১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬|
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার চার কৃতী শিক্ষার্থী এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন। দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রমে চিকিৎসাবিদ্যায় তাঁদের এই অর্জনে পরিবার, স্বজন, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মধ্যে খুশীর জোয়ার বইছে।
সফল চারজন হলেন হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কুতুবদিয়াপাড়ার ওয়াহিদুল ইসলাম, হ্নীলা ইউনিয়নের ওয়াব্রাংয়ের আবদুল হাকিম বুলবুল, বাহারছড়া ইউনিয়নের জাহাজপুরার নোমানুর রশিদ ও টেকনাফ পৌরসভার ইসলামাবাদের ওমর ফারুক।
ওয়াহিদুল ইসলাম
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কুতুবদিয়াপাড়া গ্রামের আবুল কালাম ও ফরিদা বেগমের ছেলে ওয়াহিদুল ইসলাম এইবছর ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালে এসএসসি এবং নটরডেম কলেজ, ঢাকা থেকে ২০২০ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে ২০২১ সালে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাবিদ্যায় পড়াশোনা শুরু করেন।
নিজের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সম্পর্কে ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, “আমি এমন একজন ডাক্তার হতে চাই, যিনি শুধু চিকিৎসায় দক্ষ নন, বরং মানবিক এবং দ্বীনদার, একজন প্রকৃত সেবামুখী চিকিৎসক। চিকিৎসা পেশাকে আমি কেবল জীবিকা নয়, বরং একটি ইবাদত এবং স্রষ্টার সৃষ্টির সেবার মাধ্যম হিসেবে দেখতে চাই।”
তার এই সাফল্যে পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসী আনন্দ প্রকাশ করে তাঁর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সফল কর্মজীবনের জন্য দোয়া করেছেন।
আবদুল হাকিম বুলবুল
টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের ওয়াব্রাং গ্রামের মুখলেছুর রহমান ও মরিয়ম খাতুনের সন্তান আবদুল হাকিম বুলবুল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।
১০ ভাইবোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ বুলবুলের শিক্ষাজীবন শুরু হয় ইমাম আবু হানিফা (রহ.) দাখিল মাদরাসায়। এরপর অষ্টম শ্রেণিতে হ্নীলা আল-ফালাহ একাডেমিতে ভর্তি হয়ে বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন। পরে হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালে এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ এবং কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন। ২০২১ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ লাভ করেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি হ্নীলা গুলফরাজ-হাশেম ফাউন্ডেশনের মেধাবৃত্তিতে ট্যালেন্টপুলে প্রথম স্থানসহ স্থানীয় বিভিন্ন মেধাবৃত্তিতে সাফল্য অর্জন করেন।
এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বুলবুল মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন। ভবিষ্যতে একজন মানবিক চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
বুলবুলের মেজভাই ও রাজাপালং এম ইউ ফাজিল মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ বলেন, আলহামদুলিল্লাহ। দীর্ঘ জীবনসংগ্রামের পর মহান আল্লাহর বিশেষ রহমতে বুলবুল আজ এই সফলতা অর্জন করেছে। ২০০৩ সালে অসুস্থ বুলবুলকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সময় দোয়া করেছিলাম, একদিন যেন সে এই মেডিকেল কলেজেরই ছাত্র হতে পারে। আলহামদুলিল্লাহ, মহান আল্লাহ সেই দোয়া কবুল করেছেন। আজ বুলবুল এমবিবিএস চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার এই অর্জনে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত।
নোমানুর রশিদ
বাহারছড়া ইউনিয়নের জাহাজপুরা গ্রামের নুরুল আমিন ও রাশেদা বেগমের সন্তান নোমানুর রশিদ কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
তিনি ২০১৮ সালে বাহারছড়ার শামলাপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং পরবর্তীতে কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর ২০২১ সালে চিকিৎসাবিদ্যায় পড়াশোনার জন্য কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন।
আরো জানা যায়, শামলাপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নোমানুর রশিদই প্রথম এমবিবিএস ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁর এ অর্জন জাহাজপুরা, বাহারছড়া ও নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও গর্বের বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এমবিবিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নোমানুর রশিদ মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন এবং পবিত্র কোরআনের সূরা আদ-দুহার ৫ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেন। তিনি মা-বাবা, শিক্ষক, বন্ধু, সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে অর্জিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান মানুষের সেবায় কাজে লাগানোর জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন।
