল সাড়ে ৫শ থেকে ৬শ যাত্রী। সেখানে ৬দিন অপেক্ষা করেই ৭দিনের মাথায় ১শ ৯৫জন যাত্রী নিয়ে দূর্যোগ আবহাওয়ায় মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে মানব পাচারে ব্যবহৃত কলষ্টোর বোট।
এদিকে মালয়েশিয়াগামীদের ৩বেলা ভাত দেওয়ার কথা থাকলেও যাত্রার পর হতে যাত্রীদের হাফ কাপ করে পানি ছাড়া কোন খাদ্য দেয়না। ৩দিন পর্যন্ত খাদ্য ও আলো-বাতাস না পেয়ে যাত্রীরা ক্রমশ দূর্বল হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে সাগরের অবস্থা একেবারে কাহিল হয়ে পড়ায় সাগরে ফেলে দেওয়ার জন্য বোটের গর্ত থেকে বের করে উপরে রেখে দেয় রাখাইন নাবিকেরা। একবেলা আলো বাতাস পেয়ে সাগর একটু শক্ত হয়ে উঠায় আর ফেলে দেয়নি নাবিকেরা। গভীর সাগরে তীব্র তাপদাহযুক্ত ঢেউয়ের পানি শরীরের যে অংশে লাগে এসিডের মতো ঝলসে যায়।
যাত্রার ৭দিনের মাথায় গভীর সাগরে দূর্যোগ আবহাওয়া আর পাহাড়সম ঢেউয়ের আঘাতে এই বোটের একটি ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। তখন বোটটি প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলে সাগর আর সোহেল এমতাবস্থায় নিশ্চিত মৃত্যু জেনে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে থাকে। তারা হঠাৎ মাছের গন্ধ পেয়ে বোটের কিনারে দেখে আল্লাহর অশেষ কুদরতে বোটের চেয়ে বড় বড় অসংখ্য মাছ এসে বোটটিকে ঘিরে ফেলে। এসব মাছ মানব বোঝাই বোটটিকে নিরাপদ হেফাজতে রাখার পর থাইল্যান্ড সীমান্ত সংলগ্ন মেঘের মতো পাহাড় দেখা যাওয়ায় নিরাপদ স্থানে ছেড়ে দিয়ে কোথায় হাওয়া হয়ে যায়। পরে বোটের দালালেরা থাইল্যান্ডের লোকজনের সাথে যোগাযোগ করলে দুপুর ১২টারদিকে দু‘টি আলাদা বোটে করে তাদের থাইল্যান্ড পাহাড়ে নেওয়া হয়। সেখানে কোন ধরনের খাদ্য নেই প্রত্যেক যাত্রীকে ১লিটার করে ১টি পানির বোতল দেয়। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর সন্ধ্যারদিকে থাইল্যান্ড বনবিভাগের লোকজন ও মানব পাচারকারী সিন্ডিকেট বিশাল বহর নিয়ে তাদের গহীন পাহাড়ি পথ দিয়ে নিয়ে যায়। গভীর রাতে বন্য পশুর হুংকার আর ক্ষুধার জ্বালায় অনেকে হাটঁতে না পারলে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। ২৪ ঘন্টা পর অনেক কষ্ট করে মানব পাচারকারী সিন্ডিকেটের আস্তানায় পৌঁছে। এরপর পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে টাকা আদায়ের পালা। অনেকে টাকা দিতে না পারলে চালানো হয় মধ্যযুগীয় নির্যাতন। যা চোখে দেখলেও মুখে প্রকাশ করা সম্ভব না। প্রতিজন থেকে দালালেরা দেড় লাখ থেকে দুই লাখ পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায় করে। যা মুক্তিপণ দিতে পারে না তাদের বিক্রি গ্রæপের নিকট বিক্রি করে দেওয়া হয় আবার অনেকে অনাহার-অর্ধাহারে মৃত্যুবরণ করে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। তাই ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় মৃত্যুরমুখে দাড়িয়ে অনিশ্চিত গন্তব্যে আর কারো যাত্রা যেন না হয় সেই কামনা রইল।
ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ঝুঁকি নিয়ে গমণকারী অনেকে আবার মানব পাচারকারী চক্রের নারী সদস্যদের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এই নারী সদস্যরাই সহজে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তোলে আবার অনেককে লোভে ফেলে বিয়ে করাতে বাধ্য হয়। সাগর ও সোহেল কোন প্রকারে দাবীকৃত টাকা পরিশোধ করতে পারলেও পাসপোর্ট না থাকায় কাজ-কর্ম করতে পারেনা। দেশে বেকারত্বের চেয়ে বিদেশে যন্ত্রণা বেশী হওয়ায় তারা আইনী প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরে আসেন।
তারা মালয়েশিয়াগামীদের উদ্দেশ্যে বলেন, দালালের মিষ্ট কথায় প্রলোভিত হবেন না। যতই অভাবে থাকেন না কেন? দেশের মধ্যে একটি পানের দোকান করে সংসার চালানো অনেক ভাল। মৃত্যুকে হাতে নিয়ে সাগর পথে অনিশ্চিত গন্তব্যে কেউ পা দেবেন না এই প্রত্যাশাই রইল।
