টেকনাফ টুডে ডেস্ক : সমুদ্র ও নদী থেকে মাছ শিকারের পর তা বিক্রি করে পাওয়া টাকা দিয়েই চলে জেলেদের পরিবার। তবে, সমুদ্রে মাছ শিকারে জারি করা একের পর এক নিষেধাজ্ঞায় পথে বসতে শুরু করেছেন তারা। অনেকেই এখন এই পেশা ত্যাগ করে পেটের দায়ে পাড়ি জমিয়েছেন রাজধানীতেও। মৎস্যজীবী নেতারা বলছেন, জ্বালানি তেলসহ দ্রব্য মূল্যের লাগামহীন উর্দ্ধগতিতে পথে বসতে শুরু করেছেন ট্রলার মালিকরাও।
ইমরান হোসেনের তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ দ্বিতীয় পর্ব।
জাটকা শিকারে নিষেধাজ্ঞা ২৪২ দিন: ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত টানা আট মাস নদ-নদীতে জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। এই সময়ে জাটকা ধরা, পরিবহন, ক্রয়-বিক্রয় ও মজুদ রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার। নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে ১০ ইঞ্চি (২৫ সেন্টিমিটার) দৈর্ঘ্যের চেয়ে ছোট ইলিশ যেন না শিকার করা হয় সেজন্য ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহারে বন্ধেও কঠোর অবস্থানে থাকে মৎস্য অধিদপ্তর।
সাগরে সব ধরনের মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা ৬৫ দিন: ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন সাগরে মাছ শিকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলে। মূলত সব প্রকারের সামুদ্রিক মাছের প্রজনন-বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করা এবং বঙ্গোপসাগরের জীববৈচিত্র রক্ষায় ৬৫ দিনের জন্য বঙ্গোপসাগরে মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন ৪৭৫ প্রজাতির মাছ, চিংড়ি, হাঙর, লবস্টার, কাঁকড়াসহ সাগরে কোনো ধরনের মাছ শিকার করা অপরাধ।
মা ইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞা ২২ দিন: ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর ২২ দিন মা ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা থাকে নদী ও সাগরে। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় দেশের ৩৮টি জেলার নদ-নদী ও সাগরে ২২ দিন ইলিশ শিকার বন্ধ থাকে। এ সময় ইলিশ আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, মজুদ ও ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার।
একাধিক জেলে ও মৎস্যজীবী নেতাদের সাথে কথা বললে তারা রাইজিংবিডিকে বলেন, ২.৫ সেন্টিমিটারের বড় জাল দিয়ে মাছ শিকার করতে গেলে হাঙর, তিমি, ছাড়া কোনো মাছ আটকায় না জেলেদের জালে। চিংড়ি, পোয়া, তপসিসহ কোনো মাছ পান না তারা।
বরগুনা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সহ-সভাপতি আবুল হোসেন ফরাজী রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা একটি ট্রলারে ১৮-২০ জন জেলে থাকে। প্রতিবার ঘাট থেকে গিয়ে ১০-১৫ দিন সাগরে মাছ ধরে। এই ক’দিনের জেলেদের খাবার ও ট্রলারের জ্বালানি তেলের ব্যায় হয় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। আড়াই সেন্টিমিটারের বেশি ফাসের জাল নিয়ে সাগরে গিয়ে মাছ পায় ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকার। এমন আইনে পথে বসতে হয়েছে তাদের। অনেক ট্রলার মালিক ট্রলার বিক্রি করে দিয়েছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘অনেক জেলে অভাবের তাড়নায় পেশা বদলেছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে এক সময়ে জেলেদের তীব্র সংকট দেখা দেবে।’
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘বছরের ৩৬৫ দিনের ৩২৯ দিন মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে। মধ্যে মাত্র ৩৬ দিন মৎসজীবীরা নিষেধাজ্ঞার আওতার বাহিরে থাকেন। সরকার শুধু মাছ বৃদ্ধির চিন্তা করে, আমাদের চিন্তা করে না। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে জলদস্যুদের অত্যাচার। এই পেশার মানুষরা এখন প্রত্যেকেই ধার-দেনা করে আজ নাজেহাল অবস্থায়। বরগুনার অসংখ্য ট্রলার মালিক লোনের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে পালিয়েছেন। অনেকে দাদনের টাকা নিয়ে এখনো মধ্যযুগীয় কায়দায় জীবন চালাচ্ছেন।’
এ বিষয়ে বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার কারণে সাগরে মাছের পরিমাণ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈজ্ঞানিক উপায়েই এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এতে জেলে ও মৎস্যজীবীরাই উপকৃত হয়। তবে, মাছ কাঙ্খিত পরিমাণে ধরা পড়তে শুরু করলে নিষেধাজ্ঞা কমানোর বিষয়ে ভাবা যায়। কিন্তু এসব বৈজ্ঞানিক গবেষনার উপরে নির্ভর করবে।’