ওমর ফারুক
টেকনাফ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামাবাদ এলাকার ওবাইদুল হক ও হাসিনা বেগমের সন্তান ওমর ফারুক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
শিক্ষাজীবনের শুরুতে তিনি টেকনাফ বার্মিজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন। পরে চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। ২০২০ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান তিনি।
দীর্ঘ অধ্যয়ন ও পরিশ্রমের পর চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত এমবিবিএস ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় সফল হন ওমর ফারুক।
নিজের এই অর্জনের জন্য মা-বাবা, পরিবারের সদস্য, শিক্ষক ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, মানবসেবা করার সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের এলাকা, দেশ ও দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চান।
টেকনাফের কৃতী সন্তান ও তাজমান মেডিকেলের সিনিয়র আবাসিক অফিসার ডাক্তার হাফেজ আব্দুল কাদের বলেন, এমবিবিএস ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় টেকনাফের চার কৃতী তরুণের সাফল্য নিঃসন্দেহে পুরো টেকনাফবাসীর জন্য অত্যন্ত আনন্দ, গর্ব ও আশার বিষয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সন্তানরা নিজেদের মেধা, কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন শিক্ষাক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করেছেন—এটি সত্যিই প্রশংসনীয়।
তাঁদের এই সাফল্য শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি তাঁদের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি টেকনাফের মানুষের জন্য একটি অনুপ্রেরণার বার্তা। তাঁদের সাফল্য প্রমাণ করে, সুযোগ ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে টেকনাফের সন্তানরাও দেশের যেকোনো প্রান্তে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারেন।
আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ থাকবে—শুধু একজন ভালো চিকিৎসক হওয়ার চেষ্টা নয়, বরং একজন ভালো মানুষ ও মানবিক চিকিৎসক হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
বিশেষ করে আমি তাঁদের অনুরোধ করব, নিজেদের শিকড়ের কথা যেন কখনো ভুলে না যান। টেকনাফের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন অনেক বেশি। ভবিষ্যতে তাঁরা দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও বিশেষায়িত চিকিৎসায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি নিজ এলাকার মানুষের জন্যও কিছু করার চেষ্টা করবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
আজকের এই চার তরুণ আগামী দিনের চিকিৎসক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে তাঁরা যেন দেশের মানুষের কল্যাণে এবং বিশেষ করে তাঁদের প্রিয় জন্মভূমি টেকনাফের মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
তাঁদের আগামীর পথচলা হোক সাফল্যমণ্ডিত, মানবিক ও গৌরবময়।”
টেকনাফের কৃতী সন্তান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মমতাজ উদ্দীন কাদেরী বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ। একসঙ্গে টেকনাফের চারজন শিক্ষার্থী এমবিবিএস প্রফেশনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে—এ খবর জেনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত হয়েছি। তাঁদের প্রত্যেককে এবং তাঁদের সম্মানিত মা-বাবাকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
আমি আশা করি, শিক্ষা-দীক্ষায় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা টেকনাফের আকাশে তাঁরা ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলবেন এবং নিজেদের মেধা, যোগ্যতা ও মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন, ইনশা-আল্লাহ।”
এই চার তরুণের এই সাফল্যে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকার পরিবার, স্বজন, শিক্ষক, সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে চিকিৎসাবিদ্যায় তাঁদের এই অর্জন টেকনাফের শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
তাঁদের পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এই চার তরুণ দক্ষতা, মানবিকতা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করবেন।
