খালেদার মামলার রায় দেখে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপি

লেখক: নুরুল করিম রাসেল
প্রকাশ: ৯ years ago

টেকনাফ টুডে ডেস্ক : খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা দুর্নীতির দুই মামলা নিয়ে দিন দিন বিএনপিতে ‘আতঙ্ক’ বাড়ছে। যার বহিঃপ্রকাশ বিভিন্ন সময় দলের নেতাদের বক্তব্যে উঠে আসছে। ‘যেন-তেন’ একটা রায় দিয়ে বিএনপি প্রধানকে নির্বাচনের বাইরে রেখে আরেকটি একতরফা নির্বাচন করার ‘ষড়যন্ত্র’ চলছে- এমন শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিএনপি নেতারা।
দলটির নেতারা জানান, নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত সরকার ‘নিয়ন্ত্রণ’ করছে। সরকারের ‘অদৃশ্য’ ইশারায় বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে একটা রায় হতে পারে, যাতে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারেন। সেই সুযোগে আবারও একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকতে চায় আওয়ামী লীগ। তবে আওয়ামী লীগের এই ‘স্বপ্ন’ এবার আর বাস্তবায়ন করতে দেবে না দেশের মানুষ- এমনটাও বলেন দলের কেউ কেউ। আর দলীয় প্রধানকে ছাড়া আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা-না করা নিয়ে এখনই কিছু বলতে নারাজ দলটির নেতারা। মামলার রায় দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে চান তারা।

খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানান, বিএনপি চেয়ারপারমন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে ছয়টি এবং হত্যা, বিস্ফোরক ও নাশকতার অভিযোগে চারটি এবং মানহানি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ মিলিয়ে মোট ১৫টি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা জিয়া চ্যারিটেবল ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই দুই মামলা নিয়েই বিএনপি বেশি চিন্তিত বলে জানা গেছে।

দুর্নীতির দুই মামলা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘ যে পরিমাণ সাক্ষী-প্রমাণ হয়েছে, তাতে উনি (খালেদা জিয়া) খালাস পাবেন।’ বিএনপিতে তাহলে এই মামলার রায় নিয়ে এতো শঙ্কা কেন? এমন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যেহেতু শেখ হাসিনা চান, উনার (খালেদা জিয়া) সাজা হবে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে শুরু করে নিম্ন আদালত পর্যন্ত সবই শেখ হাসিনার কথায় চলে।’

মামলার রায়ের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে- এমন প্রসঙ্গে এই আইনজীবী বলেন, ‘আপিল করবো। আপিলে জামিন নিবো। জামিন পেলে নির্বাচন করা যাবে।’ আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘উনি (খালেদা জিয়া) নির্বাচনে যাবেন, আমরাও নির্বাচনে যাবো।’

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘সরকার বিএনপিকে মাইনাস করে নির্বাচনের প্রক্রিয়ার বাইরে রাখতে চায়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ম্যাডামের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া, সাজা দেওয়ার চেষ্টা করছে।’

খালেদা জিয়ার সাজা হলে আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলছি, বিদেশিরাও সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বলছে। সেক্ষেত্রে সরকার যদি কোনো ষড়যন্ত্র করে তাহলে আমরা অবস্থা বুঝে পদক্ষেপ নেবো।’

এদিকে, গত ৩ ডিসেম্বর রোববার দুপুরে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এক সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘অনির্বাচিত সরকারের ভাবনা-চিন্তায় একটি পথই উন্মুক্ত রয়েছে। সেটি হলো- খালেদা জিয়াকে আইনের মাধ্যমে সাজা দিয়ে ক্ষমতা দখল রাখা। কিন্তু আমরা খুব স্পষ্ট করতে বলতে চাই- খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে আপনারা নির্বাচনী ফসল ঘরে তুলতে পারবেন না। বরং এজন্য আপনাদের চড়ামূল্য দিয়ে বিদায় নিতে হবে।’

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি সম্পর্কে গত ১ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘প্রায় ৫০ বছর ধরে সুপ্রিম কোর্টে কাজ করছি। আমি কোনো দিন শুনিনি যে, সাপ্তাহিক জামিন হয়। এর থেকে অপমানজনক আর কী হতে পারে! তিনি বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ‘

৩০ নভেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতেই প্রমাণিত হয়, সরকার সম্পূর্ণভাবে নিম্ন আদালতকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণে এই বিচারকরা কাজ করে বলেই তাদের কোনো স্বাধীনতা নেই। মুক্ত মনে বিচার করার কোনো পরিবেশ নেই। এ জন্য হয়তো তাকে বাধ্য হয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে হয়েছে শুধু খালেদা জিয়াকে জনসম্মুখে হেয় করার জন্য। এই ধরনের গ্রেফতারি পরোয়ানা দেওয়া সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক।’

জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় অস্থায়ী জামিনে থাকা খালেদা জিয়ার জামিন বাতিল করে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এছাড়া আগামী ৫, ৬ ও ৪ ডিসেম্বর যুক্তিতর্কের দিন ধার্য রয়েছে। দুর্নীতির দুই মামলায় আত্মসমর্পণ করতে মঙ্গলবার ১১টায় আদালতে যাবেন খালেদা জিয়া। তার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া সোমবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির দুই মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করবেন তিনি।

রাজধানীর বকশীবাজারে কারা অধিদফতরের প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থাপিত ঢাকার ৫নং বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. আখতারুজ্জামানের আদালতে মামলা দুটির বিচার চলছে।

প্রসঙ্গত, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় একটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন- মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

অন্যদিকে, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় একটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার অপর আসামিরা হলেন- হারিছ চৌধুরী, জিয়াউল ইসলাম ও মনিরুল ইসলাম খান।